যুক্তরাষ্ট্র ও দখলদার ইসরায়েল চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। তেহরানসহ ইরানি বড় শহরগুলো এই যৌথ হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। এই অভিযানের কারণ হিসেবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বৃদ্ধি, মিত্রদেশের ওপর হামলা শঙ্কা ও পারমাণবিক বোমা তৈরির অভিযোগ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
জবাবে ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে ইরানের ইসলামিক গার্ড কোরস (আইআরজিসি)। সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে মুহুর্মুহু হামলা চালায় ইরান। ইরানের হামলায় যৌথ বাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নড়বড়ে হওয়ায় যুদ্ধে পিছু হটতে বাধ্য হয় যৌথ বাহিনী।
তবে এই যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে ইরানের সস্তা ড্রোন। মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন বিমানঘাঁটি এবং ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ঝাকে ঝাকে সুইসাইড ড্রোন পাঠায় ইরান। এই ড্রোন হামলা ঠেকাতে প্যাট্রিয়ট, ডেভিড সেলিং, আয়রন ডোম এবং থাড নামের কোটি কোটি ডলারের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু ইরানের সস্তা ড্রোন নির্মাণের পেছনে রয়েছে আরেক ভিন্ন গল্প।
বলা হচ্ছে, ইরানের এসব ড্রোন প্রযুক্তি মূলত মার্কিন লকহিড মার্টিন আরকিউ-১৭০ ড্রোন থেকে নকল করা। তবে এই প্রযুক্তিকে ভিন্ন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন ইরানের প্রযুক্তিবিদরা।
ঘটনার সূত্রপাত ১৫ বছর আগে
২০১১ সালে মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে আফগানিস্তান-ইরান সীমান্ত ঘেঁষা এলাকা থেকে ‘লকহিড মার্টিন আরকিউ-১৭০’ সেন্টিনেল স্টিলথ ড্রোন জব্দ করতে সক্ষম হয় ইরান। সিআইএ দ্বারা পরিচালিত এ ড্রোনটি মূলত উচ্চ গোয়েন্দা অনুষন্ধান ও নজরদারি কাজে ব্যবহৃত হয়।
ইরানি কর্তৃপক্ষ তখন জানিয়েছিল, তারা লকহিড মার্টিন আরকিউ-১৭০ ড্রোনের নেভিগেশন ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হ্যাক ও জ্যাম করার মাধ্যমে বাধ্যতামূলক কিন্তু নিরাপদ ল্যান্ড করায়। তখন ইরানের রাষ্ট্রীয় মিডিয়ায় অক্ষত অবস্থায় ওই ড্রোনের ছবি প্রকাশ করা হয়েছিল।
মার্কিন কর্মকর্তারা প্রথমে এই ঘটনার সত্যতা অস্বীকার করলেও পরবর্তীতে স্বীকার করে যে আরকিউ-১৭০ ড্রোনটি ইরান সীমান্তে হারিয়েছে। পরে সে ড্রোন ফেরত চাইলে ওবামা প্রশাসনকে হাতে তৈরি একটি খেলনা ড্রোন ফেরত দেওয়া হয়।
শাহেদ (সুইসাইড) ড্রোনের উড্ডয়ন:
লকহিড মার্টিনের আরকিউ-১৭০ ড্রোন জব্দের পর ইরানি সেনাবাহিনীর প্রযুক্তিবিদরা এই ড্রোনের প্রযুক্তি বিশ্লেষণ ও তথ্য আহরণ করছে। পরবর্তীতে এই ড্রোনের প্রযুক্তিবিদ্যা ব্যবহার করে শাহেদ-১৭১, শাহেদ কামিকাজে ড্রোন বানায় ইরান। এর সফল পরীক্ষা চালানো হয় ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাতে। রাশিয়ার ব্যবহৃত ড্রোন মূলত এই মডেলের শাহেদ ড্রোন যা এই জব্দকৃত মার্কিন ড্রোন প্রযুক্তি থেকে অনুপ্রাণিত বলে দাবি করা হয়। ইরান বর্তমানে যে বিভিন্ন ধরনের সুইসাইড ড্রোন ব্যবহার ও তৈরি করছে তা মূলত ‘শাহেদ-১৩৬,১৩১ মডেলের। এগুলো আরও সস্তা এবং লক্ষ্যবস্তুর ওপর আঘাত হানার সময় নিজেই বিস্ফোরিত হয়।
শাহেদ-১৩৬/১৩১ এর বৈশিষ্ট্য:
রেঞ্জ: প্রায় ২,০০০–২,৫০০ কিমি,গতি: প্রায় ১৮০ কিমি/ঘণ্টাডেল্টা উইং ডিজাইনের এই ড্রোন ৫০ কেজি পর্যন্ত গোলা-বারুদ বহনে সক্ষম যার নির্মান ব্যয় ২০ হাজার মার্কিন ডলারের আশেপাশে। শাহেদ-১৩৬ এর ছোট সংস্করণের নাম শাহেদ ১৩১ যা দামে আরও সস্তা। এর রেঞ্জ ৯০০ কিলোমিটার পর্যন্ত।
শাহেদের নকল মার্কিন ‘লুকাস ড্রোন’:
লুকাস এর পূর্ণ নাম-লো কস্ট আনম্যান্ড কমব্যাট এরিয়াল সিস্টেম। এর নির্মাতা মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি কোম্পানি স্পেক্ট্রি ওয়ার্ক্স । এটি একটি মাল্টি-মিশন ড্রোন, যা নজরদারি, আক্রমণ এবং সুইসাইড মিশন—সব ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি নতুন স্বল্পমূল্যের ড্রোন যা মূলত ইরানের শাহেদ-১৩৬ মডেলের ড্রোন মোকাবিলার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এই মডেলটি শাহেদ ড্রোনের মডেল থেকে নকল করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১১ সালের সে ঘটনাই ইরানের ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং ড্রোন প্রযুক্তি আয়ত্তের সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে এবং এটি মার্কিন গোয়েন্দা কার্যক্রমের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান,স্ট্রেট টাইমস, তাসনিম,সিএনএন
কেএম