বিনোদন

দেশে দেশে ভালোবাসায় জীবন্ত দেবদাস, কোনটি সবার সেরা

চন্দ্রমুখী না পার্বতী, কে দেবদাসকে বেশি ভালোবাসে? কিংবা দেবদাসই বা কাকে বেশি ভালোবেসেছেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হয়তো শত বছর পরও বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে আছে দেবদাস। প্রেম, অভিমান, সামাজিক বন্ধন আর আত্মবিধ্বংসী এক পুরুষের ট্র্যাজেডি; সব মিলিয়ে ‘দেবদাস’ হয়ে উঠেছে বাঙালির প্রেমের অমর আখ্যান।

মাত্র ১৭ বছর বয়সে উপন্যাসটি লেখেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। সাহিত্যমানের বিচারে তার ‘শ্রীকান্ত’ বা ‘গৃহদাহ’ হয়তো বেশি সমৃদ্ধ; তবু ভালোবাসার করুণ, সরল ও আবেগঘন উপস্থাপনায় ‘দেবদাস’-এর আবেদন অনন্য। আর সেই কারণেই রূপালি পর্দায় বারবার ফিরে এসেছে দেবদাস-পার্বতী-চন্দ্রমুখীর গল্প।

দেশে দেশে নানা ভাষায় তৈরি হওয়া ‘দেবদাস’ সিনেমার কোনটি সেরা, সেই প্রশ্ন কালে কালে আড্ডা-আলোচনায় বহুবার এসেছে। তবে কোনোটিকেই কোনোটির চেয়ে এগিয়ে বা পিছিয়ে রাখা যায় না। সময় অনুযায়ী প্রতিটি সিনেমাই দেবদাসকে জীবন্ত করে তুলেছে দর্শকের কাছে। করেছে প্রাসঙ্গিক।১৯২৭ সালে কলকাতায় নির্মিত হয় প্রথম নির্বাক চলচ্চিত্র ‘দেবদাস’। সেটি পরিচালনায় ছিলেন নরেশ মিত্র।দেবদাস চরিত্রে প্রমথেশ বড়ুয়া ও পার্বতী চরিত্রে যমুনা বড়ুয়া

১৯৩৫ সালে সবাক সংস্করণ নির্মাণ করেন অভিনেতা-পরিচালক প্রমথেশ বড়ুয়া। নিজের পরিচালনায় নিজেই ‘দেবদাস’ চরিত্রে অভিনয় করে দর্শক মাতান তিনি। ছবিটির সাফল্য হিন্দি ও অসমিয়া ভাষায় নতুন সংস্করণ নির্মাণে অনুপ্রেরণা জোগায়। ছবিতে পার্বতী চরিত্রে যমুনা বড়ুয়া ও চন্দ্রমুখী চরিত্রে অভিনয় করেন চন্দ্রাবতী দেবী।

১৯৫৫ সালে বলিউডে নতুন মাত্রা যোগ করেন বিমল রায়। দেবদাস চরিত্রে দিলিপ কুমার, পার্বতীতে সুচিত্রা সেন এবং চন্দ্রমুখীতে বৈজয়ন্তিমালা অভিনয় করেন। ছবিটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ একাধিক সম্মান অর্জন করে।

১৯৭৯ সালে কলকাতায় মুক্তি পায় বাংলা ভাষার ভারতীয় ‘দেবদাস’। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন দিলীপ রায়। এই সিনেমায়া মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তার সঙ্গে পার্বতী চরিত্রে ছিলেন সুমিত্রা মুখোপাধ্যায় ও চন্দ্রমুখী চরিত্রে ছিলেন সুপ্রিয়া চৌধুরী। ছবিটির সবচেয়ে বড় চমক ছিলেন চুনিলালের চরিত্রেি উত্তমকুমার।

১৯৮২ সালে বাংলাদেশে প্রথম ‘দেবদাস’ পরিচালনা করেন চাষী নজরুল ইসলাম। নাম ভূমিকায় ছিলেন বুলবুল আহমেদ, পার্বতী চরিত্রে কবরী সারোয়ার এবং চন্দ্রমুখীতে আনোয়ারা। এটি ছিল উপন্যাসের অন্যতম বিশ্বস্ত চিত্রায়ণ। ছবিটি মুক্তির পর ব্যাপক বাণিজ্যিক সাফল্য পায়।

২০১৩ সালে আবারও নতুনভাবে ‘দেবদাস’ নির্মাণ করেন চাষী নজরুল ইসলাম। এতে অভিনয় করেন শাকিব খান, অপু বিশ্বাস ও মৌসুমী।

তবে ‘দেবদাস’ নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করে সবচেয়ে বড় সাফল্যটা পেয়েছে বলিউড, ২০০২ সালে। সে বছর বিশাল বাজেটে ‘দেবদাস’ নির্মাণ করেন সঞ্জয় লীলা বানসালি। এতে দেবদাস চরিত্রে শাহরুখ খান, পার্বতীতে ঐশ্বরিয়া রাই এবং চন্দ্রমুখীতে মাধুরী দীক্ষিত অভিনয় করে তুমুল প্রশংসা কুড়ায় এটি। গানে, সংলাপে, পোশাকে, সেট ডিজাইনে এই ছবিটিকেই অনেকে সেরা ‘দেবদাস’ বলে মনে করেন।

ছবিতে শাস্ত্রীয় সংগীত, নৃত্য ও দৃষ্টিনন্দন সেটে নির্মিত ছবিটি সুপারহিট হয় এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসা কুড়ায়।

শক্তি সামন্ত পরিচালিত ২০০২ সালে বাংলা ভাষার ভারতীয় আরেকটি ‘দেবদাস’ নির্মিত হয়। ছবিটির চিত্রনাট্য রচনা করেছেন শক্তিপদ রাজগুরু ও শক্তি সামন্ত। এতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, পার্বতী চরিত্রে অর্পিতা পাল এবং চন্দ্রমুখী চরিত্রে ইন্দ্রাণী হালদার।

২০০৯ সালে অনুরাগ কাশ্যপ নির্মাণ করেন আধুনিক সংস্করণ ‘Dev.D’। সেখানে সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে নতুনভাবে দেখা যায় দেবদাসকে।

এছাড়াও পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাতেও দেবদাসকে নিয়ে সিনেমা নির্মিত হয়েছে বলে জানা যায়। সিনেমার পাশাপাশি দেশে দেশে নির্মাণ করা হয়েছে অনেক খন্ড ও ধারাবাহিক নাটকও।

সমাজের দেয়ালে আটকে থাকা ভালোবাসা, শেষ মুহূর্তে প্রিয়জনের দরজায় এসে না পাওয়া শেষ স্পর্শ- এই ট্র্যাজেডিই হয়তো দেবদাসকে অমর করেছে। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে; তবু দেবদাসের ভালোবাসা, অভিমান আর আত্মবিনাশী আবেগ আজও দর্শক-হৃদয়ে সমান প্রাসঙ্গিক।

 

এলআইএ