যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের একের পর এক পতনে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। সম্প্রতি ইরানের ‘ডি ফ্যাক্টো’ নেতা আলী লারিজানি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডারদের হত্যার ঘটনাকে ইসরায়েল তাদের গোয়েন্দা ও সামরিক সক্ষমতার এক বিশাল বিজয় হিসেবে উদযাপন করছে। তবে এই ‘নিধন’ কৌশল দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে খোদ ইসরায়েলি বিশ্লেষকদের মধ্যেই গভীর সংশয় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে ইরান সরকারকে দুর্বল করতে চায়। তাদের ধারণা, এতে দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী দুর্বল হবে এবং জনগণের মধ্যে বিদ্রোহের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এক ভিডিও বার্তায় দাবি করেছেন, এ ধরনের ধারাবাহিক আঘাত ইরানি জনগণকে তাদের ভাগ্য নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ করে দেবে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ আরও আক্রমণাত্মক সুরে জানিয়েছেন, তিনি সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন ইরানের নেতাদের খুঁজে বের করে ‘অক্টোপাসের মাথা বারবার কেটে ফেলা হয়’, যাতে তা আর বাড়তে না পারে।
আরও পড়ুন>>কে এই আলী লারিজানি?গোটা পরিবার হারালেও যেভাবে প্রাণে বেঁচে যান মোজতবা খামেনিইরানের পাল্টা আঘাত যেভাবে চমকে দিলো যুক্তরাষ্ট্রকে
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার প্রথম দিনের আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ তার শীর্ষ সামরিক কমান্ডাররা নিহত হন।
টার্গেটেড হত্যার দীর্ঘ ইতিহাসতবে লারিজানির হত্যাকাণ্ড নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—ইসরায়েল কি কৌশলগতভাবে এই হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে, নাকি সুযোগ পেলেই তা করছে? অনেক বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে বলেছেন, এই কৌশল উল্টো ফলও বয়ে আনতে পারে।
ইসরায়েলের এমন টার্গেটেড হত্যার ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিক হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিশোধমূলক অভিযান, দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময় ফিলিস্তিনি নেতাদের হত্যা, এমনকি ২০২৪ সালে হিজবুল্লাহ নেতা হাসান হাসান নাসরুল্লাহ হত্যা—সবই এই কৌশলের অংশ।
কিছু বিশ্লেষকের মতে, এই কৌশল ইরানকে এতটাই দুর্বল করতে পারে যে তারা পরমাণু কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে সমঝোতায় আসতে বাধ্য হতে পারে।
ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা সিমা শাইন মনে করেন, এই কৌশল কাজ করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান হাসান নাসরুল্লাহর হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ করেন। ওই ঘটনা সংগঠনটিকে এতটাই দুর্বল করেছিল যে তারা যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে বাধ্য হয়েছিল।
তার মতে, ইরানও এক পর্যায়ে এমন চাপ সহ্য করতে না পেরে সমঝোতায় যেতে পারে।
উল্টো ফল হওয়ার আশঙ্কাতবে অন্য বিশ্লেষকরা বলছেন, শীর্ষ নেতাদের হত্যা উল্টো কট্টরপন্থিদের শক্তিশালী করতে পারে। লারিজানিকে তুলনামূলক বাস্তববাদী নেতা হিসেবে দেখা হতো। তার জায়গায় আরও কট্টর নেতারা ক্ষমতায় এলে সংঘাত আরও বাড়তে পারে।
ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক প্রধান ড্যানি সিট্রিনোভিচ সতর্ক করে বলেন, ইরানের নেতৃত্বের ‘বেঞ্চ’ অনেক দীর্ঘ। খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে মোজতবা খামেনি স্থলাভিষিক্ত হওয়া প্রমাণ করে যে, কেবল মাথা কেটে একটি আদর্শিক সরকারকে উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়। হামাস ও হিজবুল্লাহর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, শীর্ষ নেতারা মারা গেলেও সংগঠনগুলো এখনো টিকে আছে।
দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থার সাবেক প্রধান আমি আয়ালোনের মতে, এ ধরনের হত্যাকাণ্ড মধ্যপ্রাচ্যে চরম অরাজকতা সৃষ্টি করতে পারে। তিনি সাদ্দাম হোসেনের পতনের পরবর্তী ইরাকের বিশৃঙ্খলার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘দাবার বোর্ডে বোকা খেলোয়াড়রা মনে করে শুধু রাজাকে মারলেই জয় নিশ্চিত। কিন্তু আদর্শিক লড়াইয়ে প্রতিটি খেলোয়াড়ই গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি আরও যোগ করেন, নেতানিয়াহুর ‘গণঅভ্যুত্থানের’ স্বপ্ন বিভ্রান্তিকর হতে পারে। কারণ, ইরানের বর্তমান শাসনের ওপর লাখ লাখ মানুষ নির্ভরশীল যারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় শেষ পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী লড়াই চালিয়ে যাবে।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকেএএ/