খুলনার তেরোখাদা উপজেলার বাসিন্দা দিদার শেখ। তিনি তার ৭৫ বছর বয়সী অসুস্থ বাবাকে চিকিৎসা করাতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন। কর্তব্যরত চিকিৎসক কিছু মেডিকেল টেস্ট দেন। তাকে একটি কাগজে বেসরকারি একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নাম ও সেখানকার প্রতিনিধির নম্বর লিখে দেওয়া হয়েছে।
বটিয়াঘাটা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী দীপংকর দাস মেঝেতে বিছানা করে একা বসেছিলেন। তাকে জিজ্ঞাসা করতে তিনি বলেন, ‘আমি দুইদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি আছি। আমার বউ ও মেয়ে বাড়ি গেছে খাবার আনতে। মেডিকেল টেস্ট করাইছি। কিন্তু ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নাম মনে নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘সকালে হাসপাতাল থেকে রুটি আর কলা দিয়েছে। দুপুর এবং রাতে মাছ বা মাংস দেয়। কিন্তু পরিমাণে তা অনেক কম। পেট ভরে না।’
খালিশপুর থেকে ডাক্তার দেখাতে এসেছেন মিনা বেগম। তিনি বলেন, ‘অনেকদিন ধরে কোমরে আর পায়ে ব্যথা। ডাক্তারের দেওয়া ওষুধ খাচ্ছি। সমস্যা না কমায় তিনমাস পর আবার ডাক্তার দেখাতে এসেছি। টেস্ট করাতে হবে। আমরা চাই সরকারিভাবে টেস্ট করাতে। কিন্তু ডাক্তারের কম্পাউডার বলছেন, বাইরে থেকে টেস্ট করাতে হবে।’
সোমবার (৯ মার্চ) খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে একাধিক রোগীদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র দেখা যায়। পরে হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী মো. আইনুল ইসলামের সঙ্গে কয়েক দফা দেখা করতে গেলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে জানানো হয়। এমনকি তথ্য চাওয়ার বিষয়ে তাকে অবগত করা হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এ হাসপাতাল ঘিরে হওয়া অনিয়ম ও দুর্নীতি এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। রোগীদের চিকিৎসা সেবাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। জবাবদিহিতা না থাকায় নিম্ন আয়ের মানুষ চিকিৎসা সেবা নিতে এসে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন। রোগীদের খাবারে অনিয়ম, টেস্ট বাণিজ্য এবং ওষুধ চুরি এখন প্রতিদিনের রুটিন করা দুর্নীতিতে পরিণত হয়েছে। আমরা সিন্ডিকেটের বাইরে যেয়ে কিছু বলতে পারি না। বলতে গেলে সোজা বান্দরবান ট্রান্সফার করে পাঠাতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিদিন মেডিকেলে হাজারের ওপরে রোগী ভর্তি থাকেন। প্রত্যেকের খাবার বাবদ ১৭৫ টাকা বরাদ্দ থাকে। কিন্তু মানসম্মত খাবার দেওয়া হয় না। এমনকি খাবার কম দিয়ে বাকি খাবার বাইরে বিক্রিও করা হয়। এ নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই।’
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর সূত্রে জানা যায়, খুলনা মহানগরীতে ২৯৬টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। তার মধ্যে প্রায় ২৪টির লাইসেন্স নেই। অন্যান্যগুলোর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান তাদের লাইসেন্স নিয়মিত নবায়ন করছেন না।
খাবারের অনিয়ম নিয়ে জিজ্ঞাসা করলে রান্নাঘরের দায়িত্বে থাকা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘খাবার কম দেওয়া হয় না কিংবা বাইরেও বিক্রি হয় না। বেচে যাওয়া খাবার অনেক সময় এখানে যারা কাজ করেন তারা নিয়ে যান।’
হাসপাতাল সূত্র বলছে, প্যাথলজি বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা চলছে। রোগীদের রক্ত, প্রস্রাব, টিস্যু পরীক্ষাসহ বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক টেস্টে অতিরিক্ত সময় লাগা, রিপোর্ট জালিয়াতি এবং অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালে যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে কিংবা টেস্ট হয় না বলে বাইরে রোগী পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
এসব বিষয়ে জানতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী মো. আইনুল ইসলামের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, টেন্ডার নিয়ে একটু ব্যস্ত আছি।
পরে বলেন, খাবার ঘরের অভিযোগের বিষয়ে কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। স্টুয়ার্ডকেও সতর্ক করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালালদের ধরতে গেলে তারা পালিয়ে যান। তবে আমরা এ বিষয়ে সতর্ক রয়েছি।
প্যাথলজির বিষয়ে তথ্য চাইলে বলেন, একটু সময় লাগবে। পরে দিতে পারবো।
এসআর/এমএস