আহমাদ সাব্বির
মানুষের ইতিহাস যত পুরোনো, ইবাদতের ইতিহাসও ততটাই প্রাচীন। মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই মানুষ তার স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের নানা উপায় খুঁজে এসেছে। সেই ইবাদতসমূহের মধ্যে রোজা একটি বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন ইবাদত। রমজানের রোজা নিঃসন্দেহে ইসলামের একটি মৌলিক বিধান; তবে ইসলামেই মানবজাতির ওপর প্রথম রোজা ফরজ হয়নি। বরং কোরআনুল কারীম স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয় যে, রোজা এমন এক ইবাদত, যা পূর্ববর্তী উম্মতদের ওপরও ফরজ ছিল।
আল্লাহ তাআলা বলেন, হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল; যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সুরা বাকারা: ১৮৩)
এই আয়াতের গভীর তাৎপর্য রয়েছে। এখানে শুধু রোজার বিধান ঘোষণাই করা হয়নি; বরং এটিও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এটি পূর্ববর্তী উম্মতদের ধারাবাহিক ইবাদতের অংশ। অর্থাৎ, রোজা কোনো নতুন বিধান নয়; এটি নবী-রাসুলদের যুগধারায় প্রতিষ্ঠিত এক প্রাচীন সাধনা। এর মাধ্যমে বোঝা যায়—রোজার উদ্দেশ্যও সর্বযুগে এক ও অভিন্ন: তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন।
ইসলাম, খ্রিস্ট ও ইহুদি ধর্মের পূর্ববর্তী জাতিগোষ্ঠী কীভাবে রোজা পালন করত, তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ আজ আমাদের কাছে সংরক্ষিত নেই। তবে কোরআনের ঘোষণা থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, তাদের ওপরও রোজা ফরজ ছিল। মানবজাতির ইতিহাসে যেসব আসমানি কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে—তাওরাত, জাবুর, ইঞ্জিল—সেগুলোর বর্তমান সংস্করণেও রোজা ও উপবাসের উল্লেখ পাওয়া যায়। এতে বোঝা যায়, আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের নফসকে সংযত করার এবং আত্মশুদ্ধির জন্য রোজাকে একটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন।
বিশেষত ইহুদি ও খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে নির্দিষ্ট দিনে রোজা পালনের প্রচলন ছিল। তারা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকত, কখনো কখনো কিছু বিশেষ খাদ্য থেকেও বিরত থাকত। যদিও তাদের রোজার সময়, পদ্ধতি ও বিধান ইসলামী রোজা থেকে ভিন্ন ছিল, তবুও মূল ভাবধারা ছিল আত্মসংযম ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জন।
এ প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা পাওয়া যায় সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে। যখন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করলেন, তখন তিনি লক্ষ্য করলেন যে, ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা পালন করছে। তিনি তাদের কাছে কারণ জানতে চাইলে তারা বলল—এ দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এই দিনে আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা (আলাইহিস সালাম) ও তার কওমকে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীকে পানিতে ডুবিয়ে ধ্বংস করেছিলেন। তাই মুসা (আ.) কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য এই দিনে রোজা রাখতেন আর তার অনুসরণে তারাও রোজা পালন করে।
এ কথা শুনে নবী করীম (সা.) বললেন, মুসার (আ.) স্মৃতি পালনের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমরা অধিক হকদার। এরপর তিনি নিজেও আশুরার দিন রোজা রাখলেন এবং সাহাবিদের রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। (সহিহ বুখারি: ২০০৪, সহিহ মুসলিম: ১১৩০)
এই ঘটনা ইসলামের সঙ্গে পূর্ববর্তী নবীদের ধারাবাহিকতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইসলাম কোনো বিচ্ছিন্ন ধর্ম নয়; বরং এটি একই তাওহিদের বার্তার ধারাবহিকতা। রোজার মাধ্যমে মুসলমানরা শুধু আল্লাহর আদেশ পালনই করে না; বরং তারা পূর্ববর্তী নবী-রাসুলদের ঐতিহ্যের সঙ্গেও নিজেদের যুক্ত করে।
যদিও রোজা পূর্ববর্তী উম্মতদের উপরও ফরজ ছিল, তবুও মুসলিমদের রোজার পদ্ধতিতে কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা এটিকে স্বতন্ত্র ও পরিপূর্ণ করেছে।
প্রথমত, সেহরির বিষয়টি। হাদিসে এসেছে যে, আহলে কিতাবরা সেহরি খেত না। কিন্তু মুসলমানদের জন্য সেহরি একটি বরকতময় সুন্নাহ। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘সেহরি খাও; কারণ সেহরিতে বরকত রয়েছে।’ সেহরি শুধু শারীরিক শক্তি জোগায় না; বরং এটি মুসলিম পরিচয়ের একটি স্বতন্ত্র নিদর্শন।
দ্বিতীয়ত, ইফতারের সময়। আহলে কিতাবরা ইফতার করতে বিলম্ব করত; পক্ষান্তরে মুসলমানদের জন্য নির্দেশ হলো সূর্যাস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করা। নবী (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ ততদিন কল্যাণের মধ্যে থাকবে, যতদিন তারা ইফতারে তাড়াহুড়ো করবে।’ এই তাড়াহুড়ো মানে নিয়মমাফিক সময়মতো ইফতার করা—অর্থাৎ আল্লাহর বিধানের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য প্রদর্শন।
এই পার্থক্যগুলো প্রমাণ করে যে, ইসলাম রোজাকে একটি সুসংগঠিত, ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবপ্রকৃতিসম্মত ইবাদতে রূপ দিয়েছে।
বিশ্বকোষসমূহেও উল্লেখ আছে যে, পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মেই কোনো না কোনোভাবে উপবাস বা রোজার বিধান রয়েছে। জলবায়ু, জাতিগত বৈশিষ্ট্য, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ব্যাখ্যার ভিন্নতার কারণে রোজার পদ্ধতিতে পার্থক্য দেখা যায়; কিন্তু এমন কোনো ধর্ম খুঁজে পাওয়া কঠিন, যার বিধানে উপবাসের কোনো উল্লেখ নেই।
এ থেকে একটি গভীর সত্য উদ্ভাসিত হয়—মানব আত্মা তার স্রষ্টার নৈকট্য লাভের জন্য খাদ্য ও প্রবৃত্তির উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপকে এক গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে স্বীকার করে এসেছে। রোজা মানুষের অন্তর্গত লোভ, কামনা ও অহংকারকে দমন করে তাকে আত্মশুদ্ধির পথে পরিচালিত করে। তাই এটি কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং আত্মগঠনের এক সার্বজনীন অনুশীলন।
উল্লিখিত কুরআনের আয়াতে রোজার মূল লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ তাকওয়া মানে শুধু ভয় নয়; বরং আল্লাহর প্রতি সচেতনতা, তাঁর উপস্থিতির অনুভব, এবং তাঁর আদেশ-নিষেধের প্রতি সতর্ক আনুগত্য।
রোজা মানুষকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় দিক থেকে সংযত করে। দিনের বেলা যখন সে ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করে, তখন সে উপলব্ধি করে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সে তার মৌলিক চাহিদাও ত্যাগ করতে পারে। এই অভ্যাস ধীরে ধীরে তাকে গুনাহ থেকে বিরত থাকতে সহায়তা করে। সে বুঝতে শেখে, যে আল্লাহর ভয়ে পানাহার থেকে বিরত থাকতে পারে, সে নিশ্চয়ই অন্য পাপ থেকেও বিরত থাকতে পারবে।
পূর্ববর্তী উম্মতদের ওপরও রোজা ফরজ ছিল—এই তথ্য মুসলমানদের জন্য গভীর সান্ত্বনা ও অনুপ্রেরণার উৎস। যখন একজন মুসলিম জানতে পারে যে, সে যে রোজা পালন করছে, তা নবী-রাসুলদের পথ; ইবরাহিম, মুসা, ঈসা (আলাইহিমুস সালাম) ও তাঁদের অনুসারী নেককারদের ঐতিহ্য—তখন তার মনে গর্ব ও আনন্দ জন্মায়।
রোজার কষ্ট তখন আর কষ্ট মনে হয় না; বরং তা হয়ে ওঠে ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক এক সংযোগের সেতু। সে অনুভব করে, সে এক মহিমান্বিত কাফেলার অংশ, যে কাফেলা যুগে যুগে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আত্মসংযমের সাধনা করেছে।
ওএফএফ