লাইফস্টাইল

সচেতন খাবারই নিরাপদ রোজার চাবিকাঠি

রমজান আত্মশুদ্ধি ও সংযমের মাস। তবে যারা ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছেন, তাদের জন্য রোজা রাখা শুধু ইচ্ছাশক্তির বিষয় নয় এটি একটি সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্য পরিকল্পনার অংশ। সঠিক খাদ্য নির্বাচন ও সময়জ্ঞান না থাকলে রক্তে শর্করার ওঠানামা, ডিহাইড্রেশন কিংবা রক্তচাপের তারতম্য দেখা দিতে পারে। তাই সচেতন খাদ্য ব্যবস্থাপনাই হতে পারে নিরাপদ রোজার চাবিকাঠি। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন বাংলাদেশ সাইকিয়াট্রিক কেয়ার ক্লিনিক এবং বায়োজিন কসমেসিউটিক্যালসের সিনিয়র ক্লিনিক্যাল ডায়েটিশিয়ান ইসরাত জাহান ইফাত।

ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে প্রধান উদ্বেগ হলো হাইপোগ্লাইসেমিয়া (রক্তে শর্করা হঠাৎ কমে যাওয়া) ও হাইপারগ্লাইসেমিয়া (অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া)। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর ইফতারে অতিরিক্ত খেজুর, মিষ্টি শরবত বা ভাজাপোড়া খেলে রক্তে গ্লুকোজ দ্রুত বেড়ে যায়। আবার সেহরিতে খুব কম খেলে দিনের বেলায় শর্করা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই রমজানে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা-ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত সকল ধরনের চিনি, গুড়, মধু ও মিষ্টি দিয়ে তৈরি খাবার সম্পূর্ণভাবে বাদ দিন।

চিনি না খেয়ে মধু খাচ্ছি বা গুড় তো প্রাকৃতিক এ ধারণা ভুল। এগুলোও রক্তে দ্রুত গ্লুকোজ বাড়ায়। ইফতার শুরু করুন মাত্র একটি খেজুর ও এক গ্লাস পানি দিয়ে। একটি খেজুর শরীরকে দ্রুত শক্তি দেয়, কিন্তু অতিরিক্ত খেলে তা রক্তে শর্করা হঠাৎ বাড়িয়ে দিতে পারে। এরপর ধীরে ধীরে সুষম খাবার যেমন- ছোলা, সালাদ, টক দই, ডিম সিদ্ধ, হালিম, ইত্যাদি প্লেটে থাকা উচিত। পাশাপাশি পরিমিত ব্রাউন রাইস বা আটার রুটি, পর্যাপ্ত শাকসবজি, ডাল এবং চর্বিহীন প্রোটিন-মাছ, মুরগি বা ডিম রাখতে হবে। খেজুরের পরিবর্তে অন্য মিষ্টি ফল খাওয়া যাবে ব্যক্তি ভেদে ৬০-১০০ গ্রাম, তবে পুরো ফলের রস নয়।

ছবি: বাংলাদেশ সাইকিয়াট্রিক কেয়ার ক্লিনিক এবং বায়োজিন কসমেসিউটিক্যালসের সিনিয়র ক্লিনিক্যাল ডায়েটিশিয়ান ইসরাত জাহান ইফাত

ইফতারের পর বেছে নিন মৌসুমি দেশি ও টক ফল যেমন- লেবু, সবুজ মাল্টা, কমলা, আমড়া, জাম্বুরা, বাঙ্গি, কচি পেয়ারা, ডাবের পানি, মসম্বি, জাম ও জামরুল। এসব ফলে প্রচুর ভিটামিন সি, পটাশিয়াম, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফাইবার থাকে, যা রক্তে শর্করার ভারসাম্য রক্ষা করতে সহায়তা করে এবং সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে। তবে ফল খেতে হবে সম্পূর্ণ ফল হিসেবে, রস নয়। কারণ রসে আঁশ কম থাকে এবং সুগার দ্রুত বাড়ায়।

হাই ব্লাড প্রেশারের রোগীরা অবশ্যই চা কফি বাদ দিবেন। এর পরিবর্তে গ্রিন টি পান করতে পারেন। তারাবির নামাজ অবশ্যই পরবেন। এতে আত্মিক ও মানসিক প্রশান্তি আসে, যা সুগার ও প্রেশার দুটোকেই ব্যালেন্স করতে সাহায্য করে।

রাতের খাবারে রাখুন পর্যাপ্ত প্রোটিন ও ফাইবার। এক বাটি শাকসবজি সঙ্গে মাছ বা মুরগি, ঘন ডাল অথবা এক কাপ ঘন টক দই। অনেকের সেহরিতে শাক খেলে গ্যাসের সমস্যা হয়। তাই প্রতিদিনের এক কাপ মৌসুমি সবুজ শাকসবজি ডিনারেই রাখা ভালো। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ-দুই ক্ষেত্রেই প্রতিদিন শাকসবজি অত্যন্ত জরুরি।

অনেকেই সেহরি খেতে চান না। কিন্তু ডায়াবেটিসের জটিলতা এড়াতে এবং উচ্চ রক্তচাপ সারাদিন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেহরি খেয়েই রোজা রাখা উচিত। দীর্ঘসময় শক্তি জোগাতে পারে এমন স্লো-ডাইজেস্টিং বা ধীরে হজম হয় এমন খাবার বেছে নিতে হবে। উচ্চ সলিউবল ফাইবারসমৃদ্ধ কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট যেমন- লাল ভাত, ওটস, লাল আটার রুটি, সিদ্ধ মিষ্টি আলু, লাল চিড়া এসব ধীরে ধীরে গ্লুকোজ সরবরাহ করে। ফলে সারাদিন সুগার ও প্রেশার স্থিতিশীল থাকে। সঙ্গে রাখুন চর্বিহীন প্রোটিন, দুধ বা দই, মাছ, মুরগি বা ডাল। জলীয় অংশ বেশি এমন নরম সবজি যেমন- লাউ, পেঁপে, কুমড়া, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, ধুন্দল, পটল ইত্যাদি সেহরিতে উপকারী। এগুলো শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে সাহায্য করে। সেহরির পর অন্তত ১০ মিনিট হালকা হাঁটা ভালো হজমে সহায়ক। এরপর ধীরে ধীরে পর্যাপ্ত পানি পান করুন।

আরও পড়ুন:  রোজায় সুস্থ থাকার সহজ ৫ নিয়ম ময়দা না আটা, সুস্থতার পাল্লা কার দিকে? ইফতারে কেন ছোলা থাকা জরুরি? বয়স বাড়লে রোজায় বাড়তি যত্ন কেন জরুরি?

উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য বিশেষ সতর্কতা, অতিরিক্ত লবণ এড়িয়ে চলুন। সেহরিতে বেশি লবণাক্ত খাবার খেলে সারাদিন পিপাসা বাড়ে এবং প্রেশার নিয়ন্ত্রণে ব্যাঘাত ঘটে। রান্নায় যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই যথেষ্ট; আলাদা করে কাঁচা লবণ খাওয়া যাবে না। প্রক্রিয়াজাত খাবার, আচার, চিপস, প্যাকেটজাত স্যুপ বা সস পরিহার করাই উত্তম। অতিরিক্ত লবণ, আচার বা প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো। কারণ এগুলো তৃষ্ণা বাড়ায় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বাধা দেয়।

ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ-দুটো অবস্থাতেই ওজন নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ করলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও রক্তচাপ দুটোই বাড়তে পারে। তাই ‘পরিমিত কিন্তু সঠিক’ নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন। প্লেটের অর্ধেকজুড়ে থাকবে শাকসবজি, এক-চতুর্থাংশ প্রোটিন, বাকি এক-চতুর্থাংশ জটিল শর্করা। রান্নায় ব্যবহার করা উচিত অল্প পরিমাণ স্বাস্থ্যকর সরিষা তেল বা অলিভ অয়েল। একই তেল বারবার ব্যবহার যাবে না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ওষুধ ও ইনসুলিনের সময় সমন্বয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ডোজ পরিবর্তন করা ঝুঁকিপূর্ণ। রোজা শুরুর আগে চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদের সঙ্গে পরামর্শ করে ব্যক্তিগত খাদ্য পরিকল্পনা তৈরি করা উচিত।

সবশেষে মনে রাখতে হবে যাদের একসঙ্গে একাধিক দীর্ঘমেয়াদি রোগ রয়েছে, তাদের জন্য একক কোনো ডায়েট সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট, ওষুধের ধরন ও শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ পুষ্টিবিদের পরামর্শে ব্যক্তিগত খাদ্যতালিকা অনুসরণ করা উচিত।

সচেতন খাদ্যাভ্যাস, পরিমিতি ও নিয়ম মেনে চললে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়েও নিরাপদ, কর্মক্ষম ও সুস্থভাবে রোজা পালন করা সম্ভব। সুস্থ শরীরেই সুন্দর ইবাদত-এই বিশ্বাসেই হোক আমাদের রমজান।

জেএস/