মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ঘাটতি দেখা দিয়েছে জ্বালানি তেলের বাজারেও। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে উন্নত থেকে উন্নয়নশীল—সব দেশই আবার পরিবেশ দূষণকারী কয়লার দিকে ঝুঁকছে।
বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলএনজি উৎপাদন হয় মধ্যেপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলে। কিন্তু সেখান থেকে জ্বালানির সর্বশেষ চালান রওয়ানা দিয়েছিল প্রায় এক মাস আগে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় আমদানিনির্ভর দেশগুলো ভয়াবহ চাপের মুখে পড়েছে।
এলএনজি সংকটে দিশেহারা আমদানিকারকরাউপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আসা এলএনজি কার্গোগুলো এ সপ্তাহে তাদের গন্তব্যে পৌঁছানোর পর নতুন কোনো সরবরাহ না থাকায় হাহাকার শুরু হয়েছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো ধনী দেশগুলো চড়া দামে বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি কেনার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, পাকিস্তান বা বাংলাদেশের মতো দেশগুলো জ্বালানি বাঁচাতে স্কুল বন্ধ রাখা বা ব্যবসায়িক সময় কমিয়ে দেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে।
আরও পড়ুন>>ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হওয়া বিপুল অর্থ দিয়ে কী কী করা যেতো?রেকর্ড পতন/ ইতিহাসে প্রথমবার ৯৫ ছাড়ালো ভারতীয় রুপির দরবিশ্ববাজারে সোনার দামে ৪৩ বছরের সবচেয়ে বড় পতন
এ অবস্থায় বিকল্প হিসেবে কয়লার ব্যবহার বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এরই মধ্যে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া পুরোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ফের চালুর অনুমতি দিয়েছে। বাংলাদেশ ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কয়লা আমদানি বাড়িয়েছে, পাশাপাশি ভারত থেকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ আমদানিও বৃদ্ধি করেছে।
এ অবস্থায় বিশ্ববাজারে কয়লার দামও বাড়তে শুরু করেছে। অস্ট্রেলিয়ার রপ্তানিযোগ্য কয়লার দাম ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে তেল ও গ্যাসের তুলনায় এই বৃদ্ধি তুলনামূলক কম। যুদ্ধ শুরুর পর তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে এবং এলএনজির দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কয়লার দাম তুলনামূলক কম বাড়ার পেছনে বাজার কাঠামো বড় ভূমিকা রাখছে। বিশ্বে উৎপাদিত কয়লার মাত্র ১৭ শতাংশ আন্তর্জাতিকভাবে বিক্রি হয়, যেখানে এলএনজি প্রায় পুরোপুরিই বৈশ্বিক বাজারনির্ভর।
অনিশ্চিত বাজারে কয়লার পুনরুত্থানবর্তমান সংকটে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে এশিয়ায়। চীন ও ভারত-এর মতো দেশগুলো নিজেদের উৎপাদন বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। এছাড়া, আগে বন্ধ করে দেওয়া অনেক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আবার চালু করা হচ্ছে।
তবে সংকট দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের মতো বড় আমদানিকারকরা এরই মধ্যে বাড়তি চাপের মুখে পড়েছে। ফিলিপাইনও কয়লার ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপসাগরীয় এলএনজি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে কয়লার দাম আরও বাড়তে পারে। বিশ্বের বৃহত্তম কয়লা রপ্তানিকারক ইন্দোনেশিয়া উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাজারে প্রভাব রাখছে, যদিও বাড়তি চাহিদার কারণে তারা নীতিতে শিথিলতা আনতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে দেশগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকলেও বর্তমান সংকটে কয়লাই হয়ে উঠছে প্রধান বিকল্প—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্টকেএএ/