রাজশাহী ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে ক্ষুদ্র পোল্ট্রি খামারিরা এখন চরম সংকটের মুখে পড়েছেন। ডিমের বাজার মূল্য উৎপাদন খরচের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যাওয়ায় তারা নিরন্তন লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন। ফলে অনেক তৃণমূল পর্যায়ের উৎপাদক বাধ্য হয়ে নিজেদের খামার বন্ধ করে দিচ্ছেন।
খামার পর্যায়ে বর্তমানে প্রতিটি ডিম ৬ থেকে সাড়ে ৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা উৎপাদন খরচের চেয়ে ৩ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত কম। এমন পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে পারছেন না ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা।
রাজশাহী পোল্ট্রি কৃষক সমিতির তথ্য মতে, একসময় এ অঞ্চলে তৃণমূল পর্যায়ে প্রায় ২ হাজার ছোট ও মাঝারি ডিমের খামার ছিল। কিন্তু বারবার লোকসানের কারণে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এর মধ্যে অনেকগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।
রাজশাহী পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এনামুল হক জানান, গত দেড় বছরে এ ধরনের খামারের সংখ্যা ৫০ শতাংশেরও বেশি কমেছে।
তিনি বলেন, এই অঞ্চলে প্রায় সর্বত্র খামার ছিল, কিন্তু অনেকগুলো ইতোমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ছোট খামারগুলো ধীরে ধীরে এই খাত থেকে অদৃশ্য হয়ে যাবে।
রাজশাহী বেশ কিছু খামারি ও চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজার থেকে খাদ্য, ছানা ও ওষুধ কিনতে হওয়ায় তাদের উৎপাদন খরচ বেশি।
রাজশাহী শহরের কৃষক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, পোল্ট্রি খাদ্যের দাম বৃদ্ধিই এর মূল কারণ। প্রধান উপাদান ভুট্টা বর্তমানে প্রতি কেজি ৩২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা স্বাভাবিক মৌসুমী মূল্য ২৫-২৭ টাকা থেকে অনেক বেশি। অন্যদিকে সয়াবিনের দাম ৪৯-৫২ টাকা থেকে বেড়ে ৬২-৭০ টাকায় পৌঁছেছে।
তিনি বলেন, সয়াবিন বা ভুট্টার দাম ১ টাকা বৃদ্ধি পেলে প্রতি কেজি খাদ্য উৎপাদন খরচ ১০ টাকা বেড়ে যায়। গত পাঁচ মাসে ক্রমাগত ক্ষতির কারণে আমি ইতিমধ্যে ৪ হাজার ডিম উৎপাদনকারী মুরগি মাংস হিসেবে বিক্রি করেছি।’
গোদাগাড়ী উপজেলার কালিপুর গ্রামের খামারি জিয়ারুল ইসলাম জানান, ডিমের দাম কমে যাওয়ায় তিনি শুধু ফেব্রুয়ারি মাসেই প্রায় ১ লাখ টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। অক্টোবরে সাদা ডিম ৮.১০ টাকা এবং বাদামি ডিম ৯.১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, এখন তা ২-৩ টাকা কমে গেছে।
ক্ষুদ্র খামারিরা অভিযোগ করছেন, বৃহৎ আকারের বিনিয়োগকারীরা এ সংকট আরও বাড়িয়ে তুলছে।
রাজশাহীর পবা উপজেলার চাষি আতিকুর রহমান বলেন, বড় খেলোয়ারাড়া তাদের নিজস্ব হ্যাচারি ও ফিড মিলের মালিক হওয়ায় কম বাজার মূল্য সহ্য করতে পারেন। কিন্তু যারা খোলা বাজার থেকে সবকিছু কেনেন, তাদের জন্য এটা টেকসই নয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বড় উৎপাদকরা প্রতিদিন লাখ লাখ ডিম উৎপাদন করছেন এবং তারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। এটি ছোট কৃষকদের ব্যবসা থেকে সরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টা বলে মনে হচ্ছে।
এনামুল হক সতর্ক করে বলেন, ছোট খামারগুলো বন্ধ হয়ে গেলে পোল্ট্রি বাজার মাত্র কয়েকজন বড় উৎপাদকের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যাবে। এতে প্রতিযোগিতা কমে যাবে।
রাজশাহী চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাসুদুর রহমান বলেন, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ডিম উৎপাদন, হাঁস-মুরগি পালন এমনকি প্রজনন সবকিছুতেই জড়িত। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারছে না।
তিনি এ খাতের ভারসাম্য রক্ষায় সরকারের হস্তক্ষেপের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ক্ষুদ্র পোল্ট্রি খামারিদের সুরক্ষার জন্য সরকারকে নীতিগত উদ্যোগ ও কার্যকর বাজার পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
সাখাওয়াত হোসেন/এনএইচআর/এমএস