নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের বিএনপির রাজনীতিতে যাত্রা শুরু হয়েছিল একেবারেই শূন্য থেকে। সেই শূন্য থেকে একের পর ধাপ পেরিয়ে বিএনপি রাজনীতিতে তিনি দাপুটে অবস্থান করে নেন। প্রত্যেকটি ধাপেই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দক্ষতা এবং নেতৃত্বের গুণাবলীর অনন্য পরিচয় ছিল তার।
এরই ধারাবাহিকতকায় এবার নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সাখাওয়াত হোসেন খান। এই নিয়োগ দিয়ে রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
‘স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪’ এর ধারা ২৫ ক এর উপধারা (১) অনুযায়ী করপোরেশন গঠিত না হওয়া পর্যন্ত বা তাদের সিটি করপোরেশনগুলোতে পূর্ণকালীন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো বলে প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে।’
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ পেয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, আমি দলের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। বিগত দিনের ত্যাগের মূল্যায়ন করেছে দল। আমি চেষ্টা করবো এই নগরীর সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করার। নগরীর যানজট থেকে হকার সমস্যা, মাদক-সন্ত্রাসও নিয়ন্ত্রণে আন্তরিক চেষ্টা করবো এবং এসব কাজ নগরবাসীকে সঙ্গে নিয়েই করবো।
অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের কিশোর সময় কেটেছে মুন্সীগঞ্জে। সেই মুন্সীগঞ্জ থাকাকালীন সময়ে ছাত্র অবস্থায়ই জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হন। তৎকালীন সময়ে হ্যাঁ না ভোটে অংশগ্রহণ করেন এবং লঞ্চ দিয়ে জিয়াউর রহমানের সমাবেশে যোগ দিতেন। ৮২ সালে পরিবারের বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন। সে সময় তিনি ইউনিয়ন ছাত্রদলের সহ সভাপতি ছিলেন। এরপর তিনি মুন্সীগঞ্জ জেলা যুবদলের সহ সভাপতি ছিলেন।
তারপর তিনি নারায়ণগঞ্জে আসেন। সেই সঙ্গে এরশাদ সরকারের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। এরপর নারায়ণগঞ্জ ল কলেজে ভর্তি হন। সে সময় ল কলেজে কোনো সংসদ ছিল না। তিনি ছাত্র সংসদ চালু করার কার্যক্রমে অংশ নেন এবং কলেজ সংসদের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য হন। অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকারের জুনিয়র হিসেবে আইনজীবী হিসেবে পেশা জীবন শুরু করেন। ১৯৯৮ সালে আইনজীবী সমিতির আপ্যায়ন সম্পাদক নির্বাচিত হন। সে সময় বিএনপির কোনো পদ পদবি না থাকলেও মিছিল মিটিংয়ে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এক পর্যায়ে আইনজীবী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক পদে অধিষ্ঠিত হন। ২০০৯ সালে বিএনপি ব্যাকফুটে থাকা অবস্থায় আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে প্যানেল দেওয়ার মতো কেউ ছিলেন না। তখন একাই সাহস করে প্যানেল দেন। মিছিল মিটিংয়ে দাবড়িয়ে বেড়ান।
২০১৩ সালে আইনজীবী সমিতি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকাবস্থায় তাকে আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে তিনি সব আইনজীবীদের সমর্থনে দলীয় ফোরামের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়েই সভাপতি পদে নির্বাচনে অংশ নেন। সেই সঙ্গে বিপুল ভোটে জয়ী হন। তখন থেকেই তার রাজনৈতিক জীবনের টার্নিং পয়েন্ট শুরু হয়। নারায়ণগঞ্জ বিএনপির রাজনীতিতে তার দাপটে অবস্থান স্পষ্ট হতে থাকে। ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসে সাত খুনের মধ্য দিয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা হয়। তাদের মধ্যে একজন আইনজীবীকেও খুন করা হয়। ওই আইনজীবীর পক্ষে তিনি লড়াই শুরু করেন।
নারায়গঞ্জের কোনো থানায় মামলা নিচ্ছিলো না। হাইকোর্টে আপিল করলে হাইকোর্ট মামলার তদন্তের নির্দেশ দেন। সেই সঙ্গে সাখাওয়াত আইনজীবী হত্যার বিচার চেয়ে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকেন। টানা ৫৮ দিন আদালত বর্জন কর্মসূচি পালিত হয়। ওই সময়টাতে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের জন্য অনেক চ্যালেঞ্জিং ছিল। শেখ হাসিনার সংসদে বক্তব্য শামীম ওসমানের হুমকি ধমকি বিভিন্ন মামলায় জড়ানোর হুমকি বিপুল পরিমাণ টাকার অফার কোনো কিছুই তাকে দমিয়ে দিতে পারেননি। তার ডাকে নারায়ণগঞ্জে স্মরণকালের সেরা সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। এসময় তার পরিবারকে ঘরবন্দি থাকতে হয় এবং তিনি নিজে কখনও একা চলাচল করতে পারেননি। সেই সঙ্গে এই মামলার পরিচালনার মধ্য দিয়ে তিনি দেশব্যাপী আলোচিত এবং একজন পরিচিত মুখ হয়ে উঠেন।
বিএনপির আন্দোলনে নিতে গিয়ে তাকে কারাবরণও করতে হয়। ২০১৬ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে তিনি বিএনপির মনোনীত মেয়র প্রার্থী হন। সেই নির্বাচনে জেলা ও মহানগর বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা থেকে শুরু করে কেন্দ্রের শীর্ষ নেতারাও নির্বাচন কার্যক্রমে অংশ নেন। তাকে নিয়ে দেশব্যাপী সরগরম হয়ে উঠে।
নির্বাচনের পরপরই মহানগর বিএনপির কমিটিতে সহ সভাপতি পদে দায়িত্ব পান। সেই সঙ্গে তিনি একা একাই মহানগর বিএনপির ব্যানার নিয়ে কর্মসূচি পালন করতে থাকেন। ২০২২ সালের মহানগর বিএনপিতে আহ্বায়ক পদে আসেন। আহ্বায়ক পদে আসার পরপরই দীর্ঘ বছর পর বিভিন্ন থানা কমিটি গঠন হয়। ২০১৮ সালের আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে প্রধান ভূমিকা রাখতে গিয়ে তার একমাত্র ছেলেকে ডিবি পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। রাজনীতি করতে গিয়ে ৬০ টি মামলার আসামি হয়েছেন এবং ৪ বার কারাবরণ করেছেন। সেই সঙ্গে একসঙ্গে টানা দুই মাস কারাবরণ করেছেন। বহুদিন বাড়ি ঘরে থাকতে পারেননি।
এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাখাওয়াত হোসেন খান নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে বিএনপি দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। সেই সঙ্গে তিনি বেশ আলোচনাতেও ছিলেন বিএনপি দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে। নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার যথেষ্ট যোগ্যতাও ছিল সাখাওয়াত হোসেন খানের। তবে তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। এবার তাকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
মোবাশ্বির শ্রাবণ/এনএইচআর/এএসএম