জাতীয়

চকবাজারের ইফতারি: ঐতিহ্যের স্বাদ নিতে উপচে পড়া ভিড়

পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী চকবাজারের ইফতারি বাজার জমে উঠেছে। এখানকার বিভিন্ন পদের খাবারের চিরচেনা জৌলুস আর সরিষার তেলের পক্ব রান্নার ঘ্রাণ ভোজনরসিকদের টেনে আনে দূর-দূরান্ত থেকে। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) প্রথম রমজানের দিন দুপুর গড়াতেই চকবাজারের শাহী মসজিদের প্রধান সড়ক লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে।

পুরান ঢাকার রিকশা-ভ্যান ও অন্যান্য যানবাহনে ঠাসা ভিড় পেরিয়ে লক্ষ্মীবাজার থেকে শাহী মসজিদ পৌঁছাতে সময় লাগল আড়াই ঘণ্টা। বেলা গড়িয়ে তখন বিকেল ৩টা। শাহী মসজিদের সামনের সড়কে হাকডাক চলছে, এই নিয়ে যান ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ কাবাব, এই লাচ্চি–ফালুদা! এই দিকে, এই দিকে দই বড়া!

চকবাজারের ইফতারি সামগ্রী/ছবি: বিপ্লব দিক্ষীৎ

কথা বলে জানা গেছে, রহমতগঞ্জের বাসিন্দা মোহাম্মদ ইসলাম হাবিবের মতো অনেক পুরোনো বিক্রেতাই এখানে আসেন বড় বড় ‘বোল’ বা গামলা ভরে ইফতারি নিয়ে। ইসলাম হাবিব জাগো নিউজকে বলেন, প্রায় ২০-৩০ বছর ধরে তিনি এখানেই ইফতারি বিক্রি করেন। তিনি বেশ কড়া স্বরেই বলেন, পুরান ঢাকার ইফতারির ঐতিহ্যই আলাদা, ভেজাল পেলে বলে যাবেন।

যেমন খোকন মিয়ার ঐতিহ্যবাহী শাহী দই-বড়া ও বোরহানি, যা দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে চকবাজারের মানুষের তৃপ্ত করে আসছে।

মাসুম ইসলাম নামের দোকানের এক বিক্রেতা তাদের ৩৮ বছরের অভিজ্ঞতার ঝুলি খুলে বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থাইকা আমরা এই চকবাজারে শাহী দই-বড়া আর বোরহানি বেচতাছি। মানুষ বিশ্বাসের ওপর আমাগো কাছে আহে। ৩৮ বছর ধইরা একই স্বাদ ধইরা রাখা সহজ না, তয় আমরা মানের লগে আপস করি না।’

চকবাজারের ইফতারি সামগ্রী/ছবি: জাগো নিউজ

দর-দাম যেমন

খাবারের দামের ক্ষেত্রেও চকবাজারে রয়েছে বৈচিত্র্য। হোটেল আমানিয়ার মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বিশাল ইফতারির তালিকা নিয়ে হাজির হয়েছে। সড়কের ওপর অস্থায়ী দোকানেও মানভেদে ভিন্ন দাম।

এখানে সাধারণ পাকুড়া, আলুর চপ ও বেগুনি মাত্র ১০ টাকায় মিলছে, পাশাপাশি মরিচ ফ্রাই ৫ টাকা, ডিম চপ ২০ টাকা, ডিম টোস্ট ৩০ টাকা, বেগুন টোস্ট ও পাম্পকিন টোস্ট ১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

চিকেন সিংগারা ও চিকেন সমুচা ১৫ টাকা, ঝালি কাবাব ৩০ টাকা, চিকেন কাটলেট ৩০ টাকা এবং বোনলেস চিকেন ফ্রাইও ৩০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। চিকেন ফ্রাই ১৩০ টাকা, আর চিকেন স্টিক ৪০ ও ৮০—দুই দামে বিক্রি হচ্ছে।

রোল, নান ও পরোটার মধ্যেও রয়েছে নানা আয়োজন। সবজি রোল ৩০ টাকা, চিকেন রোল ৪০ টাকা, চিকেন শরমা ৮০ টাকা। প্লেন পরোটা ৩০ টাকা, চিকেন পরোটা ৭০ টাকা, দুধ নান ৭০ টাকা, বাটার নান ৪০ টাকা এবং চিকেন নান ৮০ টাকায় মিলছে। এছাড়া চিকেন আস্থন ২৫ টাকা ও চিকেন সাসলিক ৮০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।

চকবাজারে ইফতারি সামগ্রী কিনতে আসা মানুষের ভিড়/ছবি: জাগো নিউজ

গ্রিল ও রোস্ট আইটেমে রয়েছে আভিজাত্যের ছোঁয়া। লেগ রোস্ট ৩২০ টাকা, আস্ত লেগ রোস্ট ৮০০ টাকা, চিকেন গ্রিল ফুল ৪৮০ টাকা, চিকেন আলফাহাম ৫২০ টাকা, কোয়েল রোস্ট ১২০ টাকা, কবুতর রোস্ট ৩০০ টাকা এবং আস্ত চিকেন রোস্ট ৪২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মিষ্টান্নেও কমতি নেই। দই-চিড়া প্রতি বাটি ১০০ টাকা, ফালুদা ছোট বাটি ১২০ টাকা এবং বড় বাটি ৫০০ টাকা। রেশমি জিলাপি ৫০০ টাকা কেজি এবং সাধারণ জিলাপি ২৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পানীয়ের মধ্যে বোরহানি প্রতি লিটার ২০০ টাকা, হাফ লিটার ১০০ টাকা এবং ঐতিহ্যবাহী লাবাং প্রতি লিটার ২৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। ছোলাবুট প্রতি কেজি ২৪০ টাকা।

সব মিলিয়ে ঐতিহ্যের স্বাদ আর আধুনিকতার মিশেলে চকবাজারের ইফতার বাজার আবারও প্রমাণ করেছে, কেন এটি ঢাকাইয়া সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

যা বলছে ক্রেতা-বিক্রেতা

বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে হোটেল আমানিয়ার একজন বিক্রেতা বলেন, জিনিসপত্রের দাম যে হারে বাড়ছে, তাতে ব্যবসা করা কঠিন। তাও আমাগো কাস্টমাররা পুরান ঢাকার মানুষ, তারা দামের চেয়ে স্বাদ খুঁইজা পায় বেশি। এবার আমরা চিকেন আলফাহাম ৫২০ টাকা আর আস্ত চিকেন রোস্ট ৪২০ টাকায় দিচ্ছি, যা অন্য কোথাও এই দামে পাওয়া মুশকিল।

চকবাজারের ইফতারি সামগ্রী/ছবি: বিপ্লব দিক্ষীৎ

ইফতারি কিনতে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ বলেন, চকের ইফতারি মানেই তো অন্যরকম ভাইব। জিলাপি ছাড়া তো ইফতার জমেই না। এখানে ৫০০ টাকার রেশমি জিলাপি যেমন আছে, আবার সাধারণ জিলাপিও ২৮০ টাকায় পাওয়া যায়। দাম একটু বেশি মনে হলেও ভিড় দেখে বোঝা যায়, মানুষ চকের খাবার কত পছন্দ করে।

অন্যদিকে, দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রবীণ ক্রেতা আলহাজ মকবুল হোসেন স্মৃতিকাতর হয়ে বলেন, আগে তো লাবাং আর বড় বাটির ফালুদাই ছিল প্রধান আকর্ষণ। এখন আইটেম অনেক বাড়ছে। ২৫০ টাকার লাবাং আর ৫০০ টাকার বড় ফালুদা নিয়া বাসায় যামু, নাতি-নাতনিরা পথ চাইয়া বইসা আছে।

এমডিএএ/এমএমকে