ক্যাম্পাস

আমের মুকুলে সেজেছে রাবি, মৌমাছির গুনগুন

বসন্তের আগমনী বার্তায় আমের মুকুলে সেজে উঠেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাস। হলুদাভ মুকুলে নুয়ে পড়েছে গাছের ডালপালা, আর চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে মিষ্টি সুবাস। মৌমাছির গুনগুন ধ্বনি ও পাখির কলতানে পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে তৈরি হয়েছে প্রাণবন্ত এক প্রাকৃতিক আবহ, যা শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীদের মনে দিচ্ছে নির্মল বসন্তের ছোঁয়া।

সরেজমিনে দেখা যায়, ক্যাম্পাসের আমবাগান, পরিবহন চত্বর, বুদ্ধিজীবী চত্বর, কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, শহীদ মিনার, চারুকলা ও কৃষি অনুষদ, বধ্যভূমি, বিভিন্ন একাডেমিক ভবনের সামনের প্রাঙ্গণ এবং আবাসিক হলসমূহের আঙিনায় থাকা আমগাছগুলো এখন মুকুলে ভরপুর। সবুজ পাতার ফাঁকে হলুদ মুকুলের সমারোহ যেন প্রকৃতির নিজস্ব রঙের উৎসব।

সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মুকুলে ভরা ডালগুলোতে মৌমাছির ব্যস্ত আনাগোনা চোখে পড়ে। মৃদু বাতাসে ভেসে আসা মুকুলের ঘ্রাণ পথচলতি শিক্ষার্থীদের থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে। ডালে বসা ছোট পাখিদের কিচিরমিচিরে বসন্তের আবেশ আরও গভীর হয়ে ওঠে, যা ব্যস্ত একাডেমিক জীবনে এনে দেয় এক টুকরো প্রশান্তি।

শিক্ষার্থীরা জানান, প্রতিবছর বসন্তে রাবির আমগাছগুলো নতুন রূপে ধরা দিলেও এবার অনুকূল আবহাওয়ার কারণে মুকুলের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। এতে চলতি মৌসুমে ভালো ফলনের প্রত্যাশা করছেন তারা।

সংশ্লিষ্টরাও মনে করছেন, আবহাওয়া সহায়ক থাকলে ক্যাম্পাসে বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।

চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগের শিক্ষার্থী হুমায়রা তাবাসসুম সাবা বলেন, ক্যাম্পাসে এখন হাঁটলেই আমের মুকুলের ঘ্রাণ টের পাওয়া যায়। এই সময়টা যেন একটু ধীরে চলতে শেখায়। ব্যস্ততার মাঝেও প্রকৃতির শান্ত ছোঁয়া অনুভব করা যায়। বসন্ত এখানে শুধু প্রকৃতির রূপান্তর নয়, অন্তরেরও এক সূক্ষ্ম নবায়নের ইঙ্গিত।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া আক্তার বলেন, প্রতি বছর খুব কাছ থেকে আমের মুকুল ফোটার দৃশ্য দেখি। হলুদাভ মুকুলে ভরা গাছগুলো বসন্তের আগমনী বার্তাকে স্পষ্ট করে তোলে। মুকুলের ঘ্রাণ আর চারপাশের সজীবতা মনকে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেয়।

তিনি আরও জানান, মুকুল দেখলেই মনে আশার সঞ্চার হয়- হয়তো এবার প্রচুর আম হবে, আর সবাই মিলে সেই আম ভাগাভাগি করে খাওয়ার আনন্দ উপভোগ করা যাবে।

গত বছরের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, বন্ধুদের সঙ্গে গাছতলায় আড্ডা, পাকা আমের স্বাদ আর গরম বিকেলে আমের ঘ্রাণ-সব মিলিয়ে ক্যাম্পাস জীবনে আলাদা এক আবেগ তৈরি করেছিল।

এদিকে মুকুলের অধিক উপস্থিতির কারণ ব্যাখ্যা করে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মুস্তফা আবুল কালাম আজাদ বলেন, এবার কুয়াশার পরিমাণ তুলনামূলক কম ছিল, ফলে মুকুল কম নষ্ট হয়েছে। এছাড়া প্রাকৃতিকভাবে অনেক আমগাছ এক বছর বেশি ফল দেয়, পরের বছর বিশ্রামে থাকে। যেসব গাছে নিয়মিত ফলন হয়, সেগুলোর শাখা-প্রশাখার বৃদ্ধি ভিন্নভাবে প্রভাবিত হয়।

এগ্রোনমি অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. গিয়াসউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমের মুকুল ও ফলনের ক্ষেত্রে আবহাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বসন্তকালে তাপমাত্রা ধীরে বাড়া এবং কুয়াশা কম থাকা মুকুলের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে। গত দুই বছরে ফলন কম ছিল। এর একটি কারণ হলো, এক বছর বেশি ফলন হলে পরের বছর পুষ্টির ঘাটতির কারণে ফলন কমে যায়।

তিনি আরও জানান, শীতকালে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে নামলে অনেক ক্ষতিকর পোকা দমন হয়। গত বছরগুলোতে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকায় মুকুলে পোকার আক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। তবে এবার তুলনামূলক কম তাপমাত্রা থাকায় পোকার সংক্রমণও কম হয়েছে। পাশাপাশি আগের দুই বছর ফলন কম হওয়ায় গাছগুলো পর্যাপ্ত পুষ্টি সঞ্চয় করতে পেরেছে, যা এ বছর ভালো ফলনের সম্ভাবনা বাড়িয়েছে।

প্রশাসনিক রক্ষণাবেক্ষণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান- যেমন কৃষি অধিদপ্তর ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর- কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। তবে অনেক সময় অতিরিক্ত বালাইনাশক ব্যবহার পরিবেশ ও মাটির উর্বরতার জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।

ঋতুচক্রের নিয়মে এই ক্ষণস্থায়ী মুকুল শিগগিরই রূপ নেবে সবুজ ছোট আমে, যা ধীরে ধীরে গ্রীষ্মের রঙে পেকে উঠবে। তাই বর্তমানের এই সুবাসময় সময় যেন ভবিষ্যৎ ফলনের এক নীরব প্রতিশ্রুতি হয়ে ধরা দিয়েছে রাবি ক্যাম্পাসে।

মনির হোসেন মাহিন/এনএইচআর/এমএস