১৭ বছরের দীর্ঘ স্বেচ্ছানির্বাসন। লন্ডনের কুয়াশা পেরিয়ে অবশেষে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান—ফেরেন এক অস্থির রাজনৈতিক সময়ে এবং বদলে যাওয়া বাংলাদেশে, যা শত শত প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে। তার প্রত্যাবর্তন ছিল নিছক একটি ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন নয়; তা ছিল দেশের রাজনীতিতে এক নাটকীয় পুনঃপ্রবেশ, বহু জল্পনা-কল্পনার অবসান এবং নতুন সমীকরণের সূচনা।
কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তনের উচ্ছ্বাস স্থায়ী হয়নি বেশি দিন। মাত্র পাঁচ দিনের মাথায়, ৩০ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন তার মা, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। ব্যক্তিগত জীবনে এটি ছিল এক গভীর শোকের মুহূর্ত; জাতীয় জীবনে ছিল একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম, কারাবরণ, অসুস্থতা—সবকিছুর শেষে তার প্রস্থান সমর্থকদের মনে রেখে যায় শূন্যতা, আবেগ আর অনিশ্চয়তার ভার।
এই শোক শুধু একজন পুত্রকে নয়, এক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারীকেও নাড়িয়ে দেয়। এটি ছিল বিএনপির এক যুগের অবসান। কিন্তু ইতিহাসে প্রায়ই দেখা যায়—সংকটই নতুন নেতৃত্বকে নির্মাণ করে।
আরও পড়ুন১৯% পাল্টা শুল্ক ছাড়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পোশাকের নতুন সম্ভাবনাআগামী সরকারের জন্য যেসব চ্যালেঞ্জ দেখছেন অর্থ উপদেষ্টাব্যবসার ভালো পরিবেশের প্রতিশ্রুতি চান ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাপ্রতিশ্রুতি নয়, স্বচ্ছ নীতি ও বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ চান ব্যবসায়ীরা
ব্যক্তিগত বেদনা ও জাতীয় আবেগের সেই সন্ধিক্ষণে তারেক রহমান নিজেকে গুছিয়ে নেন। তিনি হাত দেন দল পুনর্গঠনে। তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব—সব স্তরে পুনর্বিন্যাস, নির্বাচনি প্রস্তুতি এবং সমর্থকদের সক্রিয় অংশগ্রহণে একটি নতুন গতিশীলতা তৈরি হয়। অবশেষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় পেয়ে অর্জন করে ভূমিধস বিজয়—যা কেবল একটি নির্বাচনি সাফল্য নয়, বরং এক রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের পূর্ণতা।
এখন তারেক রহমান দাঁড়িয়ে আছেন প্রধানমন্ত্রী পদের নতুন এক বিশাল দায়িত্বের সামনে।সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের আগে বিএনপির নতুন নেতৃত্বের সামনে একদিকে যেমন জনআকাঙ্ক্ষা ও রাজনৈতিক প্রত্যাশার ভার, অন্যদিকে রয়েছে জটিল ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ফাইল ছবি
ক্ষমতায় বসার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের যে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে, তা কেবল একটি খাতে সীমাবদ্ধ নয়; আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার—সব ক্ষেত্রেই দ্রুত, বিচক্ষণ ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে উঠবে।
ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক গভীর সংকটে পড়েছিল। নতুন বিনিয়োগ স্থবিরতা, কর্মসংস্থানকে তীব্রভাবে প্রভাবিত করেছিল। রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাতও বড় ধাক্কা লেগেছিল। ফলে দেশের রপ্তানি আয় নেতিবাচক প্রবণতায়।
‘ক্ষমতায় গ্রহণের পর নতুন প্রধানমন্ত্রী তথা সরকারকে কয়েকটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে, যা তারা অতীত থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে গ্রহণ করবে। নতুন নির্বাচিত সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জকে আমি চারটি ভাগে দেখছি… বিনিয়োগ স্থবিরতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টির দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ধীরগতি এবং দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা’, বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
আরও পড়ুনরপ্তানি আয় কমছে কেন?নির্বাচনের পর প্রথম কার্যদিবসে শুরুতেই চাঙা শেয়ারবাজারযুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির ফলে বাংলাদেশ কী পাবে, কী দেবে?তৈরি পোশাক রপ্তানিতে মন্দায় ঝুঁকিতে বিনিয়োগ-কর্মসংস্থান
নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করার চাবিকাঠি আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার, যা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে মারাত্মকভাবে অবনতি হয়েছিল এবং মানুষের মধ্যে ভীতির জন্ম দিয়েছিল।
চলমান নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও নতুন বিনিয়োগ করতে ঝুঁকছে না। একটি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবসায়িক পরিবেশ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি, যা কেবল দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নয়, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও ক্রেতাদেরও নতুন ব্যবসায়িক চুক্তিতে আত্মবিশ্বাস দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জাগো নিউজকে বলেন, শিল্প ও ব্যবসা খাতের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সবার আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি প্রয়োজন। একই সঙ্গে দুর্নীতি, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ এবং জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে এই দুটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগে গতিনতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং অর্থনীতিকে গতিশীল করে তোলা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ, যা কমে ডিসেম্বর মাসে ৬ দশমিক ১০ শতাংশে নেমে আসে—এটি অন্তত গত চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। তাই এটা পরিস্কার যে বিনিয়োগের অবস্থা নাজুক।
২০২৫ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রত্যক্ষ নিট বিদেশি বিনিয়োগ ১ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা প্রতাশার চেয়ে কম।
এ ছাড়াও, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষয় করেছে, এবং এটি দ্রুত ও দৃঢ় পদক্ষেপের মাধ্যমে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা একান্ত প্রয়োজন।
আরও পড়ুনমন্ত্রিসভার আকার কেমন হওয়া উচিত?জনগণকে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবো: তারেক রহমানতারেক রহমানের মন্ত্রিসভা ঘিরে আলোচনায় যারানতুন সরকারের কাছে শান্তি ও স্বস্তি চায় সাধারণ মানুষ
‘সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃস্থাপন করা নতুন সরকারের প্রাথমিক পর্যায়ের মূল চ্যালেঞ্জ হবে’, বলেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।
তিনি বলেন, এই অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের পাশাপাশি সরকারকে সব নাগরিকের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে টেকসই বৃদ্ধি ও বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
ড. হোসেনের মতে, এই চ্যালেঞ্জগুলো দক্ষভাবে মোকাবিলা করা নতুন সরকারের জনআস্থা বজায় রাখা এবং দেশি ও বিদেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মূল্যস্ফীতির লাগাম টানাগত কয়েক মাসে মুদ্রাস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে উচ্চহারে রয়েছে। কিন্তু মানুষের প্রকৃত আয় বাড়েনি বরং অপরিবর্তিত রয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবনের খরচ বহন করতে দারুণ কষ্টে ভুগছেন। দেশের মানুষকে স্বস্তি দিতে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে নতুন সরকারের জন্য এই বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধান করা জরুরি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুসারে, ডিসেম্বর মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশে, যা নভেম্বরে ছিল ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ধারায় ফিরানোবিদেশি মুদ্রা আয়ের সর্ববৃহৎ উৎস রপ্তানি আয় গত পাঁচ বছরে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মুখোমুখি হয়েছে। যদি এই পতন দীর্ঘায়িত হয়, তবে দেশের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য চাপের মুখে পড়বে, কারণ এই খাতটি সর্বাধিক কর্মসংস্থান প্রদান করে। তাই রপ্তানি পুনরুজ্জীবিত করা নতুন সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে, যা প্রতিযোগিতা পুনঃস্থাপন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য জরুরি ও কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের দাবি রাখে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুসারে, ২০২৬ সালের প্রথম মাস জানুয়ারিতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যেখানে গত বছরের একই সময়ে তা ছিল ৪ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে রপ্তানি আয় ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ কমে ২৮ দশমিক ৪১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২৮ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
রপ্তানি বর্তমানে নেতিবাচক ধারার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা অর্থনীতির জন্য মোটেও শুভ লক্ষণ নয়—এমন মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক ফয়সাল সামাদ।
তিনি বলেন, শপথ গ্রহণের পরপরই সরকারকে কোনো বিলম্ব না করে কার্যকর পুনরুদ্ধার পরিকল্পনায় মনোযোগ দিতে হবে। অন্যথায় দেশকে বড় ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়তে হবে এবং নির্ধারিত উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হতে পারে।
রাজস্ব আয় বাড়ানোরাজস্ব সংগ্রহ লক্ষ্য পূরণের তুলনায় অনেক কম থাকার কারণে সরকারের ব্যয় বহনের সক্ষমতা চাপের মুখে রয়েছে। রাজস্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি না পেলে রাষ্ট্রীয় ব্যয় নির্বাহ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে নতুন সরকারের জন্য। তবে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি মূলত বাণিজ্য ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভরশীল। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগ সচল না হলে রাজস্ব বৃদ্ধি করা অনেক কঠিন হয়ে যাবে।
জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ২ লাখ ৩১ হাজার ২০৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ২২৯ কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৪৫ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকার বেশি। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, অপ্রত্যক্ষ কর বাড়ালে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়বে। তাই করজাল সম্প্রসারণ, ডিজিটালাইজেশন, কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও দুর্নীতি কমানো—এসব পদক্ষেপ নিতে হবে। উন্নয়ন বাজেট অযথা বড় না করে চলমান প্রকল্প দ্রুত ও সাশ্রয়ীভাবে শেষ করার ওপর জোর দেওয়া উচিত।
আরও পড়ুনযে কোনো মূল্যে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে: তারেক রহমাননতুন সরকারের শপথে ভারত, চীনসহ ১৩ দেশের সরকারপ্রধানকে আমন্ত্রণমন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদের নিয়োগ বাতিলমন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্বে সিরাজ উদ্দিন মিয়া
আর্থিক খাতে শৃঙ্খলারাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ড ব্যাংক খাতকে দিশাহীন অবস্থায় পৌঁছে দিয়েছে, যার ফলে অপরিশোধিত ঋণ (এনপিএল) আকাশছোঁয়া বৃদ্ধি পেয়েছে। সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে এনপিএল প্রায় ৩৬ শতাংশ (৬.৪৪ লাখ কোটি টাকা) পৌঁছেছে। অর্থনৈতিক খাত সংকটের মধ্যে থাকলেও, গণঅভ্যুত্থানের পর কিছু সংস্কার কার্যকর হয়েছে, যার ফলে খাতটি অর্থপাচার রোধ করতে সক্ষম হয়েছে।
‘শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল না করতে পারলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব নয়’—এমন মন্তব্য করেছেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, প্রথমেই আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থাননতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি কিছুটা স্থবির হয়ে পড়েছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে গত কয়েক বছরে নতুন বিনিয়োগ ব্যাহত হয়েছে, যার ফলে কিছু বিদ্যমান কর্মসংস্থানও হারিয়ে গেছে। গণঅভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি আরও তীব্র আকার ধারণ করে। এর ফলস্বরূপ দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি পেয়েছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) সাম্প্রতিক জাতীয় পর্যায়ের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২২ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, চরম দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি পেয়ে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা আগে ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
সুতরাং, নতুন সরকারের উচিত নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়নের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করার ওপর জোর দেওয়া।
অন্যথায়, পর্যাপ্ত চাকরি ও আয়বর্ধক সুযোগের অভাবে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে এবং অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা, ফাইল ছবি
বাজেট ঘোষণানতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথগ্রহণের পর সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য একটি বৃহৎ বাজেট ঘোষণা করবে। অর্থবছর ২০২৫-২৬ জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা বাজেট ঘোষণা করেছিল।
সেক্ষেত্রে নতুন বাজেটের জন্য তহবিল পরিচালনা এবং জনগণের আশা ও প্রত্যাশা অনুযায়ী—যেমন তারা তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখ করেছিল—বাজেট প্রস্তাব করা নতুন সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
‘শপথ গ্রহণের পর নতুন সরকারের সামনে আগামী অর্থবছরের জন্য জনগণের প্রত্যাশা প্রতিফলিত করে এমন একটি বাজেট প্রণয়নের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। তবে তহবিল ব্যবস্থাপনা ও অর্থ সংগ্রহই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ’—এমন মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তিনি অগ্রাধিকারভিত্তিক খাতে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান, যাতে জনগণ দৃশ্যমান পরিবর্তন অনুভব করতে পারে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
আরও পড়ুনআজ থেকে আমরা সবাই স্বাধীন: তারেক রহমানকবে গঠিত হবে নতুন সরকার?মন্ত্রীদের শপথ অনুষ্ঠানে দাওয়াত পাবেন এক হাজার মানুষনতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ মঙ্গলবার বিকেলে
এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ও শুল্কমুক্ত প্রবেশবাংলাদেশ ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পথে। এলডিসি থেকে উত্তরণের ফলে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারানোর ফলে রপ্তানি খাতে সম্ভাব্য ধাক্কা মোকাবিলার প্রস্তুতি এখন থেকেই নিতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ীরা উত্তরণের সময়সীমা কিছুটা পিছিয়ে দেওয়ার যে দাবি তুলছেন, তা সরকার বিবেচনা করতে পারে।
তৈরি পোশাক খাত, যা মোট রপ্তানির প্রায় ৮৩ শতাংশ জোগান দেয়, সেটিকে বৈচিত্র্যময় ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা মনে করেন, সামগ্রিকভাবে উত্তরণের প্রভাব কমাতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আলোচনা ও বাণিজ্য চুক্তির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া প্রয়োজন। প্রধান রপ্তানি গন্তব্যগুলোর সঙ্গে সমঝোতা ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ/এফটিএ) সম্পাদনের মাধ্যমে শুল্ক সুবিধা আংশিকভাবে ধরে রাখা এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
একই সঙ্গে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ সংস্কারের মাধ্যমে উত্তরণের চ্যালেঞ্জকে সুযোগে রূপান্তর করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ের পর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রথম সংবাদ সম্মেলন, ফাইল ছবি
কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জবেশ কিছু বছর ধরে দেশের পররাষ্ট্রনীতি কিছুটা দুর্বল ছিল এবং নির্দিষ্ট কিছু দেশের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট বলেও সমালোচনা রয়েছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর এ নীতিমালা এখনও সুসংহত রূপ পায়নি; বরং কিছু ক্ষেত্রে আরও অবনতির লক্ষণ দেখা গেছে।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষার জন্য পররাষ্ট্রনীতিতে দ্রুত, সুপরিকল্পিত ও ভারসাম্যপূর্ণ সংস্কার গ্রহণ করা জরুরি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদের মতে, নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পররাষ্ট্রনীতি চ্যালেঞ্জ হবে ভারতের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা। আগের সরকারের সময়ে অনেক সম্পর্ক স্থবির হয়ে পড়েছিল, তাই সেগুলো নতুনভাবে সক্রিয় করা জরুরি। তবে বেশিরভাগ সহযোগী দেশের সঙ্গে যোগাযোগ আগে থেকেই রয়েছে, ফলে শুরুটা একেবারে শূন্য থেকে করতে হবে না।
তিনি মনে করেন, ঠাণ্ডা মাথায় ও সতর্ক কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে, বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ, কারণ বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের নীতিনির্ধারণে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বহুপাক্ষিক সংলাপ ও বিভিন্ন পর্যায়ের কূটনৈতিক চ্যানেল সক্রিয় রাখার পরামর্শ দেন তিনি। সাম্প্রতিক চুক্তিগুলো ভালোভাবে পর্যালোচনা করে ইতিবাচক দিকগুলো কাজে লাগানো এবং নেতিবাচক অংশ সংশোধনের ওপর জোর দেন তিনি।
এছাড়া রাশিয়া, চীন, জাপানসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্ক নতুন করে গতিশীল করার প্রয়োজন রয়েছে।
মুন্সি ফয়েজ আহমেদের মতে, ভারসাম্যপূর্ণ, মর্যাদাপূর্ণ ও বাস্তবমুখী কূটনীতি অনুসরণ করলে বড় সংকট তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম।
আইএইচও/এমএমএআর