জাতীয়

কথা-কাজে মিল রেখে অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে প্রধানমন্ত্রী

দায়িত্ব নেওয়ার শুরু থেকেই কথা-কাজে মিল রেখে অনিয়ম ও দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘দলীয় কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি অথবা জোর-জবরদস্তি নয়, আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা।’

এ কথার মাধ্যমে তিনি বিএনপির শীর্ষ থেকে তৃণমূল, সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন- দল সরকারে আছে বলে আইন বা প্রশাসনের কাছ থেকে বাড়তি কোনো সুযোগ পাওয়া যাবে না। কেউ অনিয়ম করলে কিছুতেই ছাড় পাবেন না।

তার এই বক্তব্য যে নিছক রাজনৈতিক ভাষণ নয় তা মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে। অনিয়ম, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স প্রদর্শন করে কথা ও কাজে মিল রেখে প্রশংসা কুড়াচ্ছে বিএনপি সরকার। দলের নেতাকর্মীরাও এতটুকু ছাড় পাচ্ছেন না।

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি একই দিনে মাগুরা, চাঁদপুর ও কিশোরগঞ্জে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ ও অনিয়মের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা এবং দলীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থায় তারেক রহমানের ঘোষিত অবস্থানের প্রতিফলন দেখা গেছে।

মাগুরায় গ্রেফতার ১৩পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ভিজিএফ কার্ড বণ্টনকে কেন্দ্র করে ২৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় মাগুরা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাটিকাডাঙ্গা গ্রামে স্থানীয় বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। বাটিকাডাঙ্গা চার রাস্তার মোড়ে বিএনপি অফিসে দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে মারামারি এবং অফিসের চেয়ার ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

সংঘর্ষে ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি শেখ তরিকুল ইসলাম, আসলাম, বারেক শেখ, দেলোয়ার, ইয়াছিন ও রহিদ হোসেন এবং অপর পক্ষের জেলা তাঁতী দল সভাপতি মো. সাত্তার হোসেন, আবু হোসেন দিনার, বাচ্চু হোসেন ও শরিফুল আহত হন। স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের উদ্ধার করে মাগুরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন।

সংবাদ পেয়ে পুলিশ, সেনাবাহিনী, পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও পুলিশ লাইন্সের কুইক রেসপন্স টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সেই সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে মো. সুমন বিশ্বাস, জামিল শেখ ও মো. রবিন খান গ্রেফতার হন। পরে সাঁড়াশি অভিযানে বাচ্চু মিয়া, মো. সাইফুল ইসলাম, মো. ওসমান, মো. সাব্বির হোসেন, মো. হাফিজুল ইসলাম, শান্ত বিশ্বাস, মো. আরিফ শেখ, মো. আনোয়ার হোসেন, মো. মনিরুল শেখ, মোছা. শিকা বেগমসহ মোট ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতাররা স্থানীয় বিএনপির সক্রিয় কর্মী এবং মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মনোয়ার হোসেন খানের অনুসারী বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় মাগুরা সদর থানায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

চাঁদপুরে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানএকই দিনে মতলব উত্তর উপজেলার ছেঙ্গারচর পৌরসভায় হাটবাজার ইজারার টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে বর্তমান সংসদ সদস্য জালাল উদ্দিনের সমর্থকদের সঙ্গে বিএনপি নেতা তানভীর হুদার সমর্থকদের সংঘর্ষ হয়। এতে পাঁচজন আহত হন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তানভীরের পক্ষে পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি নান্নু প্রধান, বিএনপি নেতা আমিনুল হক ও যুগ্ম সম্পাদক বিল্লাল ফরাজী টেন্ডার জমা দিতে গেলে জালালের পক্ষের পৌর যুবদলের আহ্বায়ক উজ্জ্বল ফরাজী ও বিএনপি নেতা আবু সাঈদ বেপারী বাধা দেন।

একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিএনপি নেতা বদরুজ্জামান, সায়েম, সফিউল্লাহসহ পাঁচজন আহত হন। খবর পেয়ে সেনাবাহিনী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও মতলব উত্তর থানার পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

কিশোরগঞ্জে বিএনপি সভাপতি গ্রেফতারমিঠামইনে বেড়িবাঁধের ২২টি মেহগনিগাছ কাটার অভিযোগে মামলা হলে উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম (জাহাঙ্গীর) গ্রেফতার হন।

মিঠামইন উপজেলা প্রকৌশলী ফয়জুর রাজ্জাক বাদী হয়ে থানায় মামলা করেন। মামলায় আঙ্গুর মিয়াসহ অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনকে আসামি করা হয়।

ঘটনার পরপরই কেন্দ্রীয় বিএনপি দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে জাহিদুল আলমের প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পদ স্থগিত করে। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ব্যক্তিগত স্বার্থে বেড়িবাঁধের গাছ কেটে রাস্তা সুগম করার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রেস সচিবের বক্তব্যএ বিষয়ে জানতে চাইলে শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী বলেন, ‘দেশের একজন নাগরিক হিসেবে বিএনপি বা অন্য দলের নেতাকর্মী কিংবা নির্দলীয়- সবার অধিকার সমান। বিএনপি তা নিশ্চিত করতে চায়।’

বার্তা স্পষ্ট: আইন সবার জন্য সমানএকই দিনে তিন জেলায় সংঘটিত ঘটনায় গ্রেফতার, মামলা ও দলীয় পদ স্থগিতের মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে- ক্ষমতার ছায়ায় অনিয়মের সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষিত আইনের শাসন ও জিরো টলারেন্স নীতির বাস্তব প্রয়োগে দলীয় পরিচয় যে ঢাল হতে পারবে না, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সে বার্তাই দিচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাসীন দলের ভেতরে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং প্রশাসনের স্বাধীন কার্যক্রম নিশ্চিত করতে এ ধরনের পদক্ষেপ সরকারের ভাবমূর্তি ও জনআস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এমইউ/একিউএফ