দেশজুড়ে

সার সিন্ডিকেটের কাছে অসহায় কৃষক, বাড়ছে উৎপাদন খরচ

গাইবান্ধায় সার সিন্ডিকেটের ফাঁদে অসহায় হয়ে পড়েন কৃষকরা। বেশি দামে সার কিনে চাষাবাদ করায় কৃষকদের উৎপাদন খরচ বাড়ছে। এ নিয়ে কৃষকদের মাঝে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, নদী ভাঙন ও মঙ্গাপীড়িত জেলা গাইবান্ধা। এখানে উৎপাদিত রবিশস্যর মধ্যে ধান অন্যতম। জেলার সাত উপজেলাজুড়ে এখন চলছে ইরি-বোরো আবাদের মৌসুম। ধান উৎপাদন এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাসায়নিক সার। আর এ ইরি-বোরো কিংবা আমন এ দুই মৌসুম এলে জেলাজুড়ে শুরু হয় ব্যবসায়ীদের সার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কার্যালয় সূত্র জানায়, এ বছর জেলার সাতটি উপজেলায় এক লাখ ২৯ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এ পরিমাণ জমির জন্য ইউরিয়া ৪০ হাজার ১২৯ মেট্রিক টন, টিএসপি ১৬ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন, পটাশ ২১ হাজার ৪৫৯ মেট্রিক টন ও ডিএপি সার ১৬ হাজার ৯১৬ মেট্রিক টন সারের প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত ইউরিয়া প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন, টিএসপি ও পটাশ পুরোটা এবং ডিএপি প্রায় ১৩ হাজার মেট্রিক টন মজুত আছে।

এসব সার বিসিআইসির ১১১ এবং বিএডিসির ১১৮ জন ডিলারের মাধ্যমে সরাসরি জেলার কৃষকদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। বছরের ১ জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের ১০ তারিখ পর্যন্ত বোরো রোপণের উপযুক্ত সময়। কৃষকরা এখন আলু শরিষা তোলার পর বোরো রোপণে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। বর্তমানে ইউরিয়া সারের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিকেজি ইউরিয়া ২৭ টাকা, টিএসপি ২৭ টাকা, পটাশ ২০ টাকা ও ডিএপি ২১ টাকায় বিক্রির জন্য সরকারি মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।

গাইবান্ধার বিভিন্ন হাট-বাজারে খুচরা বিক্রেতারা প্রতিকেজি সার ৩ থেকে ৫ টাকা বেশিতে বিক্রি করছেন।

কৃষকদের অভিযোগ, খুচরা বিক্রেতারা তাদের কাছ থেকে সারের দাম বেশি নিচ্ছেন। কিন্তু তারা কোনো রশিদ দিচ্ছেন না। রশিদ চাইলে তার কাছে সার বিক্রি করছেন না। ডিলার ও খুচরা সার বিক্রেতারা তাদের দোকানে লোক দেখানোর জন্য মূল্য তালিকা টাঙিয়ে রেখেছেন। কিন্তু সেই দামে সার বিক্রি করছেন না। তারা প্রতিকেজি সার ৩ থেকে ৫ টাকা বেশি দামে বিক্রি করছেন। প্রতিবাদ করেও লাভ হচ্ছে না।

গাইবান্ধা সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নের নরৎপুর গ্রামের কৃষক কাজল মিয়া বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর বোরো চাষে খরচ বেড়েছে। বিশেষ করে প্রতিকেজি সার ৩ থেকে ৫ টাকা বেড়েছে। পাশাপাশি এবার কীটনাশকের দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেড়েছে। ফলে বোরো রোপণে উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় বেড়েছে।

সদর উপজেলার মালিবাড়ি ইউনিয়নের কচুয়ার খামার গ্রামের কৃষক মামুন মিয়া বলেন, প্রতি বছরের মতো এ বছরও বাড়তি দামে সার ও কীটনাশক কিনতে হচ্ছে। আমার ৩০ থেকে ৩৫ বস্তা ইউরিয়া সারসহ অন্যান্য সার কিনতে হয়। কিন্তু ডিলারের কাছে থেকে এক বস্তা সারও ক্রয় করতে পারিনি। বাইরের খুচরা দোকান থেকে বস্তা প্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সদর উপজেলার কয়েকজন খুচরা সার বিক্রেতা বলেন, ইচ্ছে করে সারের দাম বেশি নেওয়া হয় না। ডিলাররা আমাদের কাছে বেশি দাম রাখায়, বাধ্য হয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করছি।

মেসার্স লতিফ হক্কানি, নুরুল আমিন হক্কানিসহ কয়েকজন ডিলারের সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, নিয়ম মেনে সার বিক্রি করছেন তারা। প্রতিটি সারের বস্তা বিক্রির ক্রয় রশিদ দেওয়া হয়। কৃত্রিম সার সংকট বা সিন্ডিকেট করে সার বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করেন তারা।

অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কৃষি বিভাগে এক উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা বলেন, সার সিন্ডিকেট মূল সমস্যা কিছু সাংবাদিক। কারণ তারা আমাদের সার আটকিয়ে কৃষি অফিসে খবর দেয়। ঘটনাস্থলে গেলে নিজেরাই ম্যানেজ হয়ে রিকোয়েস্ট করে সার ছাড় দিয়ে নেয়। আমরা যখন না ছাড়তে চাই না, তখন উপরের অফিসারকে তারা বিভিন্ন সংগঠন ও প্রেস ক্লাবের সাংবাদিক নেতার পরিচয় দিয়ে ফোন দেন। তখন স্যার আমাদের বলেন, ঝামেলা করা দরকার নাই। ছেড়ে নেন। এভাবে অনেকটা কালো বাজারে সার সিন্ডিকেট পার পাচ্ছেন বলে দাবি এই কর্মকর্তার।

এ সব বিষয়ে গাইবান্ধা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক আতিকুল ইসলাম বলেন, জেলায় সারের সংকট নেই। এছাড়া বাফার গুদামে সকল প্রকার সার মজুত আছে। অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও ক্রয় রশিদ ছাড়া সার বিক্রির অভিযোগে কয়েকজন ব্যবসায়ীকে নগদ অর্থ জরিমানা ও ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক করা হয়েছে। মৌসুম শেষ হওয়া না পর্যন্ত, নিয়মিত বাজার তদারকি হবে।

আনোয়ার আল শামীম/আরএইচ/এএসএম