আন্তর্জাতিক

প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে টাকা না পাওয়ায় ইসরায়েলে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা

ইসরায়েলের সরকারি প্রোপাগান্ডা তদারকি করা দপ্তরের সাবেক কর্মী ও ঠিকাদাররা বকেয়া অর্থ না পাওয়ার অভিযোগে দেশটির সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তাদের দাবি, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে করা কাজের জন্য তারা ‘মিলিয়ন মিলিয়ন শেকেল’ পাওনা রয়েছেন। ইসরায়েলি দৈনিক ক্যালকালিস্টের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই।

ইসরায়েলের সরকারি জনকূটনীতি কার্যক্রম পরিচালনাকারী সংস্থাটি হিব্রু ভাষায় ‘হ্যাসবারা’ নামে পরিচিত। অভিযোগ করা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের শুরুর সময় যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ঠিকাদার প্রোপাগান্ডার কাজে সেবা দিয়েছিল, তাদের অনেককেই এখনো অর্থ পরিশোধ করা হয়নি।

খবরে বলা হয়েছে, দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে প্রায় ২০ লাখ শেকেল (প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার) দাবি করেছে। প্রতিষ্ঠান দুটি ইসরায়েলের নেতাদের জন্য স্টুডিও সুবিধা দেওয়া এবং ইউরোপে বিভিন্ন প্রচারণামূলক কার্যক্রমে অর্থায়ন করেছিল।

আরও পড়ুন>>মেডজুল খেজুরের ৫০ শতাংশই ইসরায়েলি, চাষ দখল করা ভূমিতেইসরায়েলের চেয়ে ফিলিস্তিনের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল মার্কিনিরা: জরিপবোর্ড অব পিসের আড়ালে গাজায় ৩৫০ একরের সামরিক ঘাঁটি গড়ার পরিকল্পনা

এদিকে ব্রিটিশ-ইসরায়েলি নাগরিক আইলন লেভি ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত ইসরায়েল সরকারের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনিও টাকা পাওনা থাকার কথা জানিয়েছেন। তবে দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও টাকা না পাওয়ায় তিনি মামলায় অংশ নিচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন।

মিডল ইস্ট আইকে দেওয়া এক বক্তব্যে লেভির মুখপাত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। সরকারি দায়িত্ব ছাড়লেও লেভি এখনো সামাজিক মাধ্যমে ইসরায়েলের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, ইরান যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছে এবং যুক্তরাজ্যের উচিত দেশটিকে শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা।

ইসরায়েলের প্রোপাগান্ডা মিশন

ক্যালক্যালিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর হ্যাসবারা দপ্তরে দ্রুত অনেক স্বাধীন কর্মী, ইনফ্লুয়েন্সার ও ঠিকাদারকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এদের অনেককে সরাসরি রাষ্ট্রীয়ভাবে নিয়োগ না দিয়ে বেসরকারি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশে ইসরায়েলের পক্ষে কাজ করা অনেকের অর্থ পরিশোধের মাধ্যম হয়ে ওঠে এসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।

এই কার্যক্রমে যুক্ত একাধিক ঠিকাদার দাবি করেছেন, পুরো ব্যবস্থাপনাই ছিল অত্যন্ত বিশৃঙ্খল।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াভ গ্যালান্টের সাক্ষাৎকারের জন্য আলাদা স্টুডিও সরবরাহ করা একটি প্রতিষ্ঠান এখন প্রায় পাঁচ লাখ শেকেলের বেশি বকেয়া অর্থ দাবি করছে।

ইন্টেলেক্ট নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের কাছে প্রায় ১৫ লাখ শেকেলের বেশি পাওনা দাবি করেছে। এই দপ্তরই হ্যাসবারা কার্যক্রম তদারকি করে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রতিষ্ঠানটি নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে ফ্লাইটের অর্থায়ন করেছিল। সেখানে আন্তর্জাতিক আদালতে শুনানির সময় ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভের বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা চালানোর জন্য ইনফ্লুয়েন্সারদের পাঠানো হয়েছিল।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর জানিয়েছে, জনকূটনীতি দপ্তরের চুক্তি প্রক্রিয়ায় কিছু অনিয়মের বিষয় সামনে এসেছে। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকায় এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করা সম্ভব নয়।

বাড়ছে প্রোপাগান্ডা ব্যয়

২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলের প্রোপাগান্ডা কার্যক্রম শুধু হ্যাসবারা দপ্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসবিষয়ক মন্ত্রণালয়ও এই প্রচারণায় বড় অংকের অর্থ ব্যয় করেছে।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েল সরকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হ্যাসবারা কার্যক্রমের জন্য অতিরিক্ত ১৫ কোটি শেকেল বাজেট অনুমোদন দেয়। এর আগে এই খাতে প্রায় ৫২ কোটি শেকেল বরাদ্দ ছিল।

অতিরিক্ত অর্থের একটি অংশ উচ্চশিক্ষা খাতের বাজেট থেকে নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

একই সময়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সারের নেতৃত্বে নতুন একটি জনকূটনীতি দপ্তর গঠন করা হয়। সেখানে ব্লগার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সারদের যুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল। কারণ ইসরায়েলের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছিল যে হ্যাসবারা কার্যক্রম প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না।

২০২৪ সালের জুনে প্রকাশ পায়, প্রবাসবিষয়ক মন্ত্রী আমিচাই চিকলি যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোকে লক্ষ্য করে একটি প্রোপাগান্ডা প্রচারণা চালান। এর লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের আইনে ইহুদিবিদ্বেষের সংজ্ঞা নতুনভাবে নির্ধারণের চেষ্টা করা।

এর এক বছর পর, ২০২৫ সালের মে মাসে চিকলির মন্ত্রণালয় ইসরায়েল ও বিদেশে হ্যাসবারা কার্যক্রম চালাতে বসতি স্থাপনকারী বিভিন্ন পৌরসভাকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ শেকেল পর্যন্ত অর্থ সহায়তার প্রস্তাব দেয়।

সূত্র: মিডল ইস্ট আইকেএএ/