নিজ দেশের মাটিতে যখন ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র মুহুর্মুহু মিসাইল হামলা চালিয়ে স্কুলের শিশুসহ হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করছিল, তখন ইরানী নারী ফুটবলাররা অস্ট্রেলিয়ায় খেলছিল এএফসি নারী এশিয়ান কাপ ফুটবল। শুধু তাই নয়, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গিয়ে ম্যাচ শুরুর আগে তারা জাতীয় সংগীত গাইতেও অস্বীকৃতি জানায়।
একদিকে চলমান যুদ্ধের কারণে আকাশপথ পুরোপুরি বন্ধ, অন্যদিকে নারী ফুটবলাররা বিদেশের মাটিতে খেলতে গিয়ে ইরানের বর্তমান সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, এ কারণে অস্ট্রেলিয়ায় তারা গভীর এক অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে গেছে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে ইরানী নারী ফুটবল দলের ২৬ সদস্যের মধ্যে ৫জন ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় (রাজনৈতিক) আশ্রয়ের আবেদন করেন। যাদেরকে আশ্রয় দেয়া হয়েছে। বাকি ২১ জন এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন- তারা দেশে ফিরবেন নাকি অস্ট্রেলিয়াতেই থেকে যাওয়ার চেষ্টা করবেন।
ইরান নারী দলটি টুর্নামেন্ট খেলতে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছেছিল ফেব্রুয়ারির শেষদিকে। ঠিক সেই সময় থেকেই ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হয় এবং ইরানের পক্ষ থেকে পাল্টা জবাব দেওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রী টনি ব্রুক জানিয়েছেন, মানবিক ভিসার মাধ্যমে পাঁচ খেলোয়াড়কে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক খেলোয়াড়ের জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা কঠিন, তা কল্পনাও করা যায় না। তবে যারা আশ্রয় পেয়েছে, তাদের মধ্যে স্বস্তি ও আনন্দ ছিল।’
অস্ট্রেলিয়া সরকার জানিয়েছে, শুধু পাঁচজন নয়- দলের সব খেলোয়াড়ের জন্যই আশ্রয়ের সুযোগ খোলা রাখা হয়েছে। চাইলে তারা অস্ট্রেলিয়ান কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে একই ধরনের সুরক্ষা চাইতে পারবেন।
ফক্স নিউজ জানিয়েছে, যুক্তরাস্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অস্ট্রেলিয়াকে আহ্বান জানিয়েছেন যাতে তারা ইরানের নারী জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড়দের আশ্রয় দেয়। মূলত ইরানের নারী ফুটবলাররা তাদের দেশের জাতীয় সংগীত না গাওয়ার ঘটনার পর তিনি এই আহ্বান জানান। ট্রাম্প বলেছেন, ‘অস্ট্রেলিয়া যদি (আশ্রয়) না দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের আশ্রয় দেবে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ইরানের নারী জাতীয় ফুটবল দলকে জোর করে এমন একটি দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার অনুমতি দিয়ে অস্ট্রেলিয়া ভয়াবহ মানবিক ভুল করছে, যেখানে তাদের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। এটা করবেন না, মি. প্রধানমন্ত্রী- তাদের আশ্রয় দিন। আপনারা যদি না দেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের গ্রহণ করবে। এই বিষয়টির প্রতি মনোযোগ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।’
ইরান নারী ফুটবল দলের নিরাপত্তা ও আশ্রয় দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছে ফুটবলারদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ফিফপ্রো। তারা একই সঙ্গে এ আহ্বান জানান বিশ্ব ফুটবল সংস্থা ফিফা, এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন এএফসির কাছেও।
রোববার এএফসি নারী এশিয়া কাপে ফিলিফাইনের কাছে ২-০ গোলে হারের পর অস্ট্রেলিয়ার গোল্ড কোস্ট স্টেডিয়াম থেকে ইরান দলের বাস ছাড়তে বিলম্ব হয়। স্টেডিয়ামের বাইরে জড়ো হওয়া একদল বিক্ষোভকারী বাসের পাশে ধাক্কাধাক্কি করে এবং ‘তাদের যেতে দাও’ স্লোগান দেয় ও ইরানের পুরনো পতাকা নাড়াতে থাকে।। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সিডনিতে অনুষ্ঠিত ফিফপ্রোর সাধারণ সভায় সংগঠনটির এশিয়া- ওশেনিয়া অঞ্চলের সভাপতি বিউ বোশ জানান, এখনো তারা ইরান নারী দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেননি। তবে খেলোয়াড়দের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বোশ বলেন, ‘এটি খুবই জটিল পরিস্থিতি। কেউ হয়তো ইরানে ফিরে যেতে চাইবে, আবার কেউ অস্ট্রেলিয়ায় থেকে আশ্রয় চাইতে পারে। অনেক খেলোয়াড় নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্নও হতে পারেন।’
ঘটনার সূত্রপাত মূলতঃ নারী এশিয়া কাপে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ইরান দলের খেলোয়াড়রা জাতীয় সংগীত না গাওয়া নিয়ে। বিষয়টা বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। এটি অনেকের কাছে নীরব প্রতিবাদ হিসেবে দেখা হয়, যেমনটি দেখা গিয়েছিল ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপে ইরান পুরুষ দলের ক্ষেত্রেও।
পরবর্তী ম্যাচগুলোতে অবশ্য তারা জাতীয় সংগীত গেয়েছিল এবং পতাকাকে সম্মান জানিয়েছিল; কিন্তু ইরানের এক টেলিভিশন উপস্থাপক মোহাম্মদ রেজা শাহবাজি খেলোয়াড়দের ‘যুদ্ধকালীন বিশ্বাসঘাতক’ বলে মন্তব্য করেন এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানকালে ইরানি খেলোয়াড়দের ওপর কড়া নজরদারি রাখা হয়েছিল। তাদের কেবল আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয় এবং খেলার বাইরের প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে বলা হয়। এমনকি যারা আশ্রয় চাইতে আগ্রহী, তাদের মানবাধিকার আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেও বাধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিউ বোশ বলেন, ‘খেলোয়াড়রা এখনো অস্ট্রেলিয়ায় রয়েছে। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে ফিফা, এশীয় ফুটবল সংস্থা এবং অস্ট্রেলিয়া সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যাতে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।’
টুর্নামেন্টে শেষ ম্যাচে ফিলিপাইনের কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার পর ইরান দলের সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, দেশে ফিরে যাওয়া। দলের প্রধান কোচ মারজিয়েহ জাফারি জানিয়েছিলেন, অনেক খেলোয়াড় যত দ্রুত সম্ভব ইরানে ফিরতে চান।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থোনি অ্যালবানিজ বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ানরা এই সাহসী নারীদের পরিস্থিতিতে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হয়েছে। তারা এখানে নিরাপদ, এবং এখানে নিজেদের ঘরের মতো অনুভব করতে পারে।’
পরিস্থিতির এই জটিলতায় এখনো স্পষ্ট নয় কবে ইরান দলের বাকি খেলোয়াড় ও কর্মকর্তারা অস্ট্রেলিয়া ছাড়বেন বা আরও কেউ আশ্রয়ের আবেদন করবেন কি না। পরিবারের নিরাপত্তা, দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং ব্যক্তিগত ভবিষ্যতের প্রশ্ন- সব মিলিয়ে কঠিন এক সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন ইরান নারী ফুটবল দলের সদস্যরা।
আইএইচএস/