সাহিত্য

কামরান চৌধুরীর ছোটো গল্প: মাতৃভাষা

এখন বসন্তকাল। ফাল্গুনী বাতাসে আজ যেন এক অন্যরকম আবেশের সৃষ্টি হয়েছে। চারপাশে শিমুল-পলাশের সাথে যেন কৃষ্ণচূড়ার লালচে আভা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে ভোর থেকেই শহীদ মিনারের দিকে ছুটে চলেছে সাধারণ মানুষ। আজ অমর একুশে ফেব্রুয়ারি।

প্রান্ত চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের একজন ছাত্র। সে বাংলা সাহিত্য নিয়ে ভীষণ কৌতূহলী। এছাড়া বাংলা ভাষা ও বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে শহীদদের নিয়ে সে মাঝেমধ্যে ভীষণ আবেগী হয়ে পড়ে। মাঝে মাঝে ভাবতে থাকে আমাদের বাংলা ভাষার জন্য যারা আত্মত্যাগ করেছে, আমরা কি পেরেছি সেই ভাষার সঠিক ব্যবহারকে ধরে রাখতে? এই কথা ভাবতে ভাবতে সে যখন শহীদ মিনারে যাওয়ার জন্য তৈরি হবে এমন সময় তাঁর মুঠোফোনটি বেজে উঠলো। সে ফোন রিসিভ করতে গিয়ে দেখে তাঁর বন্ধু রিফাত ফোন করেছে,

- প্রান্ত, আজ শহীদ মিনারে যাবি তো?

- অবশ্যই যাবো। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে চাই। তুই আসছিস নাকি?

তখন রিফাত চুপ করে ছিল কিছুক্ষণ, তারপর বললো,

- আমি পরে যাব। তোকে একটা কথা বলার ছিল…প্রান্ত কিছু বলার আগেই রিফাত ফোন কেটে দেয়।

সকাল ১১টায় শহীদ মিনারে পৌঁছে প্রান্ত দেখে, বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা খালি পায়ে হাঁটছে। সাদা-কালো পোশাক, হাতে ফুলের তোড়া। অন্যদিকে অমর একুশের গান বাজছে—

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি...’

গানটি শুনে প্রান্তর মনটি হঠাৎ করে খারাপ হয়ে গেলো। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় শহীদ মিনারের দিকে এবং সেই বেদিতে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। সে যখন ফুল দিয়ে শহীদ মিনার হতে বেরিয়ে যাচ্ছিলো তখন সে লক্ষ্য করলো দূর হতে দুইটি মধ্যবয়সী লোক কিছু একটা বিষয় নিয়ে খুবই উচ্চস্বরে তর্ক করছে। প্রান্ত এটি দেখে তাঁদের একটু কাছাকাছি গেলো। তারপর সেখানে গিয়ে সে দেখতে পায় লোকগুলো একে অপরকে একটা বিষয় নিয়ে ইংরেজি ভাষায় খুবই গালাগালি করে যাচ্ছে। তাঁদের মুখে এই কথাগুলো শুনে প্রান্ত বেশ দুঃখবোধ করলো। তারপর তাঁদের থামিয়ে দিয়ে বললো,

- চাচা,আপনারা থামুন। এভাবে একে অন্যকে গালাগালি করা ঠিক না।

- এই ছেলে তুমি কে?

- আমি একজন ছাত্র। আজকের এই দিনে আপনারা এভাবে ঝগড়া বিবাদ করবেন না। অন্তত বাংলা ভাষাকে মর্যাদা দিতে শিখুন। আমি মনে করি আপনারা ভদ্র এবং শিক্ষিত।

- হ্যাঁ, তাতে তোমার কি?

- আমার কিছুই না চাচা। তবুও আপনারা এগুলো বন্ধ করুন। শান্ত হোন।

- তুমি এখানে কথা বলতে এসো না। নিজের কাজে যাও।

তাঁদের মুখে এই কথা শুনে প্রান্ত আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। সে শুধু বেরিয়ে আসার সময় একটু উচ্চস্বরে বলতে লাগলো, ‘আমরা বাঙালিরা কখনোই সভ্য হবো না। নিজেদের মাতৃভাষা নিজেদের কাছে ছোটো মনে হয়। সবাই ইংরেজি বলে স্মার্ট হতে চায়। বাহ্!’

প্রান্তর মুখে এই কথা শুনে হঠাৎ করে তার কানের কাছে একটা কণ্ঠস্বর শোনা যায়-‘ভাইয়া, আপনি কি বাংলা ভালোবাসেন?’

প্রান্ত চমকে গিয়ে ফিরে তাকায়। দেখে একটি ছোট মেয়ে। বয়স বড়জোর আট-নয় হবে, তার দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। প্রান্ত তখন মৃদ্যু হেসে উত্তর দেয়, ‘অবশ্যই ভালোবাসি। তুমি কেন জিজ্ঞাসা করছো?’

মেয়েটিও মৃদু হেসে বলে, ‘তাহলে আপনার কাছে একটা প্রশ্ন আছে। এখন তো সবাই ইংরেজি বলা শিখতে চায় তবে বাংলা পড়তে চায় না কেন?’

প্রান্ত একটু থমকে যায় এবং আনমনা হয়ে ভাবতে থাকে। সত্যিই তো! ভাষার জন্য শহীদদের রক্ত দিলেও, আমরা কি বাংলা ভাষাকে যথেষ্ট মর্যাদা দিচ্ছি?

তখন সে মেয়েটির মাথায় হাত রেখে বলে, ‘বাংলা আমাদের গর্ব, আমাদের পরিচয়। আমরা যদি বাংলা ভাষাকে ভালোবেসে তার সঠিক ব্যবহার করি, তবে কেউ এই ভাষাকে ভুলে যাবে না।’ মেয়েটি তাঁর মুখে এই কথা শুনে হাসিমুখে চলে যায়। অন্যদিকে প্রান্তের মনে গভীর ভাবনার জন্ম দিয়ে যায়।

রাতের দিকে রিফাতের ফোন আসে আবার। ‘প্রান্ত, তোকে একটা বিষয় জানাতে চাই। সেটি আজ একুশে ফেব্রুয়ারি অথচ আমার ছোট ভাই স্কুলে বাংলা পড়তে চায় না, শুধু ইংরেজি বই পড়ে। এটা দেখে কেমন যেন খারাপ লাগল…’

প্রান্ত তখন শান্ত স্বরে বললো, ‘এটাই তো আমাদের লড়াই, রিফাত। শুধু শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শহীদদের শ্রদ্ধা জানানোই যথেষ্ট নয়, তাদের স্বপ্নকেও বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আমাদের বাংলা ভাষাকে ভালোবাসতে হবে কাজে ও মনে।’

রিফাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘তুই ঠিক বলেছিস। কাল থেকে তাঁকে বাংলা পড়তে উৎসাহ দেব। আমি নিজেও বাংলা সাহিত্য যেমন: গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি বেশি পড়ার চেষ্টা করবো।’

নিজের বন্ধুর মুখ থেকে এই কথা শুনে প্রান্তের মনে এক ধরণের প্রশান্তির সৃষ্টি হতে থাকে। সে জানে, ভাষার জন্য ভালোবাসা কেবল একদিনের জন্য নয়, তা হতে হবে প্রতিদিনের। বাংলার গৌরব রক্ষা করতে হলে সবার আগে নিজেদের মন থেকে সেই ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং ভালোবাস থাকতে হবে। প্রান্ত তাঁর বন্ধুর সাথে আরো কিছু বিষয় নিয়ে আলোচন করেছিল। অতঃপর কথা শেষ করে সে তাঁর ঘরের জানালা দিয়ে চাঁদের দিকে তাকায় এবং মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে একুশ শুধু অতীত নয়, এটি ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শকও। বাংলা ভাষার জন্য তার লড়াই কখনোই থামবে না।

কেএসকে