দীর্ঘ দুই দশক পর পূর্ণমন্ত্রী পেয়েছে রাজশাহীর মানুষ। ভূমিমন্ত্রী হিসেবে প্রবীণ রাজনীতিবিদ মিজানুর রহমান মিনু দায়িত্ব নেওয়ার পর অভিভাবকের আসনে বসেছেন। ভূমি সেবার মানোন্নয়ন, আঞ্চলিক উন্নয়নের পাশাপাশি বিএনপির অভ্যন্তরীণ ঐক্য ফেরানোর বাড়তি চাপ সামলাতে হবে তাকে। ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু প্রায় ১৭ বছর রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন। পাশাপাশি ৫ বছর সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরিবর্তিত সময়ে এই প্রবীণ নেতা পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ায় প্রত্যাশা বেড়েছে সাধারণ মানুষের।
রাজশাহী মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংগ্রাহক ওয়ালিউর রহমান বাবু বলেন, আমরা রাজশাহীর উন্নয়ন চাই। রাষ্ট্রের সবাই যেন ভালো থাকে এবং যেসব উন্নয়নমূলক কাজ এখনো অসম্পূর্ণ রয়েছে সেগুলো দ্রুত শেষ হোক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
রাজশাহী নগরীর বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, রাজশাহীতে দীর্ঘদিন পূর্ণমন্ত্রী ছিল না। এবার একজন পূর্ণমন্ত্রী পাওয়ায় আমরা গর্বিত। তিনি যেহেতু সাবেক মেয়র, তাই রাজশাহীর সমস্যা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে ভালোই জানেন। আশা করি, যেসব উন্নয়ন কাজ স্থগিত ছিল সেগুলো আবার চালু হবে।
আরেক বাসিন্দা সাফিউল ইসলাম বলেন, রাজশাহী স্টেশন, বড় মসজিদসহ অনেক উন্নয়নমূলক কাজ আগে হয়েছে। সামনে আরও ভালো কাজ হবে বলে আমরা আশা করছি। বিশেষ করে নদীভাঙন ও চরাঞ্চলের সমস্যাগুলোর দিকেও তিনি নজর দেবেন।
একজন ব্যবসায়ী বলেন, রাজশাহীতে শিল্পকারখানা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো খুব জরুরি। নতুন মন্ত্রীর কাছে আমাদের প্রত্যাশা, তিনি যেন তরুণদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করতে উদ্যোগ নেন। দখলদারদের বিরুদ্ধে ভূমিমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানের প্রত্যাশা করলেও প্রভাবশালীদের চাপের মুখে পড়ার শঙ্কা করছেন অনেকেই।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), রাজশাহীর সভাপতি সফিউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ও পরিত্যক্ত ভূমি দীর্ঘকাল ধরে একদল প্রভাবশালী ব্যক্তি ও আমলাদের অবৈধ দখলে রয়েছে। এই শক্তিশালী গোষ্ঠী রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সরকারি সম্পদ লুট করে বড় বড় দালান নির্মাণ করছে, যা প্রকৃতপক্ষে জনগণের সম্পদ।
তিনি মনে করেন, সাধারণ মানুষ এসব ভূমি দখল করে না, বরং তারাই এর ফলে উচ্ছেদ ও বঞ্চনার শিকার হয়। তাই এই বেদখলকৃত জমি উদ্ধার করে সেখানে জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। সমাজের এই সুবিধাবাদী চক্রকে প্রতিহত করে জমিগুলো প্রকৃত বঞ্চিত মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ফৌজিয়া এদিব ফ্লোরা বলেন, রাজশাহীতে শিক্ষার মান উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের কার্যক্রম পূর্ণ গতিতে চালু করা জরুরি।
তিনি বলেন, তরুণরা নিজ উদ্যোগে ছোট ব্যবসা শুরু করছে, এবং শিল্প-কারখানা ও বিনিয়োগ বাড়ালে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি সম্ভব। এছাড়া ঢাকামুখী প্রবণতা কমিয়ে বিভাগীয় শহরগুলোর বিকেন্দ্রীকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ফ্লোরা মনে করেন, সব সমস্যা এখনই সমাধান হয়ে যাবে, ব্যাপারটা তেমন নয়। আমরা বিশ্বাস রাখতে চাই, মিজানুর রহমান মিনু একজন দক্ষ এবং অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। সেই সঙ্গে সৎও। তিনি রাজশাহীর সমস্যাগুলো জানেন এবং বোঝেন। তিনি একে একে সব সমস্যার সমাধান করবেন এবং পিছিয়ে থাকা রাজশাহীর উন্নয়নে তিনি সফল হবেন বলেই প্রত্যাশা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মন্ত্রী হওয়ার পর এলাকার রাজনীতির ওপর প্রভাব প্রতিষ্ঠা হবে মিনুর। সেই সূত্রেই বিএনপির ঐক্য প্রতিষ্ঠার চাপও সামলাতে হবে তাকে।
রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, মহানগর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে দিন-রাত পরিশ্রম করে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীকে বিজয়ী করেছেন। এটি ছিল দলের সিদ্ধান্ত, আর সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নেতাকর্মীরা আন্তরিকভাবে কাজ করেছেন। তিনি এখন এমপি ও মন্ত্রী হওয়ায় নেতাকর্মীরা আনন্দিত।
তিনি বলেন, মন্ত্রী হিসেবে মিজানুর রহমান মিনুর এখন বড় দায়িত্ব হলো রাজশাহীর নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং দলের ভেতরের মতভেদ কমিয়ে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করা। রাজশাহী দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, তাই সব ধরনের গ্রুপিং-লবিং বাদ দিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে সেই অবস্থান ধরে রাখতে হবে।
কোনো বিরোধ নয়, সবাইকে সঙ্গে নিয়েই রাজশাহীর উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়ার ঘোষণা ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনুর। তিনি বলেন, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এলাকার উন্নয়ন করতে চাই। বিএনপি রাজশাহীতে আগেও মজবুত অবস্থানে ছিল। এখনো আছে। আগামী দিনেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে। আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ। দলকে সুসংগঠিত রাখতে যা যা করার দরকার আগামী দিনে তার সবই হবে বলে মত দেন মিজানুর রহমান মিনু।
ভূমিমন্ত্রীর কাছে মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি এলাকার উন্নয়নে বাড়তি গুরুত্ব প্রত্যাশা করেন সাধারণ মানুষ। তেমনি স্থানীয় বিএনপির ঐক্য ধরে রাখতেও মিজানুর রহমান মিনুর ভূমিকা জরুরি বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এফএ/জেআইএম