ভোট দিবেন কাকে? এই প্রশ্নটি আজ শুধু রাজনৈতিক পছন্দের বিষয় নয়, বরং দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষকের মর্যাদা এবং জাতীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক ভাবনার বিষয়। একজন জনপ্রতিনিধি শুধু আইন প্রণেতা নন, তিনি জনগণের আশা, প্রত্যাশা এবং বাস্তবতার মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি করেন এবং সমাজের নানা স্তরের সমস্যাকে রাষ্ট্রীয় পরিসরে তুলে ধরার দায়িত্ব পালন করেন। তাই এমন দূরদর্শী ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রয়োজন, যিনি কৃষির গুরুত্ব গভীরভাবে অনুধাবন করবেন, কৃষকের সমস্যাকে নিজের নৈতিক দায় হিসেবে গ্রহণ করবেন এবং জাতীয় সংসদে কৃষির পক্ষে দৃঢ়, স্পষ্ট ও নির্ভীকভাবে কথা বলবেন। সঠিক নেতৃত্ব নির্বাচন মানে শুধু সরকার গঠন নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষির টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পথ সুদৃঢ় করা। সংসদে উচ্চারিত হোক নিরাপদ কৃষি ও কৃষকের ন্যায্য অধিকার। বাংলাদেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার গভীরে যে শক্ত ভিত্তি দীর্ঘদিন ধরে আমাদের টিকিয়ে রেখেছে, তার নাম কৃষি। এই কৃষিই দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, পুষ্টির যোগান দেয় এবং গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণ হিসেবে কাজ করে। অথচ নির্বাচনের সময় কৃষি ও কৃষকের স্বার্থ নিয়ে অনেক প্রতিশ্রুতি শোনা গেলেও বাস্তবতার মাটিতে সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়। তাই ভোট দেওয়ার সময় শুধু ব্যক্তি বা দল নয়, বরং কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুল জনগোষ্ঠী কৃষির সঙ্গে জড়িত। কৃষক শুধু ধান, গম বা সবজি উৎপাদন করেন না, তিনি জাতির জীবনধারাকে সচল রাখেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো কৃষকের উৎপাদন ব্যয় দিন দিন বাড়ছে। বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ এবং শ্রমিক খরচ সবকিছুর দাম বাড়লেও কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পান না। মৌসুমভিত্তিক অতিরিক্ত উৎপাদনের সময় বাজারে দাম কমে যায় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে কৃষক অনেক সময় উৎপাদন খরচও তুলতে পারেন না। তাই এমন জনপ্রতিনিধি প্রয়োজন যিনি সংসদে দাঁড়িয়ে কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নে সোচ্চার হবেন। ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা শুধু কৃষকের স্বার্থ রক্ষার বিষয় নয়, এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। কৃষক যদি তার উৎপাদনের সঠিক মূল্য না পান তাহলে তিনি ধীরে ধীরে কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হন। এতে খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে তা জাতীয় অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই ভোট দেওয়ার সময় এমন নেতৃত্বকে বেছে নেওয়া জরুরি যিনি কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করবেন, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত শিল্প সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখবেন এবং কৃষককে বাজারের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। পাশাপাশি তিনি যেন সংসদে ন্যায্য মূল্যনীতি প্রণয়ন এবং একটি শক্তিশালী ও কার্যকর ন্যায্য মূল্য কমিশন গঠনের বিষয়েও সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। কৃষি ঋণ কৃষকের টিকে থাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা। কিন্তু বাস্তবে অনেক কৃষক সময়মতো প্রয়োজনীয় কৃষি ঋণ পান না। জটিল প্রক্রিয়া, জামানতের সমস্যা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা প্রায়ই ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এনজিও থেকে তুলনামূলক বেশি সুদে ঋণ নেন, যা অনেক সময় তাদের আর্থিক চাপ বাড়িয়ে দেয় এবং জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। একই কারণে অনেক কৃষক মহাজনী ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, যেখানে সুদের হার অত্যন্ত বেশি এবং পরিশোধের চাপও কঠিন। এই বাস্তবতায় এমন জনপ্রতিনিধি প্রয়োজন, যিনি সহজ শর্তে, দ্রুত এবং স্বল্প সুদে কৃষি ঋণ পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেবেন। পাশাপাশি কৃষি বীমা চালু ও সম্প্রসারণের বিষয়েও সংসদে সক্রিয় ভূমিকা রাখবেন, যাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা আর্থিক নিরাপত্তা পেয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পান। বাংলাদেশের কৃষি বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। অকাল বন্যা, খরা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কৃষি উৎপাদনে গভীর প্রভাব ফেলছে এবং কৃষকের জীবিকা অনিশ্চিত করে তুলছে। এই বাস্তবতায় এমন জনপ্রতিনিধি প্রয়োজন, যিনি জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি, উন্নত জাতের বীজ এবং আধুনিক কৃষি গবেষণার প্রসারে গুরুত্ব দেবেন। পাশাপাশি কৃষি সম্প্রসারণ সেবাকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করে কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করবেন। একই সঙ্গে পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবেন এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। তাই এমন নেতৃত্বকে বেছে নেওয়া জরুরি, যিনি প্রকৃতি, কৃষি এবং মানুষের জীবনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে আন্তরিকভাবে কাজ করবেন, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি নিরাপদ ও সবুজ বাংলাদেশ পায়। নিরাপদ খাদ্য এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু। ভেজাল সার, নিম্নমানের বীজ এবং অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশকের ব্যবহার কৃষি উৎপাদনের মান এবং খাদ্য নিরাপত্তা দুটোকেই হুমকির মুখে ফেলছে। অনেক অসাধু ব্যবসায়ী কীটনাশকের নামে বিষ বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে যা শুধু ফসল নয়, মানুষের স্বাস্থ্যকেও বিপন্ন করছে। তাই এমন জনপ্রতিনিধি দরকার যিনি ভেজাল কৃষি উপকরণ উৎপাদন ও বিপণনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবেন এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবেন। একজন দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধির আরেকটি বড় দায়িত্ব হলো নিজের এলাকার কৃষি সমস্যাগুলোকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরা। প্রতিটি অঞ্চলের কৃষি বাস্তবতা ভিন্ন। কোথাও পানির সংকট রয়েছে, কোথাও বন্যার সমস্যা দেখা দেয় আবার কোথাও বাজার সুবিধার অভাব রয়েছে। এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য স্থানীয় বাস্তবতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। তাই এমন এমপি নির্বাচন করা প্রয়োজন যিনি নিজের এলাকার কৃষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবেন এবং তাদের সমস্যাগুলো সংসদে তুলে ধরবেন। কৃষির উন্নয়ন মানে শুধু খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি নয়। এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কৃষিভিত্তিক শিল্প, সংরক্ষণাগার, শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং পরিবহন অবকাঠামো উন্নত হলে কৃষক তার পণ্যের ভালো দাম পাবেন এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। তাই এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন যিনি কৃষিকে শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করে একটি শক্তিশালী কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে কাজ করবেন। ভোট একটি নাগরিকের সবচেয়ে শক্তিশালী অধিকার এবং দায়িত্ব। এই ভোটের মাধ্যমেই আমরা এমন নেতৃত্ব নির্বাচন করতে পারি যারা শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং কৃষক ও কৃষির উন্নয়নে বাস্তব পদক্ষেপ নেবে। যে জনপ্রতিনিধি কৃষির পক্ষে কথা বলবেন, কৃষকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করবেন, নিরাপদ খাদ্যের জন্য লড়বেন এবং ভেজালের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবেন তাকেই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করা উচিত। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কৃষিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। আর সেই অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ শুরু হয় সঠিক নেতৃত্ব নির্বাচনের মাধ্যমে। তাই ভোট দেওয়ার সময় মনে রাখতে হবে কৃষি বাঁচলে দেশ বাঁচবে, কৃষক বাঁচলে জাতি নিরাপদ থাকবে।
লেখক: কৃষিবিদ, কলামিস্ট ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন। rssarker69@gmail.com
এইচআর/এএসএম