ডিজিটাল ক্লাসরুম, ট্যাব হাতে শিশু, অনলাইন অ্যাসাইনমেন্ট - আধুনিক শিক্ষার একটি পরিচিত ছবি। কিন্তু যদি বলা হয়, ইউরোপের অন্যতম প্রযুক্তিনির্ভর দেশ এখন আবার বই, খাতা আর হাতের লেখায় ফিরছে? কিন্তু কেন এমন সিদ্ধান্ত?
সুইডেন কয়েক বছর ধরে বিশ্বের সবচেয়ে ডিজিটালাইজড শিক্ষাব্যবস্থার একটি ছিল। প্রি-স্কুল ও প্রাথমিক স্তরে ট্যাব ও ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক নীতিগত পরিবর্তনে দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায় - প্রাথমিক শ্রেণিতে মুদ্রিত বই, কাগজভিত্তিক পাঠ ও হাতের লেখাকে আবার গুরুত্ব দেওয়া হবে। সরকার পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণে বড় অঙ্কের বিনিয়োগও করেছে।
তবে লক্ষ্য প্রযুক্তি বাদ দেওয়া নয়; বরং প্রযুক্তিকে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা - প্রতিস্থাপক হিসেবে নয়।
কেন এই পরিবর্তন?চিকিৎসা ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাধিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্ক্রিননির্ভরতা শিশুদের পড়ার গভীরতা ও মনোযোগে প্রভাব ফেলছে। ক্যারোলিনস্কা ইন্সটিটিউটের গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শিশুরা ইন্টারফেস ব্যবহারে দক্ষ হলেও জটিল পাঠ্য বুঝতে প্রয়োজনীয় ডিপ রিডিং দক্ষতায় পিছিয়ে পড়ছে।
শুধু তাই নয়, হাতের লেখা কমে যাওয়ায় সূক্ষ্ম মোটর স্কিলেও দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। গবেষণায় বলা হয়, কাগজে লেখা ও বই হাতে নিয়ে পড়া মস্তিষ্কের ভিন্ন স্নায়ুপথ সক্রিয় করে, যা স্মৃতিধারণ ও মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়ক। স্ক্রিনে স্ক্রল করার অভ্যাস অনেক সময় তথ্যের ওপর দ্রুত চোখ বুলিয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি করে, যা গভীর মনোযোগ নয়।
২০২৬ থেকে কী বদলাবে?২০২৬ সাল থেকেই ধাপে ধাপে এই অ্যানালগ ফিরিয়ে আনা কার্যকর হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের বই পড়া, হাতে লেখা অনুশীলন ও কাগজভিত্তিক শেখার ওপর জোর দেওয়া হবে। কম্পিউটার ও ডিজিটাল টুল থাকবে, তবে সম্পূরক হিসেবে।
নীতিনির্ধারকদের লক্ষ্য - শিশুদের ভিত্তিগত সাক্ষরতা ও মনোযোগ পুনর্গঠন করা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ছোটবেলায় মনোযোগ ও গভীর পাঠের অভ্যাস তৈরি না হলে পরবর্তী জীবনে জটিল বিষয় বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রেসুইডেনের এই পদক্ষেপ এখন আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থার আলোচনায়। প্রযুক্তি কি শেখার একমাত্র পথ? নাকি বই-খাতার সঙ্গে ভারসাম্যই আসল সমাধান?
ডিজিটাল দুনিয়ায় বেড়ে ওঠা শিশুদের জন্য প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি দক্ষতা প্রয়োজন, কিন্তু তার সঙ্গে মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও বিশ্লেষণী ক্ষমতার ভারসাম্যও সমান জরুরি।
সুইডেন তাই এক নতুন বার্তা দিচ্ছে - শেখার ভবিষ্যৎ হয়তো পুরোপুরি ডিজিটাল নয়; বরং ডিজিটাল ও অ্যানালগের সুষম মেলবন্ধন।
সূত্র: সুইডিশ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিগত ঘোষণা, কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট গবেষণা প্রতিবেদন, বিবিসি নিউজ, দ্য গার্ডিয়ান রিপোর্টস
এএমপি/এএসএম