শিক্ষা

বঞ্চিত ২৭০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংস্কারে বরাদ্দ পাচ্ছেন ৩০০ এমপি

মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার মীরকাদিমের রিকাবীবাজার এলাকায় অবস্থিত শহীদ জিয়াউর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়। শুধু নামের কারণে আওয়ামী লীগ আমলের ১৬ বছরে স্কুলটির কোনো উন্নয়ন হয়নি। জরাজীর্ণ ভবনে চলছে ক্লাস-পরীক্ষা।

একইভাবে ঢাকার নবাবগঞ্জের বাহ্রা ইউনিয়নের শহীদ জিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় ও নীলফামারীর সৈয়দপুরের মহিলা ডিগ্রি কলেজের বেগম খালেদা জিয়া ছাত্রীনিবাসও উন্নয়নের মুখ দেখেনি।

রাজনৈতিকসহ নানা কারণে উন্নয়নবঞ্চিত এমন দুই হাজার ৭শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন ভবন নির্মাণ ও সংস্কারকাজ করার পরিকল্পনা করেছে সরকার। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের নির্দেশনায় বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। ঈদের ছুটির পর কয়েকটি সভা করে প্রকল্পটি চূড়ান্ত করা হবে।

৩০০ এমপি পাবেন বরাদ্দ

উন্নয়নবঞ্চিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্যদের কাছে তালিকা চাইবে সরকার। প্রত্যেক সংসদ সদস্য তার নিজ এলাকার উন্নয়নবঞ্চিত এবং অবকাঠামো সংকটে ভোগা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য ডিও লেটার (আধা-সরকারি পত্র) দেবেন। সেখানে একজন এমপি তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভবন নির্মাণ ও ছয়টি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংস্কারকাজের আবেদন করতে পারবেন।

এবার আমরা আধুনিক শিক্ষা অবকাঠামো নির্মাণে জোর দেবো। এক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন—সমন্বিত ডিজিটাল ডাটাবেজের অভাব, ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা, জনবল ঘাটতি। শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনায় আমরা ডিজিটাল, দক্ষ ও ফাংশনাল ইউনিটভিত্তিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করার পরিকল্পনা নিয়েছি।-শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্র জানায়, তালিকাসহ এমপিও শিক্ষামন্ত্রীকে ডিও লেটার দেওয়ার পর তা নিয়ে কাজ করবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা আসার পর প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হবে। এ প্রকল্পে ছয় হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। নতুন সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার মধ্যে এ প্রকল্প অনুমোদন করাতে চায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী জাগো নিউজকে বলেন, ‘বঞ্চিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন। ঈদের ছুটির পর এটি প্রকল্প আকারে গ্রহণ করার বিষয়ে কাজ শুরু করা হবে।’

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা

দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও পরিবেশগত উন্নয়নে তিন স্তরে কর্মপরিকল্পনা করেছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। তার মধ্যে সরকারের ঘোষিত ১৮০ দিনের স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের জরুরি সংস্কার, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত অবকাঠামো তৈরি, বৃক্ষরোপণ।

আরও পড়ুন

শিক্ষামন্ত্রীর এক ঘোষণায় ৬ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিদায়প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা আবশ্যিক নয়, যারা চাইবে না তারা দেবে নাম্যানেজিং কমিটির সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতকই থাকছেস্কুলে ভর্তিতে লটারি থাকছে না: শিক্ষামন্ত্রী

অধিদপ্তরের কর্মপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, বর্তমান সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্র মেরামতে ৩১ দফা রূপরেখার আলোকে দক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর ও মানবিক দেশ গড়তে শিক্ষাখাতে যে অগ্রাধিকারগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে তার মধ্যে দক্ষতা উন্নয়ন, মানবসম্পদ বিনিয়োগ, গবেষণা ও প্রযুক্তি এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা অন্যতম। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় বিগত সরকারের দৈন্যদশা দূর করে নিম্ন-মধ্যপর্যায়ে চাহিদাভিত্তিক এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে কারিগরি ও কর্মমুখী জনশক্তি তৈরি করা এ পরিকল্পনার মূল দর্শন।

নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত অবকাঠামো তৈরির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে একুশ শতকের দক্ষতা, উদ্ভাবনী চিন্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর শেখার সক্ষমতা বাড়ানো হবে।

শিক্ষাখাতে উন্নয়ন ঘটাতে হলে ভালো অবকাঠামো, ভালো পরিবেশ দরকার। এটা প্রধান তিনটি চাহিদার মধ্যে অন্যতম। শিক্ষা প্রকৌশল থেকে এ কাজটা করা হয়। তারা কিছু পরিকল্পনা দিয়েছে। এর সঙ্গে আরও যুক্ত করতে হবে। দ্রুততম সময়ে যেমন কাজ শেষ করা জরুরি, তেমনি স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।-শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সব প্রকল্পের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর্বোরিকালচার বা বৃক্ষরোপণ অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পাশাপাশি বৃক্ষনিধন রোধে পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার কমাতে সোলার এনার্জি ব্যবহারে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সারাদেশে শিক্ষা অবকাঠামোর চাহিদা নিরূপণ, একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডাটাবেজ প্রস্তুত, মানসম্মত স্ট্যান্ডার্ড ডিজাইন প্রণয়ন, পুরাতন হেরিটেজ স্থাপনার রেট্রোফিটিং, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের জরুরি সংস্কার পরিকল্পনা ও শিক্ষা অবকাঠামোর উন্নয়নে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করা হবে।

মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় যা আছে

অধিদপ্তরের মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় উপজেলা ও জেলাপর্যায়ে আধুনিক পরীক্ষাকেন্দ্র, ট্রেনিং সেন্টার নির্মাণ, জাতীয়করণ করা স্কুল ও কলেজের অবকাঠামো উন্নয়ন, মাল্টিপারপাস ভবন, লাইব্রেরি, অডিটোরিয়াম নির্মাণ, কারিগরি ও মাদরাসার অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করা হবে।

দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী—চার হাজার ৭৬১ স্কুল ও কলেজে নতুন ভবন নির্মাণ, পাঁচ হাজার ৪১ প্রতিষ্ঠানের ভবন সম্প্রসারণ, এক হাজার ৯৯টি নির্বাচিত বেসরকারি কলেজ উন্নয়ন, ৩২৫টি স্কুল ও ৩৪৩টি জাতীয়করণ করা কলেজ উন্নয়ন, পলিটেকনিক ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়ন, মাদরাসা অবকাঠামো সম্প্রসারণ।

শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী বলেন, ‘এবার আমরা আধুনিক শিক্ষা অবকাঠামো নির্মাণে জোর দেবো। এক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন—সমন্বিত ডিজিটাল ডাটাবেজের অভাব, ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা, জনবল ঘাটতি। শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনায় আমরা ডিজিটাল, দক্ষ ও ফাংশনাল ইউনিটভিত্তিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করার পরিকল্পনা নিয়েছি।’

জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জাগো নিউজকে বলেন, ‘শিক্ষাখাতে উন্নয়ন ঘটাতে হলে ভালো অবকাঠামো, ভালো পরিবেশ দরকার। এটা প্রধান তিনটি চাহিদার মধ্যে অন্যতম। শিক্ষা প্রকৌশল থেকে এ কাজটা করা হয়। তারা কিছু পরিকল্পনা দিয়েছে। এর সঙ্গে আরও যুক্ত করতে হবে। দ্রুততম সময়ে যেমন কাজ শেষ করা জরুরি, তেমনি স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।’

বঞ্চিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার যেখানে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়ার নাম দেখেছেন, সেখানেই অবহেলা করেছে। ভালো ভালো অনেক প্রতিষ্ঠান উন্নয়নবঞ্চিত হয়েছে বছরের পর বছর। প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেষ করে দিতে চেয়েছে। এখন ফ্যাসিবাদী শাসন নেই, জনগণের সরকার সব ক্ষেত্রে উন্নয়ন করবে। তবে যেসব প্রতিষ্ঠানগুলো বঞ্চিত হয়েছে, সেগুলোতে সবার আগে নজর দেওয়া নৈতিক দায়িত্ব। এ কারণে আমরা সংসদ সদস্যদের তার এলাকার উন্নয়নবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানের তালিকা দিতে বলবো। সেগুলো যাচাই-বাছাই করে কাজে হাত দেওয়া হবে।’

এএএইচ/এএসএ