শিগগিরই বিএনপির কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, ‘বিএনপির কাউন্সিল এই বছরের মধ্যেই। তবে এখনো আমরা সময় নির্ধারণ করিনি। কিন্তু আমার মনে হয় শিগগিরই হবে কাউন্সিল।’
বুধবার (১৮ মার্চ) রাতে গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ কথা জানান। বিএনপির সর্বশেষ কাউন্সিল হয়েছিল ২০১৬ সালে।
বিএনপি মহাসচিবের কাছে সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল—সরকার গঠনের পর সরকার ও দল এক হয়ে গেছে কিনা। দলের কার্যক্রম কবে নাগাদ শুরু হবে।
জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘দলের (বিএনপির) কার্যক্রম তো চলছে, ছোটখাটোভাবে তো চলেছে। একমাস সরকার গঠন করতে তো সময় লেগেছে। দলের লোক বেশিরভাগই সরকারে চলে গেছেন। সেই জায়গাগুলোতে সময় লাগবে। এটা বিচ্ছিন্ন ব্যাপার না। এটা আলাদা করে দেখা যাবে না। সরকার তার কাজ করবে, দল তার কাজ করবে।’
গুলশানে দলের চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে এই মতবিনিময় অনুষ্ঠানে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা, জাতীয় সংসদের কার্যক্রম, স্থানীয় সরকার নির্বাচন, সরকারের সফলতা, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ, অর্থনৈতিক অবস্থাসহ বিভিন্ন প্রশ্নের খোলামেলা জবাব দেন বিএনপি মহাসচিব।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত সরকারে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর গুলশানের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে এই অনানুষ্ঠানিক মতবিনিময় করলেন মির্জা ফখরুল।
এক মাসে সরকারে বিগ সাকসেস
তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারের এ পর্যন্ত সাফল্যের বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের এই এক মাসের মধ্যে সবচেয়ে বড় সাকসেস (সাফল্য) হচ্ছে, যে কমিটমেন্টগুলো আমরা করেছিলাম তার বাস্তবায়ন শুরু করতে পেরেছি। তার মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড পাইলট প্রজেক্ট আমরা শুরু করে দিয়েছি। এরপর কৃষকদের ১০ হাজার টাকার কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ, সারাদেশে খাল খনন কর্মসূচি, ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমসহ অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ধর্মগুরুদের মাসিক ভাতা প্রদান শুরু করতে পেরেছি। আগামী পয়লা বৈশাখ থেকে কৃষক কার্ড দেওয়া হবে…সব মিলিয়ে দিস ইজ ভেরি বিগ এচিভমেন্টস।”
তিনি বলেন, এটি ছোটখাটো কোনো ব্যাপার না। নতুন একটা সরকারের ৩০ দিনের মধ্যে এই কাজগুলোকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া বড় সাফল্য।
মির্জা ফখরুল বলেন, তবে এটাও ঠিক, বড় রকমের একটা ঝামেলাও এসেছে। বিএনপির গভর্নমেন্ট যখনই আসে তখনই একটা করে ঝামেলা আসে, এর আগেও দেখা গেছে। এবার এসেছে ইরান যুদ্ধ। এই যুদ্ধের ফলে তেলের দাম বেড়ে গিয়ে বড় রকমের সমস্যা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, তবে এখন পর্যন্ত এই জিনিসগুলোকে মোকাবিলা করা গেছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় হচ্ছে যে তেলের দাম এখনো বাড়েনি। তেল নিয়ে বড় রকমের কোনো স্ক্যান্ডেল তৈরি হয়নি। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলোতে বেতন না দেওয়ার ঝামেলা কিন্তু এবার হয়নি। কারণ আগাম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল সবগুলোতে।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, সংসদ শুরু হয়ে গেছে। সংসদে ১৩৩টি অধ্যাদেশ উপস্থাপন করা হয়েছে, বিভিন্ন কমিটি গঠন হয়েছে। আমি মনে করি, দিজ আর গুড এচিভমেন্টস। ওভারঅল এক মাসে বিগ সাকসেস সরকারের।
অর্থনীতি সুস্থ করা বিএনপির বড় চ্যালেঞ্জ
মির্জা ফখরুল বলেন, আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতিকে একেবারে সুস্থ করে ফেলা এবং অর্থনীতিকে সঠিক রাস্তায় নিয়ে আসা। এটা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। আপনারা জানেন যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর চেঞ্জ হয়েছে। যার ফলে যে নীতি ফলো করা হচ্ছিল সেটি কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা ঋণ পেতে শুরু করেছেন, ইকোনমিক অ্যাক্টিভিটিজগুলো বাড়তে শুরু করেছে…এটা একটা বড় পরিবর্তন বলে আমি মনে করি। যখনই আপনার ছোট ব্যবসায়ীরা কাজ করতে পারবে এবং তারা ব্যবসা বাণিজ্য করতে পারবে এবং সাধারণ মানুষ যখন কিনতে পারবে, তাদের ক্রয় ক্ষমতা বাড়বে তখন ইকোনমিক অ্যাক্টিভিটি বাড়বে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে জনসংখ্যা, এই জনসংখ্যা ইকোনমিকে বাড়িয়ে দেয়। সুশাসন ঠিক থাকলে অবশ্যই অর্থনীতি গতি পাবে।
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ প্রসঙ্গ
দলীয় লোকজনকে ভিসি নিয়োগে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে—এমন প্রশ্নে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘দেখেন সমালোচনা তো থাকবেই। এখন পলিটিক্যাল গভর্মেন্ট তার নিজস্ব পলিটিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গিতে নিয়োগগুলো হবে। দ্যা বেস্ট পসিবল যাদের মনে হয়েছে তাদেরই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, যেহেতু দলীয় সরকার, কিছুটা দলীয় লোক তো থাকবেই…. এটাতে সমালোচনা হতে পারে…সমালোচনা হবে না তা আমরা বলছি না, কিন্তু এটা নিয়ে আমরা খুব একটা উদ্বিগ্ন নই।
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে যা বললেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘পতিত ফ্যাসিস্ট যারা তারা কিন্তু চুপ করে বসে নেই । বাইরে থেকে তারা বিভিন্ন রকম কথা বলছে এবং অর্গানাইজ করার চেষ্টা করছে… এটা গেল একটা সাইট। কিন্তু এটাকে মোকাবিলা করা সম্ভব হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, দ্বিতীয়ত, আমাদের পার্লামেন্টে যারা এখন আমাদের বিরোধী দল আছেন তারাও তাদের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে কথা বলছেন… তো তারা কথা বলবেন। এগুলোকে সহনশীলতার মধ্যে আনতে হবে। আমি যেটা বিশ্বাস করি যে, ডেমোক্রেসি যখনই প্রপারলি ফাংশন করবে যখন আপনি সেটাকে টলারেন্সের মধ্যে আনবেন, সহনশীলতার মধ্যে আনবেন। বিরোধীদল তো কথা বলবেই।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রসঙ্গে যা বললেন
মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা কিন্তু জুলাই সনদের ব্যাপারে শতভাগ কমিটেড। বাট কোনগুলো? যেগুলো আমরা সই করেছি এই কথাটা খুব পরিষ্কার করে বলতে চাই। আমরা যেগুলোতে একমত হয়েছি সেই বিষয়গুলোতে আমরা কমিটেড। সেই কমিটমেন্ট থেকে আমরা এতটুকুও নড়বো না।
তিনি বলেন, আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া আপনার কোনো শর্ত… এটা তো মেনে নেওয়াটা আমাদের জন্য নিশ্চয়ই সবসময় সম্ভব না হতে পারে। তবে সেটা আমরা আলোচনা করেছি।
তিনি বলেন, ‘আপনি দেখবেন যে পার্লামেন্টে আমরা কি বলেছি? পার্লামেন্টে খুব পরিষ্কার করে বলেছি যে, আপনারা বিষয়টিকে পার্লামেন্টে আনুন, পার্লামেন্টে আমরা আলোচনা করি। সেই আলোচনার ভিত্তিতে দরকার হলে আমরা বিষয়গুলো নিয়ে একটা জায়গায় পৌঁছে দিতে পারব।
মির্জা ফখরুল বলেন, কিন্তু পার্লামেন্ট আলোচনার আগে থেকে রাস্তায় নামার হুমকি দেওয়াকে অতটা সঠিক বলে আমি মনে করি না। স্টিল টাইম। অনেক সময় আছে, এটা নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। পার্লামেন্ট সবে শুরু হলো। এখন বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে কথা হবে, ডিবেট হবে, ওয়াকআউট হবে—এটাই তো পার্লামেন্টের বিউটি।
মব কালচার নেই
আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি দমনে সরকার তার অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করবে জানিয়ে তিনি বলেন, ইতিমধ্যে দেখেন মব কালচারের ব্যাপারটা একেবারে নেই বললেই চলে। এই এক মাসে বড় কোনো ঘটনাই ঘটেনি।
মির্জা ফখরুল বলেন, অলরেডি দুর্নীতি দমন কমিশন রিজাইন করেছে। নতুন দুর্নীতি দমন কমিশন আসবে। বিভিন্ন জায়গায় যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত তাদের থ্রেড করা হয়েছে, বলা হয়েছে যে জিরো টলারেন্স। এই ব্যাপারে কোনো রকম আপোষ আমরা করবো না।
অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিএনপি আগে থেকেই হোমওয়ার্ক করেছে উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এগুলোর হোমওয়ার্ক আগেই করেছি…নট দ্যাট যে আমরা এটাকে একটা পপুলিস্ট একটা স্লোগান দিয়ে নেমে গেছি। কোথা থেকে টাকা আসবে, কিভাবে আসবে, তার ফান্ড কিভাবে, আপনার সঞ্চয় কিভাবে করা হবে, আপনার রেভিনিউ কিভাবে আসবে…এ সমস্ত হোমওয়ার্ক করা হয়েছে।
তিনি বলেন, হোমওয়ার্ক করেই আমরা নেমেছি। আমরা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী যে, প্রজেক্টগুলো করতে কোনো রকমের আর্থিক সমস্যার মুখে পড়বো না।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন চলতি বছরেই
মির্জা ফখরুল বলেন, আমাদের মন্ত্রণালয়ের কাজ হচ্ছে সিদ্ধান্ত নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে জানিয়ে দেওয়া। আমরা সেই আলোচনা করছি, আমাদের সিদ্ধান্ত হলেই আমরা জানিয়ে দিবো।
তিনি বলেন, এ বছর তো বটেই, নিঃসন্দেহে এই বছরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। তবে এই মুহূর্তে আপনাকে সময় নির্দিষ্ট করে বলতে পারবো না। কিন্তু এই বছরেই হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব হবে।
মির্জা ফখরুলের চোখে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান কেমন
মির্জা ফখরুল বলেন, আমি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে প্রেসিডেন্ট দেখেছি নট এজ এ মিনিস্টার, বাট এজ প্রাইভেট সেক্রেটারি টু ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার। এরপর আমি দেখেছি, আপনার বেগম খালেদা জিয়াকে তার মন্ত্রী হয়ে। আর এখন দেখছি আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে তার ক্যাবিনেটের মন্ত্রী হিসেবে।
এই তিনজনের ভেতরে কাকে ডাইনামিক মনে হয় আপনার? জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, প্রত্যেকটা মানুষ প্রত্যেকটা নেতা তার নিজের স্বকীয়তায় উজ্জ্বল। আপনার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য প্রত্যেকের আছে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সাহেব ছিলেন একজন, তার একটা ভিন্ন এপিল (গ্রহণযোগ্যতা) ছিল জনগণের কাছে, মানুষের কাছে, বেগম খালেদা জিয়ার ছিল আরেক রকম।
মির্জা ফখরুল বলেন, আর আমাদের বর্তমান যিনি প্রধানমন্ত্রী একেবারে নতুন। কিন্তু তার যে গতি দেখছি আমি… সেই গতিতে আমি অত্যন্ত আশাবাদী। আমি দেখছি যে তিনি ছুটছেন। তার ভেতরে একটা কাজ করার একটা স্পৃহা কাজ করছে। সুতরাং কারও সঙ্গে কারও তুলনা করা যাবেই না।
আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে যা বললেন
মির্জা ফখরুল বলেন, এরা হঠাৎ হঠাৎ করে বেরিয়ে আসে…এগুলোকে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কিছু আছে বলে আমি মনে করি না। তারপরেও আপনি পলিটিক্সটাকে চলতে দেন। আমি যেটা মনে করি, লেট পলিটিক্স মুভ ইজ ওনওয়ে, লেট ডেমোক্রেসি মুভ ইন ওনওয়ে...।
বিএনপি সরকারের নীতি সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব
মির্জা ফখরুল বলেন, সবাই আমাদের বন্ধু। আমরা কোনো পক্ষে-বিপক্ষে নই। আমরা ছোট দেশ। আমরা আমাদের মতো করে আমাদের স্বার্থকে রক্ষা করে সেইভাবে আমরা এগোতে চাই। যেকোনো দেশই আমাদের বন্ধু।
কেএইচ/এমএমকে