খেলাধুলা

নতুন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুলের সামনে যত চ্যালেঞ্জ

 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্যের শপথ এবং মন্ত্রী পরিষদের সদস্যদের শপথের মধ্যে দিয়ে মঙ্গলবার যাত্রা শুরু করেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার। বিএনপি নির্বাচনে জিতলে দলটির যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক সাবেক তারকা ফুটবলার আমিনুল হক এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাবেন, সেই আলোচনা ছিল দীর্ঘদিনের। তবে সংসদ নির্বাচনে আমিনুল হেরে গেলে আলোচনার ডালপালা ছড়িয়েছিল বিভিন্নজনকে নিয়ে। তবে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী পরিষদে রেখেছেন আমিনুলকে এবং তাকে দিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সবচেয়ে অবহেলিত ছিল ক্রীড়াঙ্গন। জুলাই আন্দোেলনের সম্মুখ সারিতে থাকা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার হাতে ছিল যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। গত ১৮ মাসে দেশের ক্রীড়াঙ্গন ছিল এক প্রকার থমকে ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ক্রীড়াঙ্গন ভরে ছিল দলীয়করণে। সেখান থেকে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ক্রীড়াঙ্গনকে বের করতে গিয়ে কিছু অযোগ্য লোককে এই সেক্টরে এনেছিলেন। যাদের অদক্ষতায় ক্রীড়াঙ্গন হয়ে উঠেছিল স্থবির।

আমিনুল হকের সামনে প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ হবে স্থবির ক্রীড়াঙ্গনে প্রাণ ফিরিয়ে আনা। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে কিছু সাফল্য আসলেও তা ছিল পূর্বের ধারাবাহিকতায়। বরং দেশের অন্যতম প্রধান খেলা ক্রিকেটের সর্বনাশই হয়েছে বিগত ১৮ মাসে। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া উপদেষ্টার দায়িত্ব ছাড়ার পর প্রফেসর আসিফ নজরুলের হাতে ছিল ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।

আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বিসিবিতে যে বিশৃঙ্খলার বীজ বপন করেছিলেন, সেই বিশৃঙ্খলায় পানি দিয়ে আরো জটিল করেছেন আসিফ নজরুল। বাংলাদেশের ক্রীড়ার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলা হয়নি আসিফ নজরুলের হটকারী সিদ্ধান্তে। ভারতে না খেলার জিদ ধরেছিল সরকার। ফলে আইসিসি বাংলাদেশকে বাদ দিয়েই আয়োজন করে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ।

ক্রিকেট বোর্ডে নানা রঙ্গ হয়েছে বিগত ১৮ মাসে। দুইজন সভাপতি দায়িত্ব পালন করেছেন এ সময়। এমন কিছু মানুষ বোর্ড পরিচালক হয়েছেন তাদের কোনো যোগ্যতা নেই। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সাথে কিংবা তার আশপাশের মানুষের সাথে সম্পর্ক থাকা ব্যক্তিরা ক্রিকেট বোর্ডসহ অন্যান্য ফেডারেশনে জায়গা করে নিয়েছেন। অনেক ফেডারেশনে এমন ব্যক্তিদের সাধারণ সম্পাদক বানানো হয়েছে যাদের পক্ষে ক্রীড়াঙ্গন পরিচালনা সম্ভব না।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিসিবিসহ বিভিন্ন ফেডারেশনে অসংগঠক ও অদক্ষদের দিয়ে সাজিয়েছে। আমিনুল হকের প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে ক্রীড়াঙ্গনকে নতুন করে সাজানো। প্রকৃত ও দক্ষ সংকঠকদের হাতে ক্রীড়াঙ্গন ফিরিয়ে দেওয়াই হবে আমিনুলের প্রথম কাজ। আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতায় কিছু বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ অংশ নিলেও ঘরোয়া ক্রীড়াঙ্গন থমকে আছে দেড় বছর ধরে। ঘরের খেলা সচল করতে আমিনুলকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

অন্তর্বতী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ক্রীড়াঙ্গন পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। নির্বাচিত কমিটি আছে হাতেগোনা কয়েকটিতে। বাকি সব ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশন চলছে অ্যাডহক কমিটি দিয়ে। ক্রীড়াঙ্গনে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে ফেডারেশনগুলোয় নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। তার মাধ্যমে প্রকৃত সংগঠকদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আমিনুল হক একটি কথা জোর দিয়ে বলেছিলেন, ক্রীড়াঙ্গন হবে রাজনীতিমুক্ত। তবে অনেকে আমিনুলের এ বক্তব্যের সাথে একমত না। কারণ, অনেক সংগঠক আছেন যারা রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। তারা যোগ্য হলেও ক্রীড়াঙ্গনের বাইরে রাখার সুযোগ নেই। তাই দলমত নির্বিশেষে প্রকৃত সংগঠকদের বাছাই করাই হবে আমিনুলের আরেকটি চ্যালেঞ্জ।

দেশের অন্যতম প্রধান দুই খেলা ক্রিকেট ও ফুটবলের দুইরকম সমস্যা নিয়ে কাজ করতে হবে আমিনুল হককে। আমিনুল কেবল একজন ফুটবলারই ছিলেন না, রীতিমত তারকা ছিলেন। দেশের সেরা কয়েকজন গোলরক্ষকের তালিকা করলে ওপরের দিকে থাকবে আমিনুলের নাম।

ফুটবলার হিসেবে দেশের জনপ্রিয় খেলাটির উন্নতি তিনি চাইবেন নিশ্চয়ই। গত বছর হামজা দেওয়ান চৌধুরী ও শামিত সোমের আগমনের পর দেশের ফুটবলে নতুন জোয়ার আসলেও জাতীয় দলের ফলাফল আশাব্যঞ্জক নয়। ভারতের বিপক্ষে জয়টি বাংলাদেশের এশিয়ান কাপের এখন পর্যন্ত একমাত্র অর্জন। ৩১ মার্চ সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ম্যাচের ফলাফল কী হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

এদিকে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয খেলা ক্রিকেট ভুগছে নেতৃত্ব সংকটে। নাজমুল হাসান পাপন পালিয়ে যাওয়ার পর দুইজন বসেছেন সভাপতির চেয়ারে। ফারুক আহমেদের পর আমিনুল ইসলাম বুলবুল। তবে নতুন বোর্ডের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দূরত্ব তৈরি হয়েছে দেশের শীর্ষ ক্লাবগুলোর। তাই ঘরোয়া ক্রিকেট স্থবির হয়ে পড়েছে। আমিনুলের সামনে অনেক বড় একটা চ্যালেঞ্জ বিসিবির নেতৃত্ব ঠিক করা এবং দেশের জনপ্রিয় এই খেলাটিকে সচল করা। তবে এখানে যে সমস্যা, চাইলেই পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নতুন পরিচালনা পর্ষদ তৈরি সম্ভব নয়। এখানে আইসিসির নিয়মকানুন অনুসরণ করতে হবে।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে এমনিতেই আইসিসির সাথে একটা ঝামেলা তৈরি হয়েছে। এই সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে সঠিক নেতৃত্ব বসাতে হবে। সেটাই একটা চ্যালেঞ্জই হবে আমিনুলের জন্য। ক্রিকেটের মতো সমস্যা আবার নেই ফুটবলের। আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া সব খেলায় চলছে ঠিকঠাক। জাতীয় দল বাদে অন্য ক্ষেত্র থেকে সাফল্যও আসছে। তবে জাতীয় দলের সাফল্য পাওয়ার জন্য আমিনুলের ব্যক্তিগত একটা পরিকল্পনা নিশ্চয়ই থাকবে। ফুটবলানুরাগীরা চাইবেন একজন ফুটবলারের হাতে দেশের ক্রীড়াঙ্গনের দায়িত্ব, তার নেতৃত্বে ফুটবল মাঠেও জয়গান হোক। আর ক্রিকেটের বিশৃঙ্খলা দূর করে সঠিক নেতৃত্বে এনে মাঠে খেলা ফেরাতে হবে নতুন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীকে। ক্লাবগুলোকে আনতে হবে আস্থার মধ্যে।

আরআই/এমএমআর