অর্থনীতি

কৃষিযন্ত্রে ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে হবে নতুন সরকারকে

কৃষিপণ্যের দামের ওঠানামাই এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা নতুন সরকারকে কৃষির ভ্যালু চেইনে ফোকাস করতে হবে কৃষিযন্ত্রে ব্যবসা ভালো চললেও মুনাফা কমেছে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিতে বিনিয়োগ করবে এসিআই

দেশের কৃষিতে এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা কৃষিপণ্যের দামের ব্যাপক ওঠানামা। এতে কৃষক যেমন ক্ষতির মুখে পড়ছে, অনেক সময় উৎপাদিত পণ্যও নষ্ট হচ্ছে। সঠিক তথ্যের অভাবে কোন পণ্যটি কতটা উৎপাদন করতে হবে কৃষক তা অনেক সময় জানতে পারেন না। নতুন সরকারকে কৃষির ভ্যালু চেইনে ফোকাস করতে হবে। কৃষিযন্ত্রে ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে হবে। গড়ে তুলতে হবে কোল্ড চেইন ব্যবস্থা। এমনভাবে সেই ব্যবস্থা গড়তে হবে, যাতে ব্যবসায়ী ও কৃষক উভয়ই সেই কোল্ড চেইনের সেবা নিতে পারেন।

জাগো নিউজকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন এসিআই পিএলসির গ্রুপ উপদেষ্টা ও এসিআই অ্যাগ্রিবিজনেসের প্রেসিডেন্ট ড. এফ এইচ আনসারী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক এমদাদুল হক তুহিন।

জাগো নিউজ: দেশের কৃষিতে কোন বিষয়টি এখন প্রধান সমস্যা বলে মনে করেন?

ড. এফ এইচ আনসারী: দেশের কৃষিতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কৃষিপণ্যের দামের ব্যাপক ওঠানামা। কৃষক যা উৎপাদন করছে তার দাম অনেক সময় হঠাৎ কমে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কৃষক বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছে। উদাহরণ হিসেবে আলুর কথা বলা যায়। নতুন আলুর দাম সাধারণত ৫০ থেকে ৬০ টাকা থাকে। কিন্তু এবার অনেক জায়গায় মাত্র ৮ থেকে ৯ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এখনও অনেক কৃষক সেই কম দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

জাগো নিউজ: কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণ কী?

ড. এফ এইচ আনসারী: এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা তথ্যের অভাব। কৃষক যদি আগে থেকেই জানতে পারেন, কোন ফসল কতটা উৎপাদন হচ্ছে, বাজারে কতটা সরবরাহ থাকবে, তাহলে তিনি সে অনুযায়ী ফসল নির্বাচন করতে পারবেন। আমাদের দেশে জমি ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত। সবাই নিজের মতো করে উৎপাদন করছে। যদি কৃষকরা সঠিক তথ্য পেত ও সেটি অনুসরণ করত, তাহলে একই ফসল অতিরিক্ত উৎপাদনের ফলে যে দাম পড়ে যায়—সেই সমস্যা অনেকটাই কমে যেত।

জাগো নিউজ: অনেক সময় বলা হয় কর্পোরেট কোম্পানিগুলোও মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা পালন করে। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

আরও পড়ুনকৃষিযন্ত্রে ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে হবে নতুন সরকারকে২০২৬ সালে দেশের প্রবৃদ্ধি বেড়ে হবে ৫ শতাংশ: এডিবিকৃষি যন্ত্রপাতির ১১ হাজার কোটি টাকা বিদেশিদের দখলেকৃষিযন্ত্রের বাজার বাড়ছে

ড. এফ এইচ আনসারী: আসলে বিষয়টি সে রকম নয়। সাধারণভাবে মধ্যস্বত্বভোগী বলতে বোঝায় এমন একটি গ্রুপ, যারা পণ্য কিনে বেশি দামে বিক্রি করে লাভ করে। কিন্তু কৃষি খাতে সেই সুযোগ খুব বেশি নেই। গ্রাম থেকে যারা পণ্য সংগ্রহ করে তারা অত্যন্ত কষ্ট করে কাজ করে। অনেক সময় ট্রাকের ওপর পণ্য নিয়ে তারা যাতায়াত করে, সেখানেই রাত কাটায়। যদি তারা এত লাভ করত, তাহলে তাদের জীবনযাত্রা অনেক উন্নত হতো। কর্পোরেট কোম্পানি মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা পালন করছে, এমন ধারণা ঠিক নয়।

জাগো নিউজ: কৃষির কোন বিষয়টিতে নতুন সরকারের ফোকাস করা উচিত বলে মনে করেন?

ড. এফ এইচ আনসারী: অ্যাগ্রিকালচার ভ্যালু চেইনে নতুন সরকারের ফোকাস করা উচিত। এটি করতে আরঅ্যান্ডডি ক্যাপাসিটি বাড়াতে হবে। একদিকে হলো লার্জ স্কেল ক্যাপাসিটি, আর অন্যদিকে হলো ফ্রিকোয়েন্টলি যাতে, আমাদের দেশে আবহাওয়ার কারণে যেসব সমস্যা হয় সেই সমস্যা মোকাবিলা করা। এজন্য প্রাইভেট সেক্টরে ক্যাপাসিটি বাড়ানো ইজ ভেরি ভেরি ইম্পর্টেন্ট। আমরা যে আলোচনা করছিলাম সেখানে বলা আছে অর্গানিক ফার্টিলাইজারের সাবসিডি দিতে হবে। তারপর আমরা বলেছিলাম কৃষি যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে ধান লাগানো ও ধান মাড়াই করার যন্ত্রে সাবসিডি কন্টিনিউ করতে হবে। আর পোস্ট হারভেস্টের জন্য ক্যাপাসিটি বিল্ড করতে হবে, ওয়্যারহাউজ বাড়াতে হবে। এসব জায়গায় ফোকাস করতে হবে।

জাগো নিউজ: কোল্ড চেইন অবকাঠামো গড়ে তুলতে কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন?

ড. এফ এইচ আনসারী: কোল্ড চেইন ব্যবস্থা গড়ে উঠলে কৃষিতে অনেক ক্ষতি কমে যাবে। অনেক সময় কৃষক পণ্য বাজারে নিয়ে আসে কিন্তু বিক্রি করতে পারে না। যদি কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণের সুযোগ থাকে তাহলে পরে বিক্রি করতে পারবে। এক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যদি পর্যাপ্ত অবকাঠামো তৈরি করে এবং সেগুলো বেসরকারি খাতের কাছে লিজ দেয়, পাশাপাশি কৃষকদের জন্য ব্যবহারযোগ্য একটি নির্ধারিত মূল্য নির্ধারণ করে, তাহলে কৃষিপণ্যের অপচয় অনেক কমে যাবে।

জাগো নিউজ: কৃষিতে প্রি-হারভেস্ট ও পোস্ট-হারভেস্ট যান্ত্রিকীকরণ কীভাবে বাড়ানো যায়?

ড. এফ এইচ আনসারী: এখন চাষ থেকে শুরু করে ধান মাড়াই পর্যন্ত অনেক যন্ত্রপাতি এসেছে। কিন্তু কৃষকদের এসব ব্যবহারে অভ্যস্ত হতে সময় লাগছে। এছাড়া এসব যন্ত্রপাতির দামও অনেক বেশি। সরকার যদি ভর্তুকির মাধ্যমে এসব যন্ত্রপাতি সহজলভ্য করে, তাহলে কৃষি উদ্যোক্তারা এগুলো কিনে কৃষকদের সার্ভিস দিতে পারবে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে।

আরও পড়ুনকৃষি যন্ত্রপাতি মেলায় কৃষক নেইহারিয়ে যাচ্ছে গরুর হালকৃষি যন্ত্রাংশে বগুড়ায় নীরব বিপ্লব

জাগো নিউজ: কৃষি ও অ্যাগ্রিবিজনেসের বর্তমান অবস্থা কেমন?

ড. এফ এইচ আনসারী: কৃষি মূলত অ্যাগ্রিবিজনেসেরই একটি অংশ। পুরো কৃষি ভ্যালু চেইন ভালো চললে, অ্যাগ্রিবিজনেসও ভালো চলে। বর্তমানে বীজ খাতে কিছু সমস্যা রয়েছে। ধান ও আলুর বীজের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি খুব ভালো নয়। অনেক কোম্পানি ক্ষতির মুখে পড়ছে। কোথাও কোথাও সারের ঘাটতিও দেখা যাচ্ছে এবং কৃষক বেশি দামে সার কিনছে।

জাগো নিউজ: ছোট কৃষকদের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারে প্রধান বাধা কী?

ড. এফ এইচ আনসারী: ছোট কৃষকদের নিজের যন্ত্রপাতি কেনার দরকার নেই। তারা সার্ভিস হিসেবে এই যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে পারে। অনেক জায়গায় ইতোমধ্যে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে।

জাগো নিউজ: ড্রোন, স্মার্ট ফার্মিং বা ডিজিটাল কৃষি প্রযুক্তি কতটা বাস্তবসম্মত?

ড. এফ এইচ আনসারী: এসব প্রযুক্তি ভালো। আমরা ইতোমধ্যে কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহার শুরু করেছি। তবে কৃষকদের কাছে এগুলো নতুন। তারা মূলত নিজের শ্রম ব্যবহার করে চাষ করে ও পরিবারের খাদ্য নিশ্চিত করে। তাই নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করতে তাদের কিছুটা সময় লাগবে। কিন্তু একবার তারা সুবিধা বুঝতে পারলে দ্রুতই এগুলো গ্রহণ করবে।

জাগো নিউজ: বাংলাদেশে কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের ভবিষ্যৎ কেমন?

ড. এফ এইচ আনসারী: বাংলাদেশে ইতোমধ্যে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং হচ্ছে। বীজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমরা নিজেরাই কন্ট্রাক্ট ফার্মিং করছি। পোল্ট্রি খাতেও এটি রয়েছে। গবাদিপশুর ক্ষেত্রেও ধীরে ধীরে এই পদ্ধতি চালু হচ্ছে। ভবিষ্যতে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং আরও বিস্তৃত হবে বলে আমি মনে করি।

জাগো নিউজ: কৃষিপণ্য রপ্তানিতে প্রধান বাধা কোথায়?

ড. এফ এইচ আনসারী: সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বিমান পরিবহনে পর্যাপ্ত কার্গো স্পেস না থাকা ও ভাড়া বেশি হওয়া। ফলে অনেক সময় উৎপাদন খরচ, পরিবহন খরচ ও বিদেশে পাঠানোর খরচ মিলিয়ে প্রতিযোগিতামূলক দাম রাখা সম্ভব হয় না। এজন্য অনেক রপ্তানিকারক ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

আরও পড়ুনকৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহারে বাড়ছে উৎপাদন, কমছে খরচউৎপাদন ব্যয় বাড়ায় বন্ধ হচ্ছে কৃষিযন্ত্রের কারখানাপাওয়ার টিলার নিয়ে বিপাকে কৃষককৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি, কম খরচে লাভ বেশি

জাগো নিউজ: বর্তমানে আপনাদের ব্যবসা কেমন চলছে?

ড. এফ এইচ আনসারী: ব্যবসা ভালো চলছে। আমাদের প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশের ওপরে। তবে সমস্যা হচ্ছে আমাদের প্রফিট কমে গেছে। কারণ ইউএস ডলার ৮৮ থেকে বাড়তে বাড়তে ১২৪ টাকায় উঠেছে। আর সুদের হার প্রায় ১৫ শতাংশ। এ কারণে মুনাফা একটু কম।

জাগো নিউজ: ভবিষ্যতে এসিআই অ্যাগ্রিবিজনেস কোন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারে?

ড. এফ এইচ আনসারী: প্রকৃতপক্ষে আমরা কৃষির পুরো ভ্যালু চেইনে বিনিয়োগ করেছি। টেকনোলজি, প্রসেসিং ও ফরওয়ার্ড লিংকেজ- প্রতিটি স্টেজেই আমরা আছি। ভবিষ্যতে আমরা হাইটেক অ্যাগ্রিকালচারের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করবো। প্রিসিশন অ্যাগ্রিকালচারের (আধুনিক ও উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ পদ্ধতি) মতো প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিতে আমাদের বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

ইএইচটি/এমএমএআর/এমএফএ