অনেকেই মজা করে বলেন, খেতে দাও, নইলে কথা বলব না! আসলে মজা নয় - ক্ষুধা সত্যিই মেজাজ বদলে দিতে পারে। ইংরেজিতে এর একটি জনপ্রিয় শব্দও আছে - হ্যাংরি (হাংরি + অ্যাঙ্গরি)।
প্রশ্ন হলো, পেট খালি থাকলে রাগ বা খিটখিটে ভাব বাড়ে কেন? আর রমজানে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে এই অনুভূতি কি বেশি তীব্র হয়?
রক্তে শর্করা কমলে মেজাজও চড়ে যায়আমাদের মস্তিষ্ক শরীরের মোট শক্তির বড় একটি অংশ ব্যবহার করে, আর এর প্রধান জ্বালানি হলো গ্লুকোজ। দীর্ঘ সময় না খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যেতে পারে। এতে মস্তিষ্কে শক্তির ঘাটতি তৈরি হয়, যার প্রভাব পড়ে মনোযোগ, ধৈর্য ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে।
আমেরিকান সাইকোলজিকাল অ্যাসোসিয়েশনে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তে শর্করা কম থাকলে মানুষ নেতিবাচক আবেগ বেশি অনুভব করতে পারে এবং সহজে বিরক্ত হতে পারে। গবেষকেরা বলেন, গ্লুকোজের ঘাটতি আবেগ নিয়ন্ত্রণে যুক্ত মস্তিষ্কের অংশগুলোর কার্যকারিতাকে সাময়িকভাবে দুর্বল করতে পারে।
ক্ষুধার সময় শরীর শুধু শক্তি সাশ্রয় করে না, বরং স্ট্রেস মোডেও যেতে পারে। গ্লুকোজ কমে গেলে শরীর কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়, যাতে রক্তে শর্করা স্বাভাবিক রাখা যায়। কিন্তু এই হরমোনগুলোই উত্তেজনা, অস্থিরতা ও খিটখিটে মেজাজ বাড়াতে পারে।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের প্রকাশনায় উল্লেখ আছে, রক্তে শর্করার ওঠানামা মানসিক অবস্থায় সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
রমজানের প্রভাব সবার ক্ষেত্রে এক রকম নয়রমজানে ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত না খেয়ে থাকার অভিজ্ঞতা স্বাভাবিক দিনের খালি পেটে থাকার চেয়ে আলাদা। কারণ এখানে মানসিক প্রস্তুতি, আধ্যাত্মিক মনোযোগ ও ঘুমের ধরনে পরিবর্তন থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, রমজানে অনেকের ক্ষেত্রে প্রথম কয়েক দিন বিরক্তি বা ক্লান্তি বাড়তে পারে, তবে শরীর ধীরে ধীরে নতুন রুটিনের সঙ্গে মানিয়ে নেয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পুষ্টি ও রোজা বিষয়ক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সেহরি ও ইফতারে সুষম খাবার এবং পর্যাপ্ত পানি গ্রহণ করলে শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হয়, যা মেজাজ স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক।
সবাই সমানভাবে ক্ষুধাজনিত রাগ অনুভব করেন না। এর পেছনে আছে - রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের পার্থক্য, ঘুমের ঘাটতি, মানসিক চাপ, ব্যক্তিত্ব ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা।
যাদের ডায়াবেটিস বা হাইপোগ্লাইসেমিয়ার প্রবণতা আছে, তাদের ক্ষেত্রে ক্ষুধা-সংক্রান্ত মেজাজ পরিবর্তন বেশি তীব্র হতে পারে।
কীভাবে সামলাবেন?রমজান বা সাধারণ দিন, দুটো ক্ষেত্রেই কিছু কৌশল কাজে দেয় -
>> সেহরিতে জটিল কার্বোহাইড্রেট (ওটস, লাল চাল, ডাল) রাখুন, যাতে গ্লুকোজ ধীরে ধীরে ছাড়ে।
>> প্রোটিন ও ফাইবারযুক্ত খাবার যোগ করুন - এগুলো দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে।
>> পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
>> ঘুম কম হলে বিরক্তি বাড়ে, তাই বিশ্রাম গুরুত্বপূর্ণ।
>> হালকা শ্বাসব্যায়াম বা মাইন্ডফুলনেস চর্চা আবেগ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
ক্ষুধা লাগলে মেজাজ খারাপ হওয়া মানবদেহের স্বাভাবিক জৈব প্রতিক্রিয়া। এটি দুর্বলতা নয়, বরং শরীরের শক্তির সংকেত। তবে সচেতন খাদ্যাভ্যাস ও রুটিন মেনে চললে রোজার সময়ও এই ‘হ্যাংরি’ অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
সূত্র: আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
এএমপি/এএসএম