‘গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদান’ একজন নারীর জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়গুলোর দুটি। এই সময়ে শরীরে হরমোনের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে, খাদ্যাভ্যাস বদলে যায়, ঘুম ও বিশ্রামের নিয়মও পাল্টে যায়। ফলে অম্বল, বুকজ্বালা, গ্যাস, পেট ফাঁপা কিংবা বমিভাবের মতো গ্যাস্ট্রিক সমস্যা খুবই সাধারণ হয়ে ওঠে। তবে যেহেতু এ সময় মা ও শিশুর নিরাপত্তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তাই যেকোনো ওষুধ বা চিকিৎসা নেওয়ার আগে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
গর্ভাবস্থায় প্রোজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এই হরমোন পাকস্থলী ও খাদ্যনালীর মধ্যবর্তী ভালভকে কিছুটা শিথিল করে, ফলে পাকস্থলীর অ্যাসিড উপরের দিকে উঠে এসে বুকজ্বালার অনুভূতি তৈরি করে। একই সঙ্গে বড় হতে থাকা জরায়ু পাকস্থলীর ওপর চাপ সৃষ্টি করে, যা অম্বল ও অস্বস্তি বাড়ায়। স্তন্যদানকারী মায়েদের ক্ষেত্রেও অনিয়মিত খাবার, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং মানসিক চাপ গ্যাস্ট্রিক সমস্যার কারণ হতে পারে।
ন্যাশনাল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এ.কে.এম. যোবায়ের বলেন, গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মায়েদের গ্যাস্ট্রিক সমস্যার ক্ষেত্রে প্রথমেই ওষুধের দিকে না গিয়ে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা উচিত। অনেক সময় শুধু নিয়ম মেনে চললেই উপসর্গ অনেকটাই কমে যায়।
ডা. এ.কে.এম. যোবায়ের পরামর্শ অল্প অল্প করে বারবার খাওয়া অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, ঝাল ও চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা টকজাতীয় ও অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার কম খাওয়া খাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে না শোয়া পর্যাপ্ত পানি পান রাতে ঘুমানোর সময় মাথা সামান্য উঁচু রাখা আরও পড়ুন: নারীর মানসিক স্বাস্থ্য, সংসার-প্রত্যাশা ও অদৃশ্য চাপ প্যানক্রিয়াটাইটিসের ইতিহাস থাকলে কেমন সতর্কতা জরুরি? রোজায় চা-কফি ও সফট ড্রিংকস কতটা নিরাপদ? কোন ওষুধ নিরাপদ?সব গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ গর্ভাবস্থায় নিরাপদ নয়। কিছু অ্যান্টাসিড তুলনামূলক নিরাপদ হলেও, পিপিআই বা অন্যান্য শক্তিশালী ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গ্রহণ করা উচিত নয়।
ডা. যোবায়ের বলেন, অনেকে নিজের ইচ্ছায় ওষুধ খেয়ে ফেলেন, যা মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই উপসর্গ বেশি হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী নিরাপদ ওষুধ নির্বাচন করা হয়। স্তন্যদানকারী মায়েদের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা প্রযোজ্য, কারণ কিছু ওষুধ বুকের দুধের মাধ্যমে শিশুর শরীরে যেতে পারে।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন? তীব্র বা সহ্যহীন পেটব্যথা বারবার বমি বমিতে রক্ত বা কালচে রং হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া গিলতে সমস্যা হওয়া জন্ডিসের লক্ষণ মানসিক চাপ ও বিশ্রামের গুরুত্বগর্ভাবস্থা ও মাতৃত্বের শুরুর সময় মানসিক চাপও গ্যাস্ট্রিক সমস্যাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম, হালকা ব্যায়াম (চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী) এবং পরিবার থেকে সহায়তা পাওয়া, এসব বিষয় উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মায়েদের গ্যাস্ট্রিক সমস্যা খুব সাধারণ হলেও একে অবহেলা করা ঠিক নয়। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত বিশ্রাম এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এই তিনটি বিষয়ই নিরাপদ সমাধানের পথ দেখায়।
ডা. এ.কে.এম. যোবায়েরের মতে, মায়ের সুস্থতা মানেই শিশুর সুস্থতা। তাই কোনো উপসর্গ হলে লুকিয়ে না রেখে দ্রুত পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
জেএস/