দেশজুড়ে

মাদক নিরাময় কেন্দ্রের আড়ালে ‘টর্চার সেল’

গাইবান্ধা শহরের মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন মানসিক ভারসাম্যহীন এক যুবককে নির্মম নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। ৩৭ বছর বয়সি মুর্শিদ হক্কানী বর্তমানে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ঘটনায় তার বড় ভাই আওরঙ্গজেব হক্কানী বাদী হয়ে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, মানসিক ভারসাম্যহীন মুর্শিদ হক্কানীকে সুস্থ করার আশায় গত বছরের আগস্টে ‘জিইউকে মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে’ ভর্তি করা হয়। শুরুতে মুর্শিদ হক্কানীর সঙ্গে পরিবারের দেখা করতে দিলেও ধীরে ধীরে নানা অজুহাতে সাক্ষাৎ বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। গত ১১ ফেব্রুয়ারি স্বজনরা জেদ করে দেখা করতে চাইলে দীর্ঘ সময় পর মুর্শিদকে তাদের সামনে আনা হয়। এ সময় তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত ও আঘাতের চিহ্ন দেখে পরিবারের সন্দেহ হয়। তড়িঘড়ি করে তাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার পর বেরিয়ে আসে নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা।

মুর্শিদ হক্কানী জানান, কেন্দ্রের ভেতরে একটি ঘরে মুখে কাপড় গুঁজে দেওয়া হতো যেন চিৎকার করতে না পারেন। এরপর লোহার রড দিয়ে বেধড়ক পেটানো হয়েছে। এমনকি পা বেঁধে জানালার গ্রিলের সঙ্গে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হতো তাকে। যন্ত্রণায় তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন। ঘটনা কাউকে জানালে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।

গুরুতর অসুস্থ মুর্শিদকে প্রায় ১০ দিন গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তার ভাই ও স্থানীয়রা গণউন্নয়ন কেন্দ্রের পরিচালক এম আব্দুস সালামসহ দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন।

গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মো. আসিফ উর রহমান বলেন, মুর্শিদ হক্কানীর শরীরে একাধিক জখমের চিহ্ন রয়েছে। তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। পুরোপুরি সুস্থ হতে আরও এক সপ্তাহ সময় লাগবে।

ওই মাদক নিরাময় কেন্দ্রে কমপক্ষে ছয়জন চিকিৎসা নিতে গিয়ে টর্চারের শিকার হয়েছেন বলে জানা যায়। অভিযোগ রয়েছে, ওই কেন্দ্রে চিকিৎসার নামে রোগীদের মারধরসহ হত্যার চেষ্টা করা হয়। অনেকেই বলেন, মানসিকভাবে একপ্রকার হত্যার শিকার হন রোগীরা। তারা বলেন, এসব বিষয়ে অভিযোগ দিয়েও কোনো লাভ হয় না।

এর আগে ২০২২ সালের ৩১ মে নাঈম নামের এক রোগীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয় ওই নিরাময় কেন্দ্র থেকে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যার অভিযোগ ও তদন্তের দাবি উঠলেও অজানা কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি।

তবে অনেকে অভিযোগ করছেন, ২০১৩ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গণউন্নয়ন কেন্দ্রের পরিচালক এম আব্দুস সালাম কমিউনিটি পুলিশিং জেলা সভাপতি ছিলেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের আস্থাভাজন হওয়ায় হাজার অপরাধ করলেও তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলার সাহস পেত না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জিইউকের কাউন্সেলর মো. কাবিউল আজাদ বলেন, মুর্শিদ হক্কানীর সঙ্গে নিরাময় কেন্দ্রের অন্য রোগীদের মারামারি হয়। অফিসের কেউ তাকে মারধর করেনি।

জিইউকের সমন্বয়কারী আফতাব হোসেন বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগ কোনোভাবে কাম্য নয়। ভুক্তভোগী পরিবার থানায় অভিযোগ দিয়েছে। তদন্তে প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

এ বিষয়ে গণউন্নয়ন কেন্দ্রের পরিচালক এম আব্দুস সালামের মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি অসুস্থতার কথা বলে ফোনের সংযোগ কেটে দেন।

সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, গণউন্নয়ন কেন্দ্রের (জিইউকে) মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের বিরুদ্ধে এক ভুক্তভোগী পরিবার মামলা করেছে। এতে ওই কেন্দ্রের পাঁচ কর্মকর্তা ও কর্মচারীর নাম উল্লেখসহ তিন-চারজন অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন। এতে পরিচালক পর্যায়ের ইন্ধন রয়েছে কিনা, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

আনোয়ার আল শামীম/আরএইচ/এএসএম