পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির পাহাড়ি উপজেলা দীঘিনালায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ক্ষতিকর তামাক চাষ। ফসলি জমি, স্কুল-কলেজের আশপাশ এবং মাইনী নদীর তীর ঘেঁষে ছড়িয়ে পড়ছে এই বিষাক্ত ফসলের আবাদ। এতে একদিকে যেমন কমছে খাদ্যশস্যের উৎপাদন, অন্যদিকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য।
নীতিমালা থাকলেও মাঠপর্যায়ে তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দেশি-বিদেশি তামাক কোম্পানিগুলো আগাম ঋণ, সার-বীজ সরবরাহ এবং উৎপাদনের পর সরাসরি ক্রয়ের নিশ্চয়তা দিয়ে কৃষকদের তামাক চাষে উৎসাহ দিচ্ছে। ফলে সরকারি নিরুৎসাহমূলক নীতিমালা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এক সময় রবিশস্য ও শীতকালীন সবজি উৎপাদনে সমৃদ্ধ দীঘিনালা উপজেলা আজ তামাক চাষের ছোবলে হারাতে বসেছে সেই ঐতিহ্য। স্থানীয় চাহিদা মেটাতে এখন বাইরের এলাকা থেকে সবজি আমদানির ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে।
উপজেলার মেরুং, কবাখালী ও বোয়ালখালী ইউনিয়নের কয়েকটি স্থানে সরেজমিনে দেখা যায়, কোনো নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে প্রাথমিক বিদ্যালয়, কলেজ, খেলার মাঠ এসব প্রতিষ্ঠানের কুল ঘেঁষে বিষাক্ত তামাকের চাষ।
আরও পড়ুনমিরসরাইয়ে সরিষা ঘরে তুলতে ব্যস্ত কৃষকরা, আবাদ বেড়েছে ৬২৫ হেক্টরলিচু ফুলের মধু সংগ্রহে মঙ্গলবাড়ীয়ায় মৌ খামারিদের ব্যস্ততাউপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, দীঘিনালা উপজেলার মোট আয়তন ৬৯৪ দশমিক ১১ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে মোট জমির মাত্র ১৩ দশমিক ৬০ শতাংশ আবাদযোগ্য। চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৬ থেকে ৭ শতাধিক চাষি প্রায় ৫৬৮ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ করছে। গত বছর এ আবাদ ছিল প্রায় ৫০০ হেক্টর। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে তামাক চাষ বেড়েছে আনুমানিক ৬০ থেকে ৬৮ হেক্টর। তামাকের সবচেয়ে বেশি চাষ হচ্ছে উপজেলার মেরুং, কবাখালী ও বোয়ালখালী ইউনিয়নে।
স্থানীয় তামাক চাষিরা বলছেন, তামাক চাষে বিক্রির ঝামেলা নেই। কোম্পানি সরাসরি সব পণ্য কিনে নেয়। অগ্রিম সার-বীজ পাওয়া যায়, নিজের পুঁজি কম লাগে। অন্যদিকে সবজি বা অন্যান্য ফসল চাষে বাজারমূল্য কম থাকে এবং লাভের নিশ্চয়তা নেই। এছাড়া তামাক চাষের কারণে জমির বর্গা মূল্যও বেশি পাওয়া যায়। এসব কারণেই তারা তামাক চাষে ঝুঁকছেন।
তবে এর পরিবেশগত প্রভাব ভয়াবহ। মাইনী নদীর পাড়সহ উপজেলার ছোট ছোট ছড়ার পাড়ে অহরহ চাষ হচ্ছে তামাকের। ফলে তামাক ক্ষেতে ব্যবহারিত কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে জলজ প্রাণীর উপর। মৎস্য জীবি রুহুল আমিন বলেন, তামাক চাষের আগে মাইনী নদী ও ছোট ছড়াতে নানা জাতের ছোট মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি পেতাম, তামাক চাষ শুরু হওয়ার পর থেকে আর পায় না।
আরও পড়ুননড়াইলে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে সাদা ভাঁট ফুলমাগুরার শ্রীপুরে পেঁয়াজ তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরাউপজেলায় বর্তমানে প্রায় সাত-আট শতাধিক তামাক চুল্লি সক্রিয় রয়েছে। এসব চুল্লিতে বিপুল পরিমাণ বনজ কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। ফলে দ্রুত উজাড় হয়ে যাচ্ছে পাহাড়ি বনাঞ্চল, বাড়ছে ভূমিক্ষয় এবং নষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য।
দীঘিনালা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. তনয় তালুকদার বলেন, দীর্ঘদিন তামাক চাষের সঙ্গে যুক্ত থাকলে শ্বাসকষ্ট, ক্যান্সার, হৃদরোগসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, দীঘিনালা তামাক অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে ইতিমধ্যেই পরিচিতি পেয়ে গেছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ বেড়েছে। তবে এ বছর তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করার মতো কোনো সরকারি প্রণোদনা বা বিকল্প ফসলের বিশেষ উদ্যোগ নেই।
এমআইএইচ