ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় যুদ্ধ শুরুর আগে পাঠানো প্রায় এক হাজারের মতো রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার আটকে আছে ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরগুলোতে। এতে বেশি বিপাকে পড়েছে ছোট উদ্যোক্তারা।
রপ্তানি পণ্য মধ্যপথে আটকে থাকায় বায়ারদের কাছে থেকে কাঙ্ক্ষিত বিল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে ঈদ সামনে রেখে কারখানা ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ছোট রপ্তানিকারকদের।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের হামলার পর ইরানের পাল্টা হামলায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে, ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর কলম্বো ও সিঙ্গাপুর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে কনটেইনার পরিবহনে বিপত্তি তৈরি হয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি হওয়া পণ্যভর্তি প্রায় ৮শ থেকে এক হাজার কনটেইনার দুই ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরে আটকা পড়েছে। কখন এসব কনটেইনার গন্তব্যে যাবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সিঙ্গাপুরে এখন দুই থেকে তিনদিন বার্থিং বিলম্বিত হচ্ছে। কলম্বো বন্দরের ইয়ার্ডগুলো কনটেইনারে পরিপূর্ণ। ধারণক্ষমতার বাইরে কনটেইনার রাখা আছে কলম্বো বন্দরের প্রধান টার্মিনালে। যেখানে মেইন লাইন ভেসেল হ্যান্ডল হয়, তাতে ধারণক্ষমতার ১০৩ শতাংশ পর্যন্ত কনটেইনার জমেছে। সামনের দিনগুলোতে আরও বাড়তে পারে।-বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক আজমীর হোসেন চৌধুরী
এর মধ্যে বেশিরভাগ প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, পেটফ্ল্যাক্স ও তৈরি পোশাক রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে নিয়মিত কনটেইনার আসা-যাওয়া ব্যাহত হওয়ায় কলম্বো এবং সিঙ্গাপুর পোর্টে তৈরি হচ্ছে কনটেইনার ও জাহাজ জট। এসব বন্দর থেকে বাংলাদেশি ফিডার জাহাজগুলো পণ্য আনা-নেওয়া করে।
আরও পড়ুনইউরোপ-আমেরিকা যাত্রায় যুদ্ধের ধাক্কা, ভাড়া বেড়েছে কয়েকগুণ‘ইন্ডাস্ট্রিকে অবশ্যই চাহিদামতো ফুয়েল সাপ্লাই দিতে হবে’আমেরিকান চার্টারে ২ লাখ টন ক্রুড বহন নিয়ে বিপিসির ‘দুশ্চিন্তা’
বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে। কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল এ জলপথকে বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন বলা হয়। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিকল্প রুটে যাতায়াত করছে অনেক জাহাজ। এতে আসা-যাওয়ায় সময় বেশি লাগছে। ফলে ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরগুলোতে জাহাজ জট তৈরি হচ্ছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সিঙ্গাপুরে জাহাজ ভিড়তে দুই-তিন দিন বাড়তি সময় লাগছে। কলম্বো বন্দরে ধারণক্ষমতার বেশি কনটেইনার জমেছে। এসব বন্দরে আটকা পড়েছে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মধ্যপ্রাচ্যগামী রপ্তানিপণ্যবাহী ৮শ থেকে এক হাজার কনটেইনার।
আমাদের রপ্তানির বড় অংশ ইউরোপ-আমেরিকায়। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এসব দেশের রপ্তানিপণ্য পরিবহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। কিন্তু আমাদের কিছু পণ্য সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমানে রপ্তানি হয়। হরমুজ প্রণালি হয়ে এসব দেশগুলোর অনেক বন্দরে কনটেইনার যায়। এখন যুদ্ধের কারণে এসব দেশের জন্য পাঠানো পণ্য আমাদের ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরগুলোতে আটকা আছে।-বাফা পরিচালক (ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স) মো. মাজাহার হোসেন
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক ও মেডিটেরানিয়ান শিপিং কোম্পানির (এমএসসি) হেড অব অপারেশন অ্যান্ড লজিস্টিকস আজমীর হোসেন চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘সিঙ্গাপুরে এখন দুই থেকে তিনদিন বার্থিং বিলম্বিত হচ্ছে। কলম্বো বন্দরের ইয়ার্ডগুলো কনটেইনারে পরিপূর্ণ। ধারণক্ষমতার বাইরে কনটেইনার রাখা আছে কলম্বো বন্দরের প্রধান টার্মিনালে। যেখানে মেইন লাইন ভেসেল হ্যান্ডল হয়, তাতে ধারণক্ষমতার ১০৩ শতাংশ পর্যন্ত কনটেইনার জমেছে। সামনের দিনগুলোতে আরও বাড়তে পারে।’
মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বাংলাদেশের অগ্রসরমান শিল্প হিসেবে পরিচিতি খাদ্য প্রক্রিয়াজাত ও ব্যবহৃত প্লাস্টিক পুনঃপ্রক্রিয়াজাত শিল্প বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ পেট ফ্লেক্স ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএফএমইএ) সভাপতি মজিবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাংলাদেশে অগ্রসরমান একটি খাত পুরোনো ব্যবহৃত প্লাস্টিক রিসাইক্লিং খাত। ইউরোপ, আমেরিকা, চায়নার পর মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে পুনঃ প্রক্রিয়াকরণের পেট ফ্লেক্স রপ্তানি হয়। সব মিলিয়ে মাসে রপ্তানি হয় প্রায় চার হাজার টনের মতো পেট ফ্লেক্স। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে আমরা মধ্যপ্রাচ্যে কিছু কনটেইনার পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ায় পেট ফ্লেক্সের প্রায় অর্ধশত কনটেইনার কলম্বোতে আটকা পড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘রোজার শুরুতে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছে। সব সময় আমাদের একটি টার্গেট থাকে মাসে কী পরিমাণ প্রোডাক্ট আমরা পাঠাবো (রপ্তানি)। এরপর পেমেন্ট পেলে ব্যবসায়িক খরচ মেটাবো। এখন আমাদের পণ্যগুলো বায়ারের কাছে পৌঁছেনি। এতে পেমেন্ট তো এলোই না, এখন আমাদের পণ্যগুলোর কী হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আমাদের মতো অন্য উদ্যোক্তাদের ঈদে প্রতিষ্ঠানের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’
আটকে থাকা কনটেইনারের মধ্যে রয়েছে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যও। প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানি করে চট্টগ্রামের হিফস অ্যাগ্রো ফুডস ইন্ডাস্ট্রিজ। কথা হলে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার সৈয়দ মো. শোয়াইব হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘সৌদি আরব, দুবাই, ওমান ও ইউরোপে আমার ১০ কনটেইনার পণ্য গেছে। এর মধ্যে দুবাইয়ে পাঠানো কনটেইনার দুটি কলম্বো পোর্টে আটকা পড়েছে। সৌদি আরব পাঠানো কনটেইনারটি কোথায় আছে তা ট্রেস করার চেষ্টা করছি। আমার মতো অনেক রপ্তানিকারক, মধ্যপ্রাচ্যে যারা রপ্তানি করেন, তাদের পণ্য কলম্বো পোর্টে আটকে আছে। কখন এসব পণ্য বায়ারের কাছে পৌঁছবে তা নিয়ে চিন্তিত।’
তিনি বলেন, ‘ঠিকমতো রপ্তানিপণ্য বায়ারের কাছে পৌঁছালে স্বাভাবিক কাঙ্ক্ষিত সময়ে বিল পাওয়া যেত। এখন প্রোডাক্ট না পৌঁছানোয় বিল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে অনেক প্রতিষ্ঠান ঈদের আগে তাদের কর্মচারীদের বেতন দিতেও বেকায়দায় পড়েছে।’
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাফা) পরিচালক (ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স) মো. মাজাহার হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের রপ্তানির বড় অংশ ইউরোপ-আমেরিকায়। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এসব দেশের রপ্তানিপণ্য পরিবহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। কিন্তু আমাদের কিছু পণ্য সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমানে রপ্তানি হয়। হরমুজ প্রণালি হয়ে এসব দেশগুলোর অনেক বন্দরে কনটেইনার যায়। এখন যুদ্ধের কারণে এসব দেশের জন্য পাঠানো পণ্য আমাদের ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরগুলোতে আটকা আছে।’
এমডিআইএইচ/এএসএ