যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির ফলে বাংলাদেশ কী পাবে, কী দেবে?

ইব্রাহীম হুসাইন অভি
ইব্রাহীম হুসাইন অভি ইব্রাহীম হুসাইন অভি
প্রকাশিত: ১২:৩১ পিএম, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এআরটি স্বাক্ষরিত হয়েছে, ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড (এআরটি)’ স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। হোয়াইট হাউসের ঘোষণা অনুযায়ী, এই চুক্তির মাধ্যমে উভয় দেশের রপ্তানিকারকদের জন্য বাজারে প্রবেশ সহজ হবে এবং বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সহযোগিতা জোরদার হবে। প্রাথমিকভাবে এর ফলে চূড়ান্তভাবে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্কের হার ১ শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে।

চুক্তিটি ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন ফোরাম অ্যাগ্রিমেন্টের (টিকফা) ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে এবং এর আলোকে বাস্তবায়িত হবে বলে জানা গেছে।

স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে—এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ কী পাবে এবং যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে কী লাভ করবে। যদিও প্রাথমিকভাবে পারস্পরিক শুল্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ১ শতাংশ হ্রাসের সুবিধা পেয়েছে, তবে এর বাইরেও উভয় দেশের জন্য আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও স্বার্থ জড়িত রয়েছে।

পারস্পরিক বাণিজ্য সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ চুক্তি বিষয়ে যৌথ বিবৃতি তথ্যানুসারে তা তুলে ধরা হলো।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি

বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন সোমবার ঢাকায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষ থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টা শুল্ক চুক্তি (এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান এ সময় উপস্থিত ছিলেন। ছবি: পিআইডি

চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রকে যা দেবে

এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেডের আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা দিতে সম্মত হয়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে—রাসায়নিক দ্রব্য, চিকিৎসা সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি, মোটরযান ও যন্ত্রাংশ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সরঞ্জাম, জ্বালানি পণ্য, সয়াবিন, দুগ্ধজাত পণ্য, গরুর মাংস, পোলট্রি, বাদাম ও ফল।

এছাড়া বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানিকারকদের জন্য দীর্ঘদিনের কিছু অশুল্ক বাধা দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর আওতায় বাংলাদেশ মার্কিন নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান অনুযায়ী তৈরি গাড়ি গ্রহণ করবে, মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অনুমোদিত ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম গ্রহণ করবে এবং পুনর্নির্মিত (রিম্যানুফ্যাকচারড) পণ্যের ওপর আমদানি নিষেধাজ্ঞা ও লাইসেন্সিং বাধা তুলে নেবে।

ডিজিটাল বাণিজ্য সহজ করতে বাংলাদেশ সীমান্তপারের তথ্য প্রবাহের অনুমতি দেবে এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় ইলেকট্রনিক ট্রান্সমিশনের ওপর শুল্কমুক্ত নীতি বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নেবে। পাশাপাশি কাস্টমস প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজেশন এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামো আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশে বাংলাদেশ যা পাবে

চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্কহার কমিয়ে ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করবে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে শূন্য শতাংশ শুল্ক সুবিধা দেওয়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্যের জন্য বিশেষ শুল্ক সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট পরিমাণ পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য শুল্কমুক্তভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবে। তবে এই সুবিধা যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহারের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবে।

ইপিএ চুক্তি: সেবাখাতে জাপানের ভালো বিনিয়োগ প্রত্যাশা বাংলাদেশের

যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কিছু বস্ত্র ও পোশাকপণ্য পারস্পরিক শুল্কের ক্ষেত্রে শূন্য হারের সুবিধা পাবে। এই ব্যবস্থার আওতায় বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত নির্দিষ্ট পরিমাণ পোশাক ও বস্ত্রপণ্য হ্রাসকৃত এই শুল্কহারে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবে। তবে এই পরিমাণ নির্ধারিত হবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রপ্তানিকৃত বস্ত্রজাত পণ্যের রপ্তানি পরিমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে—যেমন যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা এবং কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক বস্ত্র উপকরণ।

বিনিয়োগ ও আর্থিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে

যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক এবং ইউএস ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ সহায়তা বিবেচনা করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশকে যা করতে হবে

চুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ শ্রমিকদের সংগঠন করার অধিকার এবং যৌথ দরকষাকষির সুযোগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে জোরপূর্বক শ্রম দিয়ে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ সুরক্ষা জোরদার, পরিবেশ আইন কার্যকর প্রয়োগ, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও ভর্তুকি সংক্রান্ত বাজার বিকৃতি কমানোর বিষয়েও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সই, শুল্ক কমেছে ১ শতাংশ

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী মেধাস্বত্ব সুরক্ষা জোরদার এবং দুর্নীতি দমন আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে বড় আকারে পণ্য আমদানি করা হবে

চুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে কয়েকটি বড় বাণিজ্যিক ক্রয়ের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—বিমান ক্রয়, প্রায় ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য (গম, সয়াবিন, তুলা ও ভুট্টা) আমদানি এবং আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য ক্রয়।

সরবরাহ চেইন ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার

চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ সরবরাহ চেইন নিরাপত্তা, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, শুল্ক ফাঁকি প্রতিরোধ এবং অন্যায্য বাণিজ্য কার্যক্রম মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে।

আইএইচও/এমএমএআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।