লাইফস্টাইল

রমজানে মুড়ি মাখায় জিলাপি খাবেন, না এড়াবেন?

বাঙালির ইফতার মানেই এক বিশাল বাটিতে মুড়ি মাখা। ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ, কাঁচা মরিচ, শসা, টমেটো, ধনেপাতা আর সরিষার তেল-সব মিলিয়ে তৈরি হয় স্বাদের এক অনন্য সংমিশ্রণ। রমজানের এই এক মাসে মুড়ি মাখানো যেন হয়ে ওঠে এক ধরনের শিল্প।

কিন্তু বিতর্কের সূত্রপাত তখনই, যখন কেউ চুপিসারে সেই বাটিতে কয়েক টুকরো আস্ত জিলাপি ভেঙে দেয়। কারো কাছে এটি স্বর্গীয় মিশ্রণ, আবার কারো কাছে ‘মুড়িতে জিলাপি’ একেবারেই অগ্রহণযোগ্য! এই অম্ল-মধুর তর্ক বছর ঘুরে প্রতি রমজানেই নতুন করে ফিরে আসে।

মুড়ি মাখার ইতিহাস ও ঐতিহ্যমুড়ি শতাব্দী প্রাচীন একটি খাদ্য। চাল থেকে তৈরি এই হালকা ও সহজপাচ্য খাবারটি বাংলায় নাস্তা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রিয়। ইফতারে সাধারণত সরিষার তেল, পেঁয়াজ, লবণ, কাঁচা মরিচ ও ছোলা দিয়ে মুড়ি মাখানো হয়।অনেকে মনে করেন, মুড়ির সঙ্গে জিলাপি মেশানোর প্রথা এসেছে পুরান ঢাকার ইফতার সংস্কৃতি থেকে। বিশেষ করে চকবাজারের ঐতিহ্যবাহী ইফতার বাজারে ঘিয়ে ভাজা শাহী জিলাপি মুড়ির সঙ্গে মেখে খাওয়ার চল বহু পুরোনো। জিলাপির ইতিহাস অবশ্য মোঘল আমল পর্যন্ত বিস্তৃত।

পেঁয়াজু, বেগুনি কিংবা আলুর চপ-এসব এসেছে বাংলার রাস্তার খাবার সংস্কৃতি থেকে। আলুর চপের শেকড় আবার পর্তুগিজ প্রভাবিত ভারতীয় রান্নায় নিহিত। তবে এদের কেউই মুড়ি জিলাপির ঝুরঝুরে মুড়ি আর নরম জিলাপির মিষ্টি-মচমচে মিশ্রণ অনেকের কাছে খুবই পছন্দের। মুড়ির মচমচে ভাব আর জিলাপির রসালো মিষ্টি স্বাদ একসঙ্গে মিললে আলাদা এক অনুভূতি তৈরি হয়। বিশেষ করে সারাদিন রোজা রাখার পর এই স্বাদ অনেকের মন ভালো করে দেয়।

মুড়ির সঙ্গে জিলাপি খাওয়ার উপকারিতাজিলাপিতে থাকা চিনি দ্রুত গ্লুকোজে পরিণত হয়, যা শরীরে তাড়াতাড়ি শক্তি জোগায়। রোজার পর যখন শরীর ক্লান্ত থাকে, তখন এমন মিষ্টি খাবার সাময়িকভাবে এনার্জি দিতে পারে। মুড়িও কার্বোহাইড্রেটের উৎস, তাই এটি কিছুটা শক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করে।

মিষ্টি খেলে শরীরে ‘সেরোটোনিন’ হরমোন নিঃসৃত হতে পারে, যা মন ভালো রাখতে সাহায্য করে। তাই অনেকের কাছে মুড়ি-জিলাপি শুধু খাবার নয়, আনন্দেরও অংশ। মাঝেমধ্যে পরিমিত পরিমাণে খেলে এতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

মুড়ির সঙ্গে জিলাপি খেলে যে সমস্যা হতে পারে- 

ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকিজিলাপি উচ্চ ক্যালরিযুক্ত। নিয়মিত খেলে ওজন দ্রুত বাড়তে পারে।

রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধিমুড়ির সঙ্গে জিলাপি মিশিয়ে খেলে শরীরে উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্স তৈরি হয়, যা রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। আগে থেকেই যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগের ঝুঁকি আছে, তাদের জন্য এটি ক্ষতিকর হতে পারে। অতিরিক্ত চিনি ও কার্বোহাইড্রেট ইনসুলিন সংবেদনশীলতা কমিয়ে ভবিষ্যতে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

হজমের সমস্যাতৈলাক্ত ও মিষ্টি খাবার একসঙ্গে খেলে গ্যাস্ট্রিক, অম্বল বা পেট ফাঁপার সমস্যা হতে পারে।

পুষ্টির ঘাটতিমুড়ি ও জিলাপি দুটোই মূলত কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ। এতে প্রোটিন, ভিটামিন বা মিনারেলের পরিমাণ কম, ফলে এটি পূর্ণাঙ্গ পুষ্টি দেয় না।

হৃদরোগের ঝুঁকিঅতিরিক্ত তেল ও চিনি দীর্ঘমেয়াদে কোলেস্টেরল বাড়াতে পারে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।

মুড়িতে জিলাপি মেশানো স্বাদের প্রশ্নে এটি নিঃসন্দেহে ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। তবে স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকটি মাথায় রেখে পরিমিত খাবার গ্রহণই বুদ্ধিমানের কাজ।

সূত্র: মায়ো ক্লিনিক,ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশন, বাংলাদেশ ফুড-বেইজড ডায়েটারি গাইডলাইনস ও অন্যান্য

আরও পড়ুন:রোজায় ওজন সামলে পুষ্টিকর খাবারের উপায় জানালেন বিশেষজ্ঞ রোজায় পানিশূন্যতা এড়াতে যেসব অভ্যাস জরুরি 

এসএকেওয়াই