ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধের প্রভাব বিশ্বের তেলবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। এই সংঘাতের ফলে বৈশ্বিক তেল উৎপাদনে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিঘ্ন দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। এর জেরে গত সোমবার (৯ মার্চ) আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম চার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছোঁয়।
এরপর সামান্য কমলেও দাম ১০০ ডলারের কাছাকাছিই রয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯৪ দশমিক ৭৭ ডলার হয়েছে, যা আগের দিনের তুলনায় প্রায় ৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্টের দাম বেড়ে হয়েছে ৯৮ দশমিক ৯৬ ডলার, যা আগের দিনের তুলনায় প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি।
আরও পড়ুন>>রেকর্ড উচ্চতা থেকে ‘মাইনাস’ দাম: দুই দশকে তেলের বাজারে নাটকীয় অস্থিরতাবিশ্ববাজারে তেলের দাম ১১০ ডলার ছাড়িয়েছেএশিয়ার কোন দেশে জ্বালানি তেলের মজুত কত?
এর আগে সর্বশেষ ২০২২ সালের মার্চে, রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছিল। ওই বছরের জুলাই পর্যন্ত দাম ওই স্তরের আশপাশেই ছিল।
কেন বাড়ছে তেলের দামবিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বাড়ার প্রধান দুটি কারণ রয়েছে— হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে তেল উৎপাদন কমে যাওয়া।
মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ যাতায়াত করে। ইরান এই প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী ট্যাংকারে হামলার হুমকি দেওয়ায় অঞ্চলে তেল পরিবহন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, এই সরবরাহ বিঘ্নের পরিমাণ ১৯৫৬-৫৭ সালের সুয়েজ সংকটের সময়কার রেকর্ডের প্রায় দ্বিগুণ বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিশ্লেষণা প্রতিষ্ঠান র্যাপিডান এনার্জি গ্রুপ।
এছাড়া যুদ্ধের কারণে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতাও কার্যত বাজারে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। সাধারণত এই অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা তেলবাজারে বড় ধাক্কা সামাল দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা বব ম্যাকন্যালি বলেন, ‘বাজারে এখন কার্যত কোনো সুরক্ষা বলয় নেই। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো বিকল্প উৎপাদকও নেই।’
অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও। যুক্তরাষ্ট্রে এক সপ্তাহের মধ্যে পেট্রলের দাম প্রায় ৫০ সেন্ট বেড়ে প্রতি গ্যালন ৩ দশমিক ৪৮ ডলার হয়েছে। এটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই মেয়াদের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি।
সংকট কতদিন চলবে?বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বে তেলের মোট সরবরাহে বড় ঘাটতি নেই। যুদ্ধ শুরুর আগে বাজারে তেলের সরবরাহ বেশি থাকায় দাম তুলনামূলক কম ছিল—প্রতি ব্যারেল প্রায় ৬০ ডলারের কাছাকাছি।
তবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে দাম আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকেরা। জ্বালানি বিশ্লেষণা প্রতিষ্ঠান কেপলারের প্রধান তেল বিশ্লেষক হোমায়ুন ফালাকশাহি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক চলাচল দ্রুত শুরু না হলে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।
এদিকে বাজারের চাপ কমাতে জি-৭ দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকে যৌথভাবে তেল মজুত ছাড়ার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী তেলবাহী জাহাজকে বিমা সুবিধা দেওয়ারও পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে সংঘাত অব্যাহত থাকলে এবং হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক তেল পরিবহন শুরু না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সূত্র: সিএনএনকেএএ/