জাতীয়

‘সরকার বলছে তেল মজুত আছে, কিন্তু আমরা তো পাচ্ছি না’

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে টানা প্রায় দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তেল সংকটের মধ্যে দেশ। দীর্ঘ সময় ধরে দেশের পাম্পগুলোতে তেল সংকটে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। ফলে পাম্পে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত তেল না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভোক্তারা। তাদের ভাষ্য, সরকারের পক্ষ থেকে তেলের মজুতের কথা জানানো হলেও পাম্পগুলোতে তেল দেওয়া হচ্ছে না কেন? কেন সব পাম্প স্বাভাবিক হচ্ছে না—সেই প্রশ্ন তাদের মনে।

সোমবার (২১ মার্চ) বিকেল ৩টার দিকে রাজধানীর আসাদগেট তালুকদার পাম্প এবং এর আগে দুপুর ১টার দিকে বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফুয়েল স্টেশন, উত্তর বাড্ডার মক্কা পাম্প ও মহাখালী ইউরেকা এন্টারপ্রাইজ তেল পাম্প ঘুরে অপেক্ষারতদের সঙ্গে কথা বললে তারা এসব কথা বলেন।

খিলগাঁও এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ সাব্বির খিলগাঁও-বনশ্রী এলাকায় পাম্পে তেল না পেয়ে আসাদগেট পাম্পে এসেছেন। সাব্বির বলেন, তেল নিতে আসছি দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে। এসে এই পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম এক ঘণ্টা, কিন্তু লাইন এগোয় না। পরে আমার আরেক বন্ধু ওই পাশের পাম্পে গিয়েছিল। সেখানে সিরিয়াল কম ছিল। এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও যখন লাইন এগোয় না, তখন ওই পাশের পাম্প থেকে আমার বন্ধু আমাকে ডাকে। আমিও সেখানে গিয়ে দুই ঘণ্টা লাইনে থেকে তেল পেয়েছি।

তেলের দাম বাড়তি নেওয়া হচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তেলের দাম ১২০ টাকাই আছে। তবে আমাদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে, সিরিয়াল অনেক বেশি। তিনি বলেন, খিলগাঁও-বনশ্রী থেকে তেল নিতে এসেছি। ওইদিকে কোনো পাম্পেই তেল নেই। তেল নিতে আসা-যাওয়া করতে গিয়েই আমার এক লিটার তেল শেষ।

ধানমন্ডি থেকে তেল নিতে আসাদগেট তালুকদার ফিলিং স্টেশনে এসেছেন বাইক রাইডার মো. হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা হবে তেল নিতে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি। এখনো তেল নিতে পারিনি। পরিস্থিতি খুবই খারাপ। আমি রাইডার। যদি তেলের লাইনে বসে থাকতে না হতো, হয়তো এতক্ষণে ৫০০–৬০০ টাকা আয় করতে পারতাম। কিন্তু গাড়িতে তো তেল নেই। এখনও কমপক্ষে আধা ঘণ্টা লাগবে। তাও নাকি মাত্র ৩০০ টাকার তেল দিচ্ছে। ৩০০ টাকার তেল দিয়ে তেমন আয় করা যাবে না। তেল সংকটে আমাদের ওপর বড় প্রভাব পড়ছে। সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলে আয় করব কীভাবে? সংসার চলবে কীভাবে?

মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী বাইকচালক সামির দুপুর ১২টার সময় এসে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। বিকেল ৩টা বাজলেও তিনি তখনও লাইনে। তিনি বলেন, ভাবছিলাম ঈদের ছুটি চলছে, তেলের সংকট থাকলেও পাম্পে গেলে তেল পাব। কিন্তু দুদিন ধরে ঘুরছি—সিরিয়াল দেখে ফিরে যাচ্ছি। আজ এমন হয়েছে, কাল থেকে অফিস, তাই তেল লাগবেই। আমাদের অফিস বাড্ডায়। মোহাম্মদপুর থেকে বাসে যাতায়াত কষ্টকর। মোটরসাইকেল ছাড়া এত দূরে যাতায়াত সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, শুনছি তেল মজুত আছে, অভাব নেই। কিন্তু তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও শুনছি ৩০০ টাকার তেল দেবে। এই ভোগান্তি কেন? আমরা তো সাধারণ ভোক্তা—তেল পাচ্ছি না। আমরা সরকারের কাছে চাই তেল সরবরাহ নিয়মিত হোক, ভোগান্তি না থাকুক। দামও যেন না বাড়ে। আমরা খেটে খাওয়া মানুষ, সীমিত আয়ের। তেলের দাম বাড়লে চলাচল কঠিন হবে। পরিবারের খরচ চালানো কঠিন হবে।

মক্কা পেট্রোল পাম্পের লাইনে অপেক্ষারত মুস্তাফিজ বলেন, দেড় ঘণ্টা আগে লাইনে দাঁড়িয়েছি। সামনে কতগুলো গাড়ি আছে গুনে দেখি এখনও ১২৬ নম্বর সিরিয়ালে আছি। কখন তেল পাব, পাব কি না—তাও বলা যাচ্ছে না।

ট্রাস্ট তেল পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মোটরসাইকেলচালক মিরাজ হোসেন বলেন, সকাল ১০টার আগে থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। অবশেষে পাম্প পর্যন্ত আসতে পেরেছি।

সিরাজ নামের আরেক চালক বলেন, আগামীকাল থেকে অফিস শুরু হবে। মানুষ ঢাকায় আসবে, পাম্পগুলোতে চাপ আরও বাড়বে। অফিস সময়ে লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নেওয়া সম্ভব হবে না, তাই আজ এসেছি। কিন্তু তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাইনি।

মহাখালী ইউরেকা এন্টারপ্রাইজ তেল পাম্পে দাঁড়িয়ে থাকা মোটরসাইকেলচালক রাজু আহমেদ বলেন, ‘আজকের দিনটা তেলের লাইনে দাঁড়িয়েই শেষ হয়ে গেলো। সরকার বলছে তেলের সংকট নেই—তাহলে পাম্পগুলোর এই অবস্থা কেন? অধিকাংশ পাম্পেই বলা হচ্ছে তেল নেই। অনেক পাম্প তেলের অভাবে বন্ধ।’

তিনি বলেন, আগামীকাল থেকে অফিস খুলবে। সরকার দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে তেলের অভাবে দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।

এদিকে সরকারের সর্বশেষ বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই এবং পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় চাপ পড়েছে। এ কারণে সাময়িকভাবে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, যাতে মজুত দীর্ঘ সময় ধরে বজায় রাখা যায়। একই সঙ্গে সরকার বিকল্প উৎস থেকে তেল আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে।

অন্যদিকে জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে যে কোনো সময় সারাদেশের পেট্রোল পাম্প বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। রোববার (২২ মার্চ) রাতে ফেসবুকে এক বার্তায় এ কথা জানায় সংগঠনটি।

কেআর/এসএইচএস