মোগল স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী শাহ সুজা মসজিদ। ভারতীয় উপমহাদেশের শাসক সম্রাট আওরঙ্গজেবের ভাই বাংলার সুবাদার শাহজাদা সুজার নামানুসারে এটি ‘সুজা মসজিদ’ নামে পরিচিত। প্রাচীন এ সমজিদে নামাজ আদায় ও একনজর দেখতে প্রতিদিনই কুমিল্লা মহানগরীর মোগলটুলী এলাকায় আসেন দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীরা।
আয়তনের দিক থেকে এ মসজিদ খুব বেশি বড় নয়। তবে এর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সার্বিক অবয়ব আভিজাত্যের প্রতীক বহন করে। মসজিদটি প্রতিষ্ঠার প্রকৃত সাল ও তারিখ সংরক্ষণ না থাকলেও জনশ্রুতি আছে, ১৬৫৮ খ্রিষ্টাব্দে এটি নির্মিত হয়েছে। সেই হিসেবে এ মসজিদের বর্তমান বয়স ৩৬৮ বছর।
১৮৭০ বর্গফুটের এই মসজিদে বর্তমানে মুসল্লিদের জন্য স্থান সংকুলান হয় না। যে কারণে বাইরে ত্রিপল দিয়ে মুসল্লিদের নামাজ আদায় করতে হয়। প্রাচীন এই স্থাপত্যের আদি রূপ বহাল রেখে মসজিদটি সম্প্রসারণের দাবি সংশ্লিষ্টদের।
মসজিদের খাদেম ও মুসল্লিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এর দৈর্ঘ ৫৮ ফুট এবং প্রস্থ ২২ ফুট। উত্তর-দক্ষিণে লম্বা দেওয়ালের পুরুত্ব ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি। বারান্দা ২৫ ফুট। মসজিদের মূল গম্বুজ তিনটি। এতে ছোট-বড় মিনার আছে ১৮টি। মসজিদের সামনের অংশে দুটি বড় মিনার আছে। ২২ ফুট করে দুটি কক্ষের ওপর আছে দুটি করে চারটি মিনার।
শাহ সুজা মসজিদের পুরোনো স্থাপত্যশৈলী ঠিক রেখে আধুনিক কারুকাজের সমন্বয়ে সামনের অংশ সম্প্রসারণ করা হয়েছে। মসজিদের উত্তর-পূর্ব কোণে একটি সুউচ্চ মিনারও নির্মাণ করা হয়েছে। ফুল, লতাপাতা, জ্যামিতিক ও পদ্ম নকশায় অলংকৃত মসজিদের প্রবেশপথ, কেবলা প্রাচীর ও গম্বুজ, কলসি চূড়া দ্বারা সুশোভিত গম্বুজ।
আয়তনের দিক দিয়ে খুব বেশি বড় না হলেও কৃষ্টি, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সার্বিক অবয়ব আভিজাত্যের প্রতীক বহন করছে শাহ সুজা মসজিদ। প্রাচীন মসজিদটি দেখতে মহানগরীর মোগলটুলী এলাকায় প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা ভিড় করেন। বিশেষ করে জুমা, শবে বরাত, শবে কদরসহ ধর্মীয় বিশেষ দিনে এখানে মুসল্লি ও দর্শনার্থীরা ভিড় জমান।
মসজিদটি প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে দুই ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। প্রথমটি হলো শাহজাদা শাহ সুজা ত্রিপুরা জয় করে বিজয় চিরস্মরণীয় করার জন্য মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। দ্বিতীয় মত হলো, মহারাজ গোবিন্দ মানিক্য সুজার নাম চিরস্মরণীয় করার জন্য নিমচা তরবারি ও হিরকাঙ্গুরীয়ের বিনিময়ে বহু অর্থ ব্যয় করে এ মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন।
মুসল্লিদের ভাষ্য, এখানে নামাজ পড়ে আত্মতৃপ্তি পান তারা। যে কারণে নগরীতে অনেক অধুনিক মসজিদ থাকার পরও দূর-দূরান্ত থেকে অধিকাংশ মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করতে আসেন।
মসজিদের খতিব মুফতি খিজির আহমদ বলেন, ‘এটি ঐতিহাসিক ও বরকতি মসজিদ। ২০০৩ সাল থেকে এখানে ইমামতি করি। জুমার দিনসহ বিশেষ দিনে এখানে দেড় হাজারেরও বেশি মুসল্লি নামাজ আদায় করেন।’
তিনি বলেন, ‘প্রাচীন এই স্থাপত্যের আদি রূপ ঠিক রেখে মসজিদটি দোতলা করা সময়ের দাবি। মুসল্লিদের স্থান সংকুলান হয় না। যে কারণে বাইরে ত্রিপল দিয়ে কষ্ট করে মুসল্লিদের নামাজ আদায় করতে হয়। বৃষ্টি-বাদলের দিনে অনেক কষ্ট পান তারা।’
শাহ্ সুজা হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল আজিজ মাসুদ বলেন, ‘মসজিদের অবকাঠামো ঠিক রেখে কয়েক ধাপে সামনের দিকে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। চুন-সুরকির নির্মিত স্থাপনাটি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গেলে হাজার বছরেও এ স্থাপত্যের কিছুই হবে না।’
জেডআইপি/এসইউ