সারাদিনের ক্লান্তি শেষে আরাম করে ঘুমোতে যান, ঠিক সেই সময়ই কানের কাছে ভেসে আসে মশার গান। যেন আপন মনে মশা আপনাকে গান শোনানোর অপেক্ষাতেই ছিল। মুহূর্তেই বিরক্তি চরমে ওঠে। মনে হয় যেন মশাটা ইচ্ছে করেই আমাদের বিরক্ত করতে এসেছে। কিন্তু আসলে ব্যাপারটা মোটেও তা নয়; এই গুনগুন শব্দের পেছনে রয়েছে একেবারে বৈজ্ঞানিক কারণ।
আমরা যে শব্দ শুনি, সেটি আসলে মশার ডানা ঝাপটানোর শব্দ। মশার ডানা খুব দ্রুত কাঁপে, আর সেই দ্রুত কম্পন থেকেই তৈরি হয় এই গুনগুন আওয়াজ। স্ত্রী মশা প্রতি সেকেন্ড পাঁচ শ বারের মতো ডানা ঝাপটায় এবং এই শব্দের ফ্রিকোয়েন্সি ৪৫০-৫০০ হার্টজ। পুরুষ মশার শব্দের ফ্রিকোয়েন্সি কিন্তু স্ত্রী মশার চেয়েও বেশি।
মশার এই প্যানপ্যান শব্দ আমাদের কাছে অত্যন্ত বিরক্তিকর মনে হলেও পুরুষ মশার কাছে সুমধুর! মিলনের জন্য যখন পুরুষ মশা স্ত্রী মশার খোঁজে থাকে, তখন তারা এই শব্দ শুনেই সঙ্গী বাছাই করে।
আমেরিকার অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মাইকেল রিহলের তথ্য অনুযায়ী আমরা সাধারণত স্ত্রী মশার শব্দই বেশি শুনি। কারণ পুরুষ মশা মানুষের রক্ত খায় না তারা ফুলের মধু খেয়েই বেঁচে থাকে। স্ত্রী মশাই রক্ত পান করে, কারণ মিলনের পর ডিম তৈরি করার জন্য তাদের অতিরিক্ত শক্তি দরকার হয়।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মশা আমাদের খুঁজে পায় কীভাবে? আসলে মানুষ শ্বাস নেওয়ার সময় কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়ে, আর স্ত্রী মশা এই গ্যাস দূর থেকেই শনাক্ত করতে পারে। তাই তারা মুখ, নাক বা কান সংলগ্ন জায়গার আশপাশে বেশি উড়তে থাকে। ফলে আমাদের মনে হয় যেন তারা ইচ্ছা করে কানের কাছে এসে গান গাইছে।
আবার যাদের ত্বকের রং গাঢ়, তাদের প্রতিও স্ত্রী মশারা বেশি আকৃষ্ট হয়। এছাড়া কোনো কোনো মানুষের শরীরের গন্ধের ওপরও নির্ভর করে কোন মশা তাদের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হবে, আর কোন মশা কম আকৃষ্ট হবে। যেসব পুরুষের ত্বকে কম বৈচিত্র্যময় ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি থাকে, স্ত্রী মশারা তাদের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়।
মশা পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই আছে। তবে অবাক করা বিষয় হলো, আইসল্যান্ড পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে প্রাকৃতিকভাবে মশা নেই। দেশটির ঠান্ডা জলবায়ু ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য মশার জীবনচক্র টিকিয়ে রাখতে দেয় না। তাই সেখানে বসবাসকারী মানুষ বা পর্যটকদের এই বিরক্তিকর গুনগুন শুনতে হয় না।
মশার উপস্থিতি শুধু বিরক্তির কারণ নয়, এটি স্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়ার মতো রোগ ছড়ানোর জন্য মশা দায়ী। তাই ঘরের আশপাশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি সরানো, মশারি ব্যবহার করা এসব অভ্যাস খুবই জরুরি।
অন্যদিকে মশার কানের কাছে গুনগুন করা আসলে তাদের দুষ্টুমি নয়, বরং বেঁচে থাকা ও বংশবিস্তার করার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। তবু মানুষের দৃষ্টিতে সেটি বিরক্তিকর কারণ আমাদের ঘুমের সবচেয়ে শান্ত মুহূর্তটাই তারা বেছে নেয় গান শোনানোর জন্য।
আরও পড়ুনপানি নয়, এই রেস্তোরাঁয় খাওয়ার পর হাত ধোয়ানো হয় চকলেটেসবার আঙুলের ছাপ আলাদা কেন?
কেএসকে