ইরানে হামলা-পাল্টা হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যে এখন টালমাটাল অবস্থা। চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সরবরাহে চরম অনিশ্চয়তা আর শঙ্কা বিরাজ করছে। অনেক দেশেই তেল সরবরাহ আর বাজার ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়েছে।
যেসব দেশ আগে থেকেই জ্বালানি তেল সংরক্ষণের অবকাঠামো গড়ে তুলেছে এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য মজুত রাখার সক্ষমতা তৈরি করেছে, তারা তুলনামূলকভাবে কম ভোগান্তিতে পড়ছে। পর্যাপ্ত মজুত সুবিধা থাকায় এসব দেশ সাময়িক সরবরাহ বিঘ্নিত হলেও মজুত তেল ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে। বিপরীতে যেসব দেশের সংরক্ষণ সক্ষমতা সীমিত, তারা সরবরাহ ঘাটতি ও বাজার ঝুঁকিতে পড়ছে।
কোন দেশ কত দিনের জ্বালানি তেল মজুত রাখতে পারে?
এশিয়া মহাদেশের কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি, সরকারি তেল নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চীনের ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট রিফর্ম কমিশনের তথ্য বলছে, দেশটিতে ৯০ দিনের জ্বালানি তেল মজুত করার সক্ষমতা আছে।
আরও পড়ুন:
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় নিহত ১২৫৫
খুব শিগগির ইরান যুদ্ধ শেষ হবে: ট্রাম্প
জাপানের সরকারি সংস্থা জাপান অয়েল, গ্যাস অ্যান্ড মেটালস ন্যাশনাল কর্পোরেশনের তথ্য বলছে, দেশটির ২০০-২৪০ দিনের, দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি সংস্থা কোরিয়া ন্যাশনাল অয়েল কর্পোরেশনের তথ্যমতে দেশটির ৯০-১০০ দিনের, ভারতের সরকারি সংস্থা ইন্ডিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভস লিমিটেডের (আইএসপিআরএল) তথ্যমতে দেশটির ৭৪-৮০ দিনের জ্বালানি তেল মজুতের সক্ষমতা আছে।
অপরদিকে, থাইল্যান্ডের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, দেশটিতে আইন অনুযায়ী ৬০ দিনের জ্বালানি তেল মজুত রাখা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক।
ইন্দোনেশিয়ার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশটির ২০-২৫ দিনের, মালয়েশিয়ার সরকারি সংস্থা পেট্রোনাসের তথ্যমতে, দেশটির ৫০-৬০ দিনের, সিঙ্গাপুরের এনার্জি মার্কেট অথরিটির তথ্যমতে, দেশটির বাণিজ্যিক স্টোরেজসহ ৯০ দিনের, পাকিস্তানের সরকারি সংস্থা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস রেগুলেটরি অথরিটির তথ্যমতে, দেশটির ২০-২৫ দিনের, শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রীয় তেল সংস্থা সিলন পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তথ্যমতে, দেশটির ২০-২৫ দিনের তেল মজুতের সক্ষমতা আছে।
মিয়ানমার অয়েল অ্যান্ড গ্যাস এন্টারপ্রাইজের তথ্যমতে, দেশটিতে জ্বালানি তেলের প্রকারভেদে ৩১-৫৪ দিনের মজুতের সক্ষমতা আছে। আর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের তথ্যমতে, জ্বালানি তেল মজুতের সক্ষমতা আছে মাত্র ৩৫-৪০ দিনের।
বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের বাজার
বাংলাদেশে তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। সংস্থাটি তেল আমদানির পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তেলের মজুত, বাজারে সরবরাহ এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনা করে থাকে। তারা দেশের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ও পাইকারি বাজারে তেলের সঠিক বিতরণ তদারকি করে যাতে সরবরাহ বিঘ্ন বা তেলের অভাব দেখা না দেয়। এছাড়া, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বা সংকটের সময় পর্যাপ্ত মজুত তেল ব্যবহার করে দেশের চাহিদা মেটাতে সহায়তা করে। বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণ, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা এবং আমদানিকারকদের তদারকির মাধ্যমে তারা সাধারণ মানুষের বোঝা কমাতে এবং অপ্রত্যাশিত সংকট মোকাবিলায় মূল ভূমিকা পালন করে।
বড় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড
অপরিশোধিত তেল থেকে পেট্রোল, ডিজেল, হেভি ফিউয়েল ও ন্যাফটা প্রভৃতি তেল জাতীয় পণ্য উৎপাদন করে এবং দেশের তেলের আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়ক এই প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ইউনিট কার্যক্রম চালাচ্ছে, যা দেশের চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করছে। ভবিষ্যতে দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ হবে এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও দক্ষ ও পরিবেশবান্ধব পণ্য উৎপাদন সম্ভব হবে।
দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ কতদূর?
১৯৬৬ সালে চট্টগ্রামের গুপ্তখাল এলাকায় ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর বর্তমান প্ল্যান্ট স্থাপিত হয়। ১৯৬৮ সালের ৭ মে সরকার বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করে এই রিফাইনারি। ফ্রান্সের টেকনিপ এই প্ল্যান্টটি নির্মাণ করে। বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক ১৫ লাখ টন পেট্রোলিয়াম ক্রুড পরিশোধন করার সুবিধা রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে ইস্টার্ন রিফাইনারির বর্তমান স্থাপনার মধ্যে ৩০ লাখ মেট্রিক টন সক্ষমতার ‘ইনস্টলেশন অব ইআরএল ইউনিট-২’ প্রকল্পটি হাতে নেয় বিপিসি। ২০১২ সালে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। শুরুর দিকে সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা প্রকল্প ব্যয় ধরা হলেও পরবর্তী সময়ে ২০১৬ সালে একাধিকবার সংশোধিত হয়ে ১৬ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। প্রকল্পের ফিড কন্ট্রাক্টর হিসেবে ফ্রান্সের টেকনিপকে নিয়োগ দেওয়া হয়। টেকনিপ প্রকল্পটির (ইআরএল-২) ডিজাইন সম্পন্ন করে।
প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট (পিএমসি) হিসেবে নিয়োগ পায় ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেড (ইআইএল)। ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল ভারতীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি করে বিপিসি। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর উপস্থিতিতে চুক্তি সই হয়। ওইদিন প্রতিমন্ত্রী বলেন, পরবর্তী বছরের মধ্যেই ইআরএল-২ প্রকল্পের ভৌত কাজ শুরু হবে। কিন্তু দীর্ঘ ১০ বছরে বেশি সময় পেরোলেও প্রকল্পের মূল কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
আরও পড়ুন:
মোটরসাইকেল রাইড শেয়ার চালকরা ৫ লিটার তেল নিতে পারবেন
স্পট মার্কেট থেকে দুই লাখ টন ডিজেল কিনছে বিপিসি
সম্ভাব্য তেল সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশসহ কোন দেশ কী পদক্ষেপ নিচ্ছে?
সময় গড়ানোর কারণে প্রকল্প ব্যয়ও বেড়ে যায়। পরে এটি আবারও সংশোধন করে ২০২২ সালের শেষের দিকে প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২৩ হাজার ৫৮ কোটি ৯৩ লাখ ৯২ হাজার টাকা। প্রকল্প ব্যয়ের ৭০ শতাংশ সরকার এবং ৩০ শতাংশ বিপিসির নিজস্ব অর্থে ব্যয় করার প্রস্তাব করা হয়। এতে ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি সরকারি জিওবি খাত থেকে ১৬ হাজার ১৪২ কোটি ৯৯ হাজার টাকা ঋণ হিসেবে অনুমোদন দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। অবশিষ্ট ৬ হাজার ৯১৬ কোটি ৯২ লাখ ৯৩ হাজার টাকা বিপিসির নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ব্যয় মেটানোর কথা ছিল।
২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে প্রকল্প প্রস্তাবনাটি ফের সংশোধন করে প্রকল্প ব্যয় ২৩ হাজার ৭৩৬ কোটি ১০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ হিসেবে জিওবি ফান্ড থেকে ১৬ হাজার ৬৩৫ কোটি ২৬ লাখ ৭৯ হাজার টাকা এবং বিপিসির নিজস্ব তহবিল থেকে ৩০ শতাংশ হিসেবে ৭ হাজার ১শ কোটি ৮৩ লাখ ৮৪ হাজার টাকা অর্থায়নের একটি প্রস্তাবনা অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেয় জ্বালানি বিভাগ।
প্রকল্পটি অনুমোদনের অপেক্ষমাণ থাকা অবস্থায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে প্ল্যান্টটি নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করে সমালোচিত শিল্প গ্রুপ এস আলম। ২০২৩ সালের ২৯ জানুয়ারি এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম স্বাক্ষরিত একপত্রের মাধ্যমে সমঝোতা স্মারকের একটি প্রস্তাবনা জমা দেয়। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে ইআরএল-২ প্রকল্পটি আবারও নিজস্ব ব্যবস্থায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় বিপিসি।
এরপর ২০২৫ সালে গত ১১ আগস্ট ‘মর্ডানাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)’ নামে পুনর্গঠিত ডিপিপি জ্বালানি ও খনিজ বিভাগে পাঠায় বিপিসি। নতুন ডিপিপিতে প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৪৩ হাজার ৮৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়নে ঋণ হিসেবে ৬০ শতাংশ এবং অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ বিপিসির নিজস্ব আয় থেকে বহন করার কথা বলা হয়। সে হিসেবে প্রাক্কলিত ব্যয়ের ২৫ হাজার ৮৫২ কোটি ৫১ লাখ টাকার জিওবি এবং অবশিষ্ট ১৭ হাজার ২৩৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা বিপিসি বহন করবে বলে ওই সময়ের বিপিসি চেয়ারম্যান আমিন উল আহসান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। পরে দুই দফায় কাটছাঁট করে চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি একনেকে বর্তমানে প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৩১ হাজার কোটি ৫৭ লাখ টাকা। ২০৩০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইআরএল সূত্রে জানা যায়, ইআরএল-২ প্রকল্পটি চালু হলে ইআরএলের ক্রুড অয়েল পরিশোধন ক্ষমতা প্রতি বছর ৪৫ লাখ মেট্রিক টনে দাঁড়াবে। এতে মোট চাহিদার ৭৫ শতাংশ মেটানো সম্ভব হবে। ইআরএল-২ এর মাধ্যমে ফিনিশড প্রোডাক্ট হিসেবে এলপিজি, গ্যাসোলিন ইউরো-৫, জেট এ-১, ডিজেল ইউরো-৫, গ্রুপ-৩ বেজ অয়েল, ফুয়েল অয়েল, বিটুমিন ও সালফার পাওয়া যাবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক শিক্ষক জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, রিফাইনারিতে দ্বিতীয় ইউনিটের কাজের জন্য অনেকেই সাপোর্ট দেয়নি তখন। তবে এখন দেখা যাচ্ছে এটার প্রয়োজনীয়তা আছে। এখানে ক্রুড অয়েল থেকে অন্য প্রডাক্ট উৎপাদন করা যাবে।
তিনি বলেন, রিফাইনারিতে অনেক রকমের প্রোডাক্ট হয়। সবগুলোর ডিমান্ড আমাদের নেই। তখন ওগুলোকে কম দামে বিক্রি করতে হয়। প্লাস মাইনাস করে আমার মনে হয় না যে খুব একটা সাশ্রয় হবে। কিন্তু সংকটের সময় লাভ হবে আমাদের।
তিনি আরও বলেন, এটার কারণে ওখানে অন্য দেশের নতুন প্রযুক্তি আসবে, অনেকের চাকরি হবে। ইকোনোমি গ্রোথ করবে। দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ শেষ হলে আমরা সুফল পাবো।
এনএস/এসএনআর/এমএমএআর