প্রবাস

বাংলাদেশের নারী অধিকার কোন পথে?

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে যুক্তরাজ্যের বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইপসোস এবং কিংস কলেজ লন্ডনের কিংস বিজনেস স্কুল একটি সমীক্ষা প্রকাশ করেছে।সমীক্ষাটির ফলাফল বিশ্বজুড়ে অনেককেই বিস্মিত করেছে। কারণ সাধারণভাবে মনে করা হয় নতুন প্রজন্ম আগের প্রজন্মের তুলনায় বেশি প্রগতিশীল হবে। কিন্তু এই গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতা উল্টোও হতে পারে।

এই সমীক্ষায় যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, ভারত এবং সুইডেনসহ ২৯টি দেশের প্রায় ২৩ হাজার মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে। গবেষণার ফলাফল বলছে, জেনারেশন জেডের অনেক পুরুষের মধ্যে নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি আশঙ্কাজনকভাবে বেশি ঐতিহ্যবাদী।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, জেনারেশন জেডের পুরুষদের ৩১ শতাংশ মনে করে একজন নারীকে সব সময় তার স্বামীর কথা মেনে চলতে হবে। একই প্রজন্মের নারীদের মধ্যেও ১৮ শতাংশ এই মতের সঙ্গে একমত। অথচ বেবি বুমার প্রজন্মে এই হার অনেক কম। সেখানে নারীদের মধ্যে মাত্র ৬ শতাংশ এবং পুরুষদের মধ্যে ১৩ শতাংশ একই মত পোষণ করেন।

শুধু তাই নয়, জেনারেশন জেডের ৩৩ শতাংশ পুরুষ মনে করে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে শেষ কথা বলার অধিকার পুরুষেরই থাকা উচিত। আরও দেখা গেছে, এই প্রজন্মের প্রায় প্রতি চারজন পুরুষের একজন, অর্থাৎ ২৪ শতাংশ মনে করে নারীদের খুব বেশি স্বাধীন বা স্বনির্ভর হওয়া উচিত নয়। তুলনায় বেবি বুমার প্রজন্মের পুরুষদের মধ্যে এই হার মাত্র ১২ শতাংশ।

যৌনতা সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গিতেও একই প্রবণতা দেখা যায়। জেনারেশন জেডের ২১ শতাংশ পুরুষ মনে করে একজন ভালো নারী কখনো যৌন সম্পর্কের সূচনা করবে না। অথচ বেবি বুমার প্রজন্মে নারী ও পুরুষ উভয়ের মধ্যেই এই মতের সমর্থন মাত্র ৭ শতাংশ।

এই ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গবেষকেরা। এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে গ্লোবাল ইনস্টিটিউট ফর উইমেনস লিডারশিপ এর পরিচালক সমাজবিজ্ঞানী হিজুং চুং বলেন, জেনারেশন জেডের অনেক পুরুষ শুধু কঠোর পুরুষতান্ত্রিক ধারণার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চাপই অনুভব করছে না, বরং নারীদেরও আবার ঐতিহ্যগত লিঙ্গভূমিকায় ফিরে যেতে হবে বলে মনে করছে।

দেশভেদেও বড় পার্থক্য দেখা গেছে। উদাহরণস্বরূপ, নারী সব সময় স্বামীর কথা মেনে চলবে কি না এই প্রশ্নে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় সব প্রজন্মের পুরুষদের মধ্যে যথাক্রমে ৬৬ শতাংশ এবং ৬০ শতাংশ এই মতের সঙ্গে একমত। অন্যদিকে সুইডেনে এই হার মাত্র ৪ শতাংশ, যা সমীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।

এই পরিসংখ্যানগুলো কেবল নারীর অবস্থান সম্পর্কে নয়, সমাজের মানসিকতার গভীর একটি চিত্রও তুলে ধরে। কারণ একটি সমাজে নারীকে কীভাবে দেখা হয়, সেটিই সেই সমাজের মানবিকতা, ন্যায়বোধ এবং গণতান্ত্রিক চেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।

বাংলাদেশের বাস্তবতা নিয়ে ভাবলে প্রশ্নটি আরও গভীর হয়ে ওঠে। আমাদের সমাজে এখনও বহু ক্ষেত্রে নারীকে সমান মর্যাদার মানুষ হিসেবে দেখা হয় না। পরিবার, কর্মক্ষেত্র, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও নারীরা প্রায়ই নানা বাধার মুখোমুখি হন। আইনগত অগ্রগতি কিছু হয়েছে, কিন্তু মানসিক ও সামাজিক পরিবর্তন সেই গতিতে এগোয়নি।

এখানেই আরেকটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে। একটি সমাজে যদি আইনের শাসন দুর্বল হয়, তাহলে সমতা ও ন্যায়বিচারও দুর্বল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে প্রায়ই বলা হয় যে দুর্নীতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। যখন রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব, ক্ষমতা এবং ব্যক্তিস্বার্থ আইনের ওপর প্রাধান্য পেতে শুরু করে, তখন আইন তার নিরপেক্ষতা হারায়।

ফলে আইনের শাসন তখন কাগজে কলমে থাকে, কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় তা কার্যকর হয় না। কেউ ক্ষমতার জোরে আইনের বাইরে চলে যায়, আবার কেউ ন্যায়বিচারের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করে। এর ফলে মানুষের মনে একটি গভীর হতাশা তৈরি হয় এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাও কমে যায়।

তবু পরিবর্তনের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় না। কারণ রাষ্ট্র শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, রাষ্ট্র মানুষ দিয়েই গঠিত। সেই মানুষ যদি সচেতন হয়, যদি অন্যায়কে প্রশ্ন করতে শেখে, তাহলে পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়।

বাংলাদেশের সামনে তাই তিনটি বড় কাজ রয়েছে।

প্রথমত, আইনের শাসনকে সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠা করা। আইন যেন ব্যক্তি, দল বা ক্ষমতার প্রভাবের বাইরে থেকে সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয়।

দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ও স্বাধীন করা। বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যদি নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে দুর্নীতি এবং অবিচারের জায়গা অনেকটাই কমে আসে।

তৃতীয়ত, সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানো। পরিবার, শিক্ষা এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে যেখানে নারীকে অধীনস্থ নয়, বরং সমান অংশীদার হিসেবে দেখা হবে।

কারণ একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার অর্থনীতি বা সামরিক ক্ষমতায় নয়, তার ন্যায়বিচার ও মানবিকতার মধ্যেও নিহিত থাকে।

আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে তাই প্রশ্নটি কেবল নারীর অধিকার নিয়ে নয়, আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়েও। আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই যেখানে নারী ও পুরুষ সমান মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারে। নাকি আমরা সেই পুরোনো বৈষম্য এবং অন্যায়ের চক্রেই ঘুরপাক খেতে থাকব। এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী বাংলাদেশের পথ।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেনrahman.mridha@gmail.com

এমআরএম