শিক্ষামন্ত্রীর এক ঘোষণায় ৬ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিদায়

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:২৭ পিএম, ১৬ মার্চ ২০২৬
অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান, সালেহ হাসান নকীব, ইয়াহ্ইয়া আখতার (বাঁ থেকে ওপরে), অধ্যাপক আবদুল হাছিব, ড. মাকসুদ হেলালী ও রেজাউল করিম (বাঁ থেকে নিচে)

ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রামসহ দেশের ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে একদিনে সরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। তাদের স্থলে নতুনদের নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সোমবার (১৬ মার্চ) সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ব্রিফিং করে এ ঘোষণা দেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

অপসারিত হলেন যেসব উপাচার্য
অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান আগেই পদত্যাগপত্র দিয়েছিলেন। তবে এতদিন তা ঝুলিয়ে রেখে তাকে দায়িত্ব পালন করে যেতে নির্দেশনা দিয়েছিল সরকার। সোমবার তাকে সরিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।

গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খানকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০তম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার নিয়োগের প্রজ্ঞাপনে মেয়াদকাল হিসেবে ‘অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য’ কথাটি উল্লেখ করা হয়েছিল।

অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব: বিএনপিপন্থি হলেও পদ ধরে রাখতে পারেননি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ হাসান নকীব। তাকেও সরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। তার স্থলে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম।

২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫তম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব। তিনি জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সদস্য ছিলেন। নিয়োগ পাওয়ার পর ফোরাম থেকে পদত্যাগ করেন।

আরও পড়ুন
একদিনে ৭ বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগের ঘোষণা

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার: ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০তম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া হবে বলে গুঞ্জন ছিল। অবশেষে সেই গুঞ্জন সত্যি হয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রীর চবির উপাচার্য পদ থেকে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতারকে সরিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তার স্থলে চবির নতুন উপাচার্য পদে নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল ফোরকান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষক। পাশাপাশি তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সিনিয়র সহসভাপতি।

অধ্যাপক রেজাউল করিম: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিমকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়টির সপ্তম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯ সেপ্টেম্বর যোগদান করে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তার স্থলে বিএনপি সরকার নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে বিএনপিপন্থি শিক্ষক নেতা অধ্যাপক রইছ উদ্দীনকে।

অধ্যাপক ড. মাকসুদ হেলালী: নানান নাটকীয়তার পর ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) উপাচার্য পদে নিয়োগ পান অধ্যাপক ড. মাকসুদ হেলালী। তিনি কুয়েটের নবম উপাচার্য।

৮ মাসের মাথায় তাকে সরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। তার স্থলে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন অধ্যাপক মুহাম্মদ মাছুদ। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয় ছাত্রদল-যুবদলের সংঘর্ষের পর তাকে সরিয়ে দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে তাকে ফের উপাচার্য পদে নিয়োগ দিলো।

অধ্যাপক আবদুল হাছিব: অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের ঠিক আগমুহূর্তে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য পদে বুয়েটের ন্যানোম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড সিরামিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এস মো. আবদুল হাছিবকে নিয়োগ দিয়ে যায়। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি নিয়োগ পান। তবে দায়িত্ব গ্রহণের আগেই তাকে বিদায় নিতে হচ্ছে। তাকে সরিয়ে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে উপাচার্য পদে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. নুরুল ইসলামকে। তিনি বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য পদে দায়িত্ব পালন করছেন।

নতুন নিয়োগ পেলেন যারা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উপাচার্য পদে নিয়োগ পাচ্ছেন অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) নতুন উপাচার্য হচ্ছেন অধ্যাপক ড. রইছ উদ্দীন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল ফোরকান।

খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) উপাচার্য পদে নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাসুদ। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য হচ্ছেন অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান খান এবং ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য পদে নিয়োগ পাচ্ছেন অধ্যাপক নুরুল ইসলাম।

অপরদিকে, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পাচ্ছেন অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। তিনি বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছেন এবং সদ্য পদত্যাগ করা ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজের স্থলাভিষিক্ত হবেন।

নতুন উপাচার্যরা সবাই বিএনপিপন্থি, পদধারীও কেউ কেউ

ঢাবির নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম বিএনপিপন্থি সাদা দলের সাবেক আহ্বায়ক। রাবির উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম জিয়া পরিষদের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক।

জবির নতুন উপাচার্য অধ্যাপক রইছ উদ্দীনও বিএনপিপন্থি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া চবিতে উপাচার্য নিয়োগ পাওয়া অধ্যাপক মোহাম্মদ আল ফোরকান বিশ্ববিদ্যালয়টির জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের বর্তমান সিনিয়র সহসভাপতি।

উপাচার্য রদবদল প্রসঙ্গে যার বললেন শিক্ষামন্ত্রী
উপাচার্য পদে রদবদল প্রসঙ্গে ব্রিফিংয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গতিশীল করা প্রয়োজন। শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আনতে আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। নিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা যোগ্যতা ও দক্ষতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছি। আশা করছি, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করবেন।’

নতুন উপাচার্যদের সবাই বিএনপিপন্থি। বিষয়টি সামনে এনে রাজনৈতিক বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, একজন লোকের রাজনীতি করা কি অপরাধ? এটি কি তাদের ডিসকোয়ালিফিকেশন? এটা ডিসকোয়ালিফিকেশন নয়। প্রত্যেকটি ভিসির বিষয়ে চেক করেছি। তাদের সাইটেশন, কোটেশন, গুগল সার্চ, পিএইচডি, পোস্ট ডক্টরেট, এমফিল-সব দেখে ক্যাটাগরি করে যারা ভালো পারফরম্যান্স করেছে, তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’

এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘আপনারা চাইলে এসব দেখাতে পারবো। আমার কাছে সব রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম হায়েস্ট পারফরমার। আমরা শিক্ষাগত যোগ্যতাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছি। রাজনীতি করাটা শিক্ষকদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা। কে রাজনীতি করবে, কি করবে না, এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কেউ কাউকে রাজনীতিতে ম্যানডেটরি করতে পারবে না।

এএএইচ/এমএএইচ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।