রমজানের বেশ কয়েকদিন আগে থেকে ভোগ্যপণ্যের দামে সুসংবাদ দিয়ে আসছিলেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু রোজা শুরুর আগ মুহূর্তেই বাজারে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। পাইকারি ও খুচরা দুই বাজারেই রোজার স্বাভাবিক ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। বিশেষ করে ছোলা, মটর, মশুর ও খেজুরের দাম বেড়েছে।
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, বন্দরের ধর্মঘট এবং নির্বাচনের কারণে অফিস-আদালত বন্ধ থাকার প্রভাব পড়েছে বাজারে। অন্যদিকে বাংলাদেশে আসার পথে থাইল্যান্ডে পণ্যবাহী জাহাজ ডুবে যাওয়ায় খেজুরের দামে প্রভাব পড়েছে। ওই জাহাজে প্রায় দেড়শ কনটেইনার খেজুর ছিলো বলে দাবি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের।
ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবার বাজারে পণ্যের জোগান বেশি। ডলার সংকট কেটে ওঠার পর ঋণপত্রের (এলসি) জটিলতা দূর হওয়ায় চলতি বছর অনেক ব্যবসায়ী নতুন করে আমদানিতে যুক্ত হয়েছেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও পণ্যের দাম কম রয়েছে। গত বছরের তুলনায় সব ধরনের পণ্যের দাম কম। তবে গত ১৫ দিনের ব্যবধানে পণ্যের দাম স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমদানিকৃত ছোলা খালাস হয়েছে ২ লাখ ১৭ হাজার ২২০ টন। গত অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ৯৯ হাজার ৬৩৭ টন। গত অর্থবছরের তুলনায় এ বছরের একই সময়ে ১৭ হাজার ৫৮৩ টন ছোলা বেশি আমদানি হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও পাকিস্তান থেকে ছোলা আমদানি হয়।
একই সময়ে আমদানিকৃত মশুর ডাল খালাস হয়েছে ৩ লাখ ১৯ হাজার ৩৬ টন। গত অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ৩ লাখ ৮১ হাজার ৯৫৩ টন মশুর ডাল। এতে বছরের একই সময়ে ৬২ হাজার ৯১৬ টন কম আমদানি হয়। তবে আগের বছরের আমদানিকৃত মশুর এ বছরের শুরুর কয়েকমাস বাজারে ছিলো বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ভারত ও অস্ট্রেলিয়া থেকে বেশিরভাগ মশুর ডাল আমদানি হয়। পাশাপাশি নেপাল থেকেও কিছু মশুর আসে বাংলাদেশে।
আরও পড়ুনরোজায় সারাবিশ্বে মূল্যহ্রাস চলে, আর বাংলাদেশে?রোজার ছুটির জটিলতা কাটেনি, ‘আপাতত’ খোলা থাকছে স্কুল৪৫০ ট্রাকে মিলবে টিসিবির পণ্য, ছোলা ৬০ ও খেজুর বিক্রি হবে ১৬০ টাকায়রমজানে শেয়ারবাজারে লেনদেন ১০টা থেকে ১টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত
চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৬৮৩ টন মটর আমদানি হয়েছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ২ লাখ ৫৪ হাজার ৪৫২ টন। গত বছরের তুলনায় একই সময়ে ৩২ হাজার ২৪৮ টন মটর বেশি আমদানি হয়েছে। ভারত, অস্ট্রেলিয়ার পাশাপাশি কানাডা থেকে মটর আমদানি হয় বাংলাদেশে।
চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে ফ্রেশ খেজুর আমদানি হয়েছে ৫১ হাজার ৫৮৪ টন। গত অর্থবছরে একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ৪৪ হাজার ২৮ টন। যা গত বছরের তুলনায় এবার ৭ হাজার ৫৫৬ টন বেশি আমদানি হয়েছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে ৮ লাখ ৫৬ হাজার ৮৯৬ টন, পরিশোধিত পাম অয়েল আমদানি হয়েছে ১৭ লাখ ৯৩ হাজার ১৬৯ টন। গত অর্থবছরের একই সময়ে পাম অয়েল আমদানি হয়েছিল ১৫ লাখ ২৮ হাজার ৪৫ টন। অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম অয়েল মিলে বছরের ব্যবধানে ২ লাথ ৩০ হাজার ৭৬৪ টন বেশি আমদানি হয়েছে।
আরও পড়ুনরমজানে ব্যাংকের অফিস ও লেনদেন সূচিতে পরিবর্তনইফতারের দোয়া, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থরোজায় ৬৫০ টাকায় গরুর মাংস বিক্রি করবে সরকাররোজার নিয়ত, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ
২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপরিশোধিত চিনি আমদানি হয়েছে ২০ লাখ ৩১ হাজার ৩৬২ টন। গত বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ১৭ লাখ ৮১ হাজার ৮৯৪ টন। গত বছরের তুলনায় এবার ২ লাখ ৪৯ হাজার ৪৬৮ টন চিনি বেশি আমদানি হয়েছে।
এদিকে গত ১৭ জানুয়ারি থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এক মাসে আমদানিকৃত ৩৭ হাজার ৫১১ টন ছোলা, ১ লাখ ১৩ হাজার ৬৩৮ টন মশুর, ৩২ হাজার ২৪৮ টন মটর, ২৫ হাজার ৭৪৪ টন খেজুর, ৭ হাজার ১২৪ টন রসুন, ২০ হাজার ৪৫৩ টন আদা, ১ লাখ ৪১ হাজার ৪২৩ টন চিনি, ২ লাখ ২৭ হাজার ২শ টন পরিশোধিত পাম অয়েল এবং ১ লাখ ৪৭ হাজার ৪৩৬ টন অপরিশোধিত সয়াবিন খালাস হয়েছে।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ মো. মহিউদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘বন্দরে ধর্মঘটে পণ্য খালাস বন্ধ ছিল। আবার সংসদ নির্বাচনের কারণে কয়েকদিন অফিস-আদালত টানা বন্ধ ছিল। এতে সপ্তাহের শুরুতে পণ্যের বাজারে হঠাৎ বেচাকেনা বেড়েছে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে রোজার নিত্যপণ্য ছোলা, মশুর, মটর ডালের দাম বেড়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের হাতে প্রচুর পণ্য রয়েছে। রোজা শুরু হলেই খাতুনগঞ্জে পাইকারি বাজারে দাম কমে যাবে।
তিনি বলেন, ‘বন্দরে ধর্মঘট ও লাইটারেজ সংকট থাকায় বহির্নোঙর থেকে খাদ্যপণ্য খালাসে জটিলতা ছিল। এখন সব স্বাভাবিক হয়ে আসছে। গত সপ্তাহ ১০ দিনে ছোলা, মশুর ও মটরের দাম কেজিতে ৫ টাকা করে বেড়েছে। এরমধ্যে মঙ্গলবার খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে অস্ট্রেলিয়ার ছোলা ৮০-৮২ টাকা বিক্রি হচ্ছে। আগে ৭৫-৭৮ টাকা ছিল। তবে ভারতীয় ছোলা বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ৯৫ টাকায়। রোজায় মশুর ডালের চাহিদা বেশি থাকে। মঙ্গলবার প্রতিকেজি অস্ট্রেলিয়ার মশুর ৭৮-৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আগে ৭৪-৭৫ টাকায় বিক্রি হতো। মটর বিক্রি হচ্ছে ৫২ টাকায়। তাছাড়া রেডি চিনি প্রতিমণ ৩৫৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ডিও’র দাম মণপ্রতি ৪০-৫০ টাকা কম।’
আরও পড়ুনরোজায় সংকট ঠেকাতে থাইল্যান্ড থেকে আসবে ১ কোটি ৩৫ লাখ লিটার সয়াবিনরোজায় দাম কমাতে খেজুর আমদানিতে শুল্ক কমালো সরকারদেশের সব মসজিদে একই পদ্ধতিতে খতমে তারাবিহ পড়ার আহ্বানরমজান মাস জুড়ে আদা-রসুন বাটা ভালো রাখার উপায়
এ ব্যবসায়ী বলেন, ‘খাতুনগঞ্জ থেকে জেলা-উপজেলার মুদি দোকানে পণ্য আরও আগে থেকে যাওয়া শুরু হয়েছে। খাতুনগঞ্জে দাম বাড়লেও স্থানীয় বাজারে তেমন বাড়ার কথা নয়। তবে রোজার প্রথম দিন থেকেই এসব পণ্যের দাম কমে আসবে।’
চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজি তৌহিদুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবার খেজুরের আমদানি বেড়েছে। যে কারণে গত বছরের তুলনায় পাইকারি খুচরা দুই বাজারেই খেজুরের দাম কম। তবে গত সপ্তাহে থাইল্যান্ডে সাগরে ডুবে যাওয়া একটি জাহাজে দেড়শ কনটেইনার খেজুর বাংলাদেশে আসছিল। রমজান মাসের একেবারে শুরুতে হওয়ায় ওই খেজুর বাজারে না আসাতে কিছুটা প্রভাব পড়েছে। তবে সব ধরনের খেজুরের দাম বাড়েনি।’
তিনি বলেন, ‘বাজারে ৬০ জাতের খেজুর রয়েছে। এরমধ্যে জাহেদি বস্তা এবং কার্টুন, এ দুই ধরনের খেজুরের দাম কেজিতে ১৫-২০ টাকা বেড়েছে। অন্য সব খেজুরের দাম গত বছরের তুলনায় কম।’
এমডিআইএইচ/এমএমএআর