গত বছরের তুলনায় প্রশাসনের শীর্ষ পদে নারীর সংখ্যা কিছুটা কমেছে। মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর সচিব নীতি-নির্ধারণী পদ হিসেবে পরিচিত। মাঠ প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ জেলা প্রশাসক (ডিসি)। এ দুটি পদেই নারীর সংখ্যা গত বছরের এ সময়ের তুলনায় এখন কম।
নারী কর্মকর্তারা বলছেন, প্রশাসনে নারীর অংশগ্রহণ আগের তুলনায় বেড়েছে। নারীরা গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে আসছেন। কিন্তু এ ধারা যাতে ব্যাহত না হয় সেদিকে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে, যত্নবান হতে হবে।
সবশেষ গত বৃহস্পতিবারের হিসাব অনুযায়ী ৭৯টি সিনিয়র/সচিব ও সমমর্যাদার পদের মধ্যে নারী ১২ জন। ৬৪ জেলার মধ্যে নারী ডিসি আছেন ১৫ জন। গত বছর (২০২৫) একই সময়ে নারী সচিব ছিলেন ১৩ জন ও ডিসি ছিলেন ১৮ জন। এটিই ছিল বিগত সময়ের মধ্যে এ দুটি পদে সর্বোচ্চ নারী কর্মকর্তা।
তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আগের সরকারের অনেক কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়ার কারণে এখনো ১০টি সচিবের পদ খালি। উল্লেখযোগ্য আরেকটি বিষয় হচ্ছে নারীদের মধ্যে কোনো সিনিয়র সচিব নেই। পুরুষ সিনিয়র সচিব ছয়জন। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ বা বড় বাজেটের মন্ত্রণালয় বা বিভাগগুলোতেও নারী সচিব নেই বললেই চলে।
নারী কর্মকর্তাদের অধিক হারে প্রশাসনের মতো চ্যালেঞ্জিং কাজে যুক্ত হওয়ার পেছনে কর্মপরিবেশ উন্নত হওয়া, পুরুষ সহকর্মীদের সহযোগিতার মনোভাবের বিষয়গুলো অনেক বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। বড় পরিসরে ডে-কেয়ার সুবিধা ও উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে নারীদের কর্মস্পৃহা বাড়বে এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর অবস্থান আরও সুসংহত হবে।-পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে আগের সরকারের নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের অনেককে সরিয়ে দিচ্ছে নতুন সরকার। সেসব পদে পর্যায়ক্রমে নিয়োগও দেওয়া হচ্ছে। এখন একটা বিশেষ সময় যাচ্ছে। কিছুদিন গেলে ও স্বাভাবিক নিয়োগ সম্পন্ন হলে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নারী কর্মকর্তার সংখ্যা বাড়বে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
কর্মকর্তাদের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, এর আগে ২০২৪ সালে ৮৬ জন সচিব, সিনিয়র সচিব ও সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তার মধ্যে নারী ছিলেন ১০ জন। ৬৪ জন জেলা প্রশাসকের (ডিসি) মধ্যে নারী ছিলেন সাতজন।
আরও পড়ুনসর্বোচ্চ সংখ্যক ডিসি ও সচিব এখন নারী‘প্রশাসনে নীতি-নির্ধারণী পদের যোগ্য অনেক নারী কর্মকর্তা আছেন’প্রথম নারী জেলা প্রশাসক পেলো বরগুনা
২০২৩ সালের এ সময়ে সিনিয়র সচিব, সচিব ও সমপদমর্যাদার ৮৫ জন কর্মকর্তার মধ্যে নারী ছিলেন ১০ জন। একই সঙ্গে ৬৪টি জেলার মধ্যে ১০ জন নারী জেলা প্রশাসক ছিলেন। ২০২২ সালে মার্চ মাসে ১২ জন সচিব কর্মরত ছিলেন, ডিসি ছিলেন আটজন।
২০২১ সালে ৭৬ জন সচিব ও সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তার মধ্যে নারী কর্মকর্তা ছিলেন ১০ জন। মাঠ প্রশাসনে ৬৪ জেলা প্রশাসকের মধ্যে নারী ছিলেন ১০ জন।
২০১৯ সালের মার্চ মাসে প্রশাসনে সিনিয়র সচিব, সচিব ও ভারপ্রাপ্ত সচিব ছিলেন ৭৮ জন। এর মধ্যে নারী কর্মকর্তা ছিলেন ছয়জন। নারীর হার ছিল প্রায় ৮ শতাংশ। ২০২০ সালের মার্চে সচিব পদে ১০ জন নারী ছিলেন। এছাড়া মাঠ প্রশাসনে ছিলেন আটজন নারী জেলা প্রশাসক।
বর্তমানে প্রশাসনে নারী সচিবপরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফারহিনা আহমেদ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসরাত চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসরীন জাহান, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ফারজানা মমতাজ, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানা।
এছাড়া রয়েছেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) জাহেদা পারভীন, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নির্বাহী চেয়ারম্যান (সচিব) নাজনীন কাউসার চৌধুরী, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব বিলকিস জাহান রিমি এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নূরুন্নাহার চৌধুরী।
আট বিভাগীয় কমিশনারের মধ্যে নারী একজন। ফারাহ শাম্মী ময়মনসিংহ বিভাগের কমিশনারের দায়িত্বে রয়েছেন।
জেলা প্রশাসক হিসেবে নারীফেনীর জেলা প্রশাসক মনিরা হক, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান, রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী, বান্দরবানের জেলা প্রশাসক শামীম আরা রিনি, রাজশাহীর জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতার, নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন, সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক আফরোজা আখতার ও বরগুনার জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তার।
অফিসিয়াল কাজের বাইরেও আমাদের নারীদের একটা আলাদা দায়িত্ব থাকে তাই না? একজন নারী তার বাসায় হচ্ছেন মা ও হাউজমেকার। সেই দায়িত্বের পাশাপাশি অফিসিয়াল দায়িত্বটাও পালন করতে হয়। এটা নারীদের জন্য আমি মনে করি এক্সট্রা একটা চ্যালেঞ্জ। কর্মজীবী নারী এ চ্যালেঞ্জটা ফেস করেই এগিয়ে যান।-ফেনীর জেলা প্রশাসক মনিরা হক
এছাড়া তাহসিনা বেগম শরীয়তপুর, শরীফা হক টাঙ্গাইল, নাজমুন আরা সুলতানা মানিকগঞ্জ, সৈয়দা নুরমহল আশরাফী মুন্সিগঞ্জ, সুলতানা আক্তার রাজবাড়ী, ইশরাত ফারজানা ঠাকুরগাঁও, অন্নপূর্ণা দেবনাথ কুড়িগ্রামের ডিসির দায়িত্বে রয়েছেন।
প্রশাসনে নারীদের অবস্থানের বিষয়ে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রতিটি অর্জনের পেছনে নারী-পুরুষের সমন্বিত প্রচেষ্টা রয়েছে। আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে বাংলাদেশের প্রশাসনে নারীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব বেড়েছে। বর্তমানে প্রশাসনে নারী কর্মকর্তারা সচিব, অতিরিক্ত সচিব, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।’
তিনি বলেন, ‘প্রশাসন ক্যাডার, পুলিশ, পররাষ্ট্র, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্যাডারে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নারী কর্মকর্তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা, ব্যাংকিং, প্রকৌশল, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, এসডিজি অর্জনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।’
‘নারী কর্মকর্তারা দক্ষতার সঙ্গে মাঠ প্রশাসনে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নারীর ক্ষমতায়নের ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করছেন। চাকরির পাশাপাশি অনেক নারী কর্মকর্তা বিদেশে স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর পড়াশোনার সুযোগ করে নিচ্ছেন। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ শেষ করে দেশে ফিরে নিজ নিজ কর্মস্থলে উন্নততর ধ্যানধারণা প্রয়োগের মাধ্যমে কাজে বৃদ্ধি করছেন গুণগত মান।’
আলেয়া আক্তার আরও বলেন, ‘নারী কর্মকর্তাদের অধিক হারে প্রশাসনের মতো চ্যালেঞ্জিং কাজে যুক্ত হওয়ার পেছনে কর্মপরিবেশ উন্নত হওয়া, পুরুষ সহকর্মীদের সহযোগিতার মনোভাবের বিষয়গুলো অনেক বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। বড় পরিসরে ডে-কেয়ার সুবিধা ও উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে নারীদের কর্মস্পৃহা বাড়বে এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর অবস্থান আরও সুসংহত হবে।’
নারীর কাজের অভিজ্ঞতা ও চ্যালেঞ্জের বিষয়ে ফেনীর জেলা প্রশাসক মনিরা হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘অফিসিয়াল কাজের বাইরেও আমাদের নারীদের একটা আলাদা দায়িত্ব থাকে তাই না? একজন নারী তার বাসায় হচ্ছেন মা ও হাউজমেকার। সেই দায়িত্বের পাশাপাশি অফিসিয়াল দায়িত্বটাও পালন করতে হয়। এটা নারীদের জন্য আমি মনে করি এক্সট্রা একটা চ্যালেঞ্জ। কর্মজীবী নারী এ চ্যালেঞ্জটা ফেস করেই এগিয়ে যান।’
ডিসি পদে সাধারণ মানুষ নারীকে কীভাবে গ্রহণ করে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নারী বা পুরুষ যেই হোক গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি আমার কর্মদক্ষতার ওপর নির্ভর করে। আমি যদি এলাকার মানুষের প্রয়োজনটা পূরণ করতে পারি, তাহলে সেখানে একসেপ্টেন্সের কোনো সমস্যা নেই। এলাকার মানুষের প্রয়োজন পূরণ করতে না পারলে, রেসপন্স করতে না পারলে, সেখানে নারী পুরুষ যেই হোক না কেন, তখন এলাকার মানুষ আর তাকে সেভাবে নেবে না। মানুষের আচরণে এটাও প্রতিফলন চলে আসে।’ নারী হিসেবে মাঠে কাজ করতে আলাদা করে কোনো প্রতিবন্ধকতা অনুভব করেন না জানিয়ে এ জেলা প্রশাসক বলেন, ‘তবে এটা ঠিক যে সমাজের মানুষজন একজন পুরুষকে যে চোখে দেখে, নারীকে সেই চোখে দেখে না। এটা ডিপেন্ড করে, সবার জন্য না।’
আরএমএম/এএসএ/এমএফএ