অর্থনীতি

রাজধানী সুপার মার্কেট: ‘এক জায়গায় পাওয়া যায় সবকিছু’

নতুন পোশাকের ঘ্রাণ ছুঁয়ে প্রাণে প্রাণে জেগে ওঠে ঈদের আনন্দ। আর নতুন পোশাকের খোঁজে রাজধানীর মার্কেটগুলো এখন ক্রেতামুখর। অন্যান্য মার্কেটের মতো শেষ সময়ে ঈদের পোশাকের কেনাকাটায় সরগরম ঢাকার দক্ষিণ প্রান্তের টিকাটুলির অন্যতম বহুল পরিচিত বিপণিবিতান ‘রাজধানী সুপার মার্কেট’। নারী-পুরুষ, শিশুদের ভিড়ে জমে উঠেছে ব্যস্ত এই বিপণিবিতান।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, শ্যামপুরসহ আশপাশের এলাকার ক্রেতারা পোশাক কিনতে ভিড় করেন যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভারের কোল ঘেঁষে এ মার্কেটে।

বুধবার (১৮ মার্চ) রাজধানী সুপার মার্কেটের দোকান মালিক, বিক্রয়কর্মী ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ মার্কেটে পুরুষের শার্ট, প্যান্ট, পাঞ্জাবি, লুঙ্গি, জুতা; নারীদের শাড়ি, থ্রি-পিস, বোরকা, গয়না, কসমেটিক্স, জুতা এবং শিশুদের পোশাক- সবই পাওয়া যায়। তবে এখান থেকে সবকিছু কিনতে হবে দামাদামি করে। 

রাজধানীর অন্যান্য নামিদামি শপিংমল কিংবা ব্র্যান্ডের পোশাকের দোকানের সঙ্গে তুলনা করলে রাজধানী সুপার মার্কেট থেকে কেনাকাটা করা অনেকটাই সাশ্রয়ী বলে জানিয়েছেন ক্রেতা ও বিক্রেতারা।

রাজধানী সুপার মার্কেট বেশ কয়েকটি ব্লকে বিভক্ত। এ, বি, সি ও ডি- এ চারটি ব্লক রয়েছে মার্কেটে।

মার্কেটের নারী ও শিশুদের পোশাকের দোকান এবং পাঞ্জাবির দোকানগুলোতে ভিড় ছিল সবচেয়ে বেশি। ভিড় দেখা গেছে চুড়ি, কানের দুলসহ বিভিন্ন মেটালের গয়নার দোকানগুলোতেও।

থ্রি-পিস বিক্রির দোকান ‘টপ টেন’র বিক্রেতা মো. শান্ত জাগো নিউজকে বলেন, প্রিন্টেড দেশি থ্রি-পিসের দাম ৫০০ টাকা থেকে শুরু, সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা পর্যন্ত দামের আছে। বিদেশি থ্রি-পিস ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া গজ কাপড় বিক্রি হয় ১৮০ টাকা (প্রতি গজ)। 

শার্ট ও প্যান্ট বিক্রেতারা জানিয়েছেন, এখানে ৪০০ থেকে এক হাজার টাকা দামের শার্ট পাওয়া যায়। প্যান্টের দাম ৫০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা। জিন্স ও গ্যাবাডিন প্যান্ট বেশি বিক্রি হয়।

সোনারগাঁ জামদানি হাউজে শুধু শাড়ি বিক্রি হয়। এ দোকানের বিক্রেতা মো. আক্তার হোসেন বলেন, দেশি সুতি প্রিন্টের শাড়ির সর্বনিম্ন দাম ৪৫০ টাকা, সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা। আর টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির দাম ৫০০ থেকে এক হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া পার্টি শাড়ি (জর্জেটের ওপর কাজ করা) দাম এক হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত। জামদানি শাড়ির দাম এক হাজার ২০০ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়। লেহেঙ্গার দাম ২ হাজার ৫০০ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। 

তিনি বলেন, রমজান মাসে আমাদের তাঁতের শাড়িই বেশি চলে, এটা মুরব্বিদের সবাই গিফট করে। দামটা একটু কম।

আক্তার হোসেন আরও বলেন, ‘আমি ২৭ বছর ধরে এই মার্কেটে ব্যবসা করছি, প্রতি বছরই এর আগের বছরের থেকে ব্যবসা খারাপ হয়। এভাবেই আল্লাহ পাক চালাচ্ছেন।’ 

যাত্রাবাড়ীর দনিয়া এলাকা থেকে ঈদের কেনাকাটা করতে এসেছেন আয়েশা আক্তার। দুপুরের দিকে এই মার্কেটে তার সঙ্গে কথা হয়। আয়েশা আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, এখানে এক জায়গায় সবকিছু পাওয়া যায়। মান বিবেচনায় নিলে দামটাও মোটামুটি হাতের নাগালে। দরদাম করে নিতে পারলে মার্কেটটা ভালো। খুব যে উল্টাপাল্টা দাম চায় এমন নয়।

১১ বছরের মেয়ে, সাত বছরের ছেলের জন্য নতুন পোশাক, স্বামীর জন্য পাঞ্জাবি এবং নিজের জন্য থ্রি-পিস কিনবেন বলেও জানান আয়েশা আক্তার।

‘পোশাক মেলা’য় শিশুদের পোশাক বিক্রি হয়। এ দোকানের বিক্রেতা আলী হোসেন বলেন, আমাদের দোকানে ৩৯০ থেকে এক হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত শিশুদের পোশাক পাওয়া যায়। বিক্রিও মোটামুটি ভালো।

বিক্রেতারা জানিয়েছেন, মেয়েদের পার্টি ফ্রক বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা। শিশুদের অন্য ফ্রক ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। ছেলে শিশুদের জন্য ৫০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকায় গেঞ্জি সেট, শার্ট সেট বিক্রি হচ্ছে। 

‘প্রিয়া পাঞ্জাবি’র বিক্রেতা আরিফ হোসেন বলেন, আমাদের দোকানে বড় এবং শিশুদের পাঞ্জাবি বিক্রি করা হয়। পাঞ্জাবির সর্বনিম্ন দাম ৮০০ টাকা, মোটামুটি এক হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দামের পাঞ্জাবি আমাদের কাছে পাবেন।

বম্বে ফ্যাশন চুড়ি হাউস, নির্ণয় চুড়ি হাউস, জননী ফ্যাশন চুড়ি হাউসে নারীদের ব্যাপক ভিড় দেখা গেছে।

চুড়ি বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গোল্ড প্লেট আর সিটি গোল্ডের চুড়ি বেশি চলে। সিটি গোল্ডের নরমাল চুড়ি ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। গোল্ড প্লেটেড চুড়ি বিক্রি হয় ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। সেট চুড়ির দাম ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা। পাথরের চুড়ি চারটি ৩৫০ টাকায় বিক্রি করা হয়।

আফরোজা আক্তার ৬ বছরের মেয়ের জন্য ফ্রক কিনেছেন ৭০০ টাকা দিয়ে, আর নিজের জন্য এক হাজার টাকা দিয়ে একটি থ্রি-পিস। তিনি এসেছেন মীরহাজিরবাগ থেকে। আফরোজা জানান, যে টাকা দিয়ে তিনি পোশাক কিনেছেন তাতে তিনি সন্তুষ্ট।

তিনি শাশুড়ির জন্য একটি শাড়ি এবং শ্বশুরের জন্য লুঙ্গি কিনবেন বলেও জানান।

মানিকনগর থেকে এসেছেন শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমি একটি প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিংয়ের চাকরি করি। আমার আর্থিক সংগতি খুব ভালো না। কিন্তু, ঈদ উপলক্ষে নিজের পরিবারের সদস্য ছাড়াও অন্যান্য আত্মীয়স্বজন অনেককে দিতে হয়। একেবারে খারাপটা দিলেও চলে না। তাই আমার আর্থিক সংগতি ও পোশাকের মানের বিষয়টি মাথায় রেখে এ মার্কেটে আসা। এর আগেও আমি এখান থেকে কেনাকাটা করেছি। দেখি এবার কতদূর কী কিনতে পারি।

ভিড় রয়েছে বোরকা বিক্রির দোকানগুলোতেও। ভাই ভাই বোরকা হাউজের বিক্রেতা মাহাদি হাসান বলেন, সর্বনিম্ন ৫০০ টাকায় বোরকা পাওয়া যায়। অন্যদিকে সর্বোচ্চ চার হাজার টাকা পর্যন্ত দামের বোরকা আমাদের কাছে আছে। বিক্রি গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম বলেও জানান এ বিক্রেতা।

বিক্রেতারা জানিয়েছেন রাজধানী সুপার মার্কেটে ২৫০ টাকা থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত দামের লুঙ্গি পাওয়া যায়।

জুতার দোকানগুলোতে রয়েছে ক্রেতাদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। রাজধানী সুপার মার্কেটে ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ২ হাজার টাকায় ছেলেদের জুতা পাওয়া যাচ্ছে। মেয়েদের জুতা বিভিন্ন ডিজাইনের ৩০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা। 

একজন ক্রেতা কেন রাজধানী মার্কেটে আসবে জানতে চাইলে রাজধানী মার্কেটের থ্রি-পিস বিক্রেতা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, রাজধানী মার্কেট ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের জন্যই কেনাকাটার উৎকৃষ্ট জায়গা। কারণ এখানে ক্রেতা দামাদামি করার সুযোগ পান। কারণ ক্রেতা সাধারণত চান দামাদামি করবেন এবং জিতবেন। কিন্তু অন্য মার্কেটে তো ফিক্সড প্রাইস সেখানে তো কোন কিছু বলার সুযোগ নেই।

আরএমএম/ইএ