দেশজুড়ে

রাঙ্গামাটিতে পাইকারি হাটে অর্ধেকে নামলো আনারসের দাম

পাহাড় ও হ্রদবেষ্টিত জেলা রাঙ্গামাটির ভাসমান হাট ‘সমতাঘাটে’ পুরোদমে উঠতে শুরু করেছে মৌসুমী ফল আনারস। তবে রমজানের শুরুতে ফলটির দাম চড়া থাকলেও এক সপ্তাহের ব্যবধানে তা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে উৎপাদন খরচ তোলা নিয়ে কৃষকরা কিছুটা শঙ্কিত হলেও লোকসানের কথা জানিয়েছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকারি ব্যবসায়ীরা।

সরেজমিনে শহরের বনরূপা বাজারের সমতাঘাটে গিয়ে দেখা যায়, হ্রদের বুকে আনারস বোঝাই নৌকার ভিড়। তবে রমজানের এক সপ্তাহ আগে যে আনারস আকারভেদে পতি পিস ১০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, বর্তমানে তা মাত্র ৫ থেকে ২২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এতে কৃষক কিছুটা হতাশ হলেও বাজারের ধরণ যে এমনই তা একরকম মেনেই নিয়েছেন তারা।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, রাঙ্গামাটিতে এ বছর ২ হাজার ২৪৫ হেক্টর জমিতে আনারসের আবাদ হয়েছে, আর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৮ হাজার মেট্রিকটন। জানা যায়, প্রতি সপ্তাহের শনি ও বুধবার বসে মৌসুমি ফলের এই পাইকারি বাজার।

জেলার লংগদু উপজেলার কাট্টলী থেকে আনারস নিয়ে আসা ব্যবসায়ী মধু চাকমা জানান, বুধবার ৯ হাজার ৭শ পিস আনারস বিক্রি করেছি। প্রতি পিসের দাম ১৮ টাকা দরে। তবে রোজার শুরুতে ৩০-৪০ টাকায় বিক্রি করেছি প্রতিপিস। এখন চাহিদা কমতে শুরু করেছে তাই দামও কমছে, আর বৃষ্টি না হওয়ায় এখন আনারসের সাইজও ছোট হচ্ছে।

৩০ বছরের ব্যবসায়ী অভিজ্ঞতা থেকে মধু চাকমা বলেন, আমি ১৯৯৭ সাল থেকে মৌসুমি ফলের ব্যবসা করি। গ্রামের কৃষককে অগ্রিম টাকা দেই চাষ করার সময়। এরপর ফলন আসলে তা সংগ্রহ করে বাজারে এনে পাইকারি বিক্রি করি। আম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, তরমুজ সব ফলই বিক্রি করি এই বাজারে। এ বছর কৃষক থেকে আনারস কেনায় দাম পড়েছে ১২-১৪ টাকা প্রতি পিস। বাজারে এখনো দাম ভালো বলা যায়। তবে বৃষ্টি শুরু হলে দাম অনেক কমে যাবে। কিন্তু সে সময় আনারসের সাইজ আরও অনেক বড় হবে।

জেলার নানিয়ারচর উপজেলার তরুণ কৃষক ডিকু চাকমা পড়ালেখার পাশাপাশি গত দু’বছর যাবৎ আনারস চাষ করছেন। এ বছর করেছেন ৩০ হাজার চারার এক বাগান। ইতোমধ্যে বাগান থেকে ১৬ হাজার পিস আনারস বিক্রি করেছেন। ডিকু বলেন, পরিশ্রম করতে পারলে লাভ হয়। এবার রোজার আগে ৩৫ টাকা পর্যন্ত পিস বিক্রি করেছি। এখন চাহিদা কম এবং জ্বালানি তেলের সংকটের দোহাই দিচ্ছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা। তবে উৎপাদন খরচ হিসাব করলে দাম এখনো ভালো আছে। এটা চৈত্র-বৈশাখ মাস পর্যন্ত ভালো দাম থাকবে।

ডিকু আরও বলেন, আনারস গ্রীষ্মের বা মধু মাসের ফল হলেও কৃষক নানা রকম মেডিসিন (হরমোন) প্রয়োগ করে আগাম ফলন ঘটায়। ফলে সিজনের আগেই বাজারে বিক্রি করতে পারে এবং ভালো দাম পায়।

অন্যদিকে ঢাকা থেকে আসা ব্যবসায়ী আমিরুল হক বলেন, রমজার হলেও ভোক্তা পর্যায়ে আনারসের চাহিদা না থাকায় লোকসান গুনতে হচ্ছে। গত সপ্তাহে প্রায় ৫০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। বর্তমানে রাঙামাটির পাইকারি হাটে আনারসের যে দাম হাঁকা হচ্ছে ঢাকার খুচরা বাজারে সেই দামে আনাসর বিক্রি হচ্ছে। বাজারের যে অবস্থা দেখছি, আগামী হাটেই আনারসের দাম আরও কমে যাবে।

নীলফামারী থেকে আসা ব্যবসায়ী ছাদেকুল ইসলাম বলেন, আনারস কেনা তো বড় কথা নয়, এগুলো নিয়ে যেতে পরিবহন ব্যয়ের কারণে আমাদের কিছুই থাকে না। এক ট্রাক আনারস নীলফামারী নিতে শুধু ট্রাক ভাড়াই গুনতে প্রায় ৪৫ হাজার টাকা। তারপর পরিবহন জনিত ক্ষতি তো আছেই।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, প্রকৃতিতে এখনো শীতের আমেজ থাকায় বাজারে আনারসের চাহিদা কিছুটা কম। অনেক কৃষক রমজানকে লক্ষ্য করে উৎপাদন করায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। বর্তমানে যে দামে বিক্রি হচ্ছে তাতে কৃষকের লোকসান হওয়ার কথা নয়। তবে খুচরা বাজারে সিন্ডিকেট করে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করা কাম্য নয়।

আরমান খান/কেএইচকে/এএসএম