আন্তর্জাতিক

হরমুজ খুললেই কাটবে না সংকট, রেশ থাকবে বহুদিন

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ‘হরমুজ প্রণালি’ যদি আগামীকালই খুলে দেওয়া হয়, তবুও বিশ্বজুড়ে পণ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে কয়েক মাস সময় লেগে যাবে। জাহাজ চলাচল ও বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরেই দেখা দেবে লজিস্টিকস বা পণ্য পরিবহনের আসল চ্যালেঞ্জ।

জার্মান শিপিং প্রতিষ্ঠান হাপাগ-লয়েডের করপোরেট কমিউনিকেশনের জ্যেষ্ঠ পরিচালক নিলস হাউপ্টের কথায়, ‘যুদ্ধ বা বোমাবর্ষণ বন্ধ হওয়া মানেই লজিস্টিকস খাতের যুদ্ধ শেষ হওয়া নয়। শত শত জাহাজ বন্দরে ভেড়ার জন্য অপেক্ষায় আছে। এই জট কাটানোই হবে বিশাল কাজ।’

দীর্ঘ জটে স্থবিরতা

আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও)-এর তথ্যমতে, ইরানের আংশিক অবরোধের কারণে বর্তমানে এই অঞ্চলে প্রায় দুই হাজার জাহাজ আটকা পড়ে আছে। এর মধ্যে প্রায় ৪০০ জাহাজ ওমান উপসাগরে অবস্থান করছে। বাকি জাহাজগুলো সুয়েজ খাল অথবা আফ্রিকার কেপ অফ গুড হোপ হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এশিয়া ও ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।

আরও পড়ুন>>হরমুজ প্রণালি খুলতে না পারলেও যুদ্ধ থামাতে রাজি ট্রাম্পহরমুজ প্রণালিতে টোল আরোপ পরিকল্পনায় অনুমোদন দিলো ইরানহরমুজে আটকে পড়া বাংলাদেশি ৬ জাহাজের তথ্য যাচাই চলছে: ইরানি রাষ্ট্রদূত

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রণালি খুলে গেলেও জমে থাকা পণ্য ও জাহাজের চাপ সামাল দিতে দীর্ঘ সময় লাগবে। নরওয়ের একটি শিপিং ঝুঁকি সংস্থার কর্মকর্তা সভেইন রিংবাক্কেন বলেন, ‘স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে কয়েক মাস সময় লাগবে, কারণ জাহাজ ও পণ্যের বড় ধরনের জট তৈরি হয়েছে।’

অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

সংকটকে আরও জটিল করেছে মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামোর ক্ষতি।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাবে, এ পর্যন্ত ৪০টির বেশি জ্বালানি কেন্দ্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কাতার এনার্জি এবং কুয়েত পেট্রোলিয়ামের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো অনিবার্য পরিস্থিতি ঘোষণা করেছে।

এই পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ ব্যাহত হয়েছে, যার ফলে তেল ও এলএনজির দাম বেড়েছে। পাশাপাশি সার, পেট্রোকেমিক্যাল ও প্লাস্টিক উৎপাদনের কাঁচামাল রপ্তানিও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

তিনগুণ বেড়েছে বিমা খরচ

সংঘাতের কারণে জাহাজের বিমা খরচ বা প্রিমিয়াম প্রায় ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এনএসআই ইনস্যুরেন্স গ্রুপের প্রধান নির্বাহী অস্কার সেকালি জানান, যতক্ষণ না নিরাপত্তা ১০০ শতাংশ নিশ্চিত হচ্ছে, ততক্ষণ এই চড়া হার কমবে না। এমনকি একটি জাহাজকে এই পথ দিয়ে পার হতে ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত দিতে হয়েছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।

ড্রোনের হুমকি ও নতুন যুদ্ধকৌশল

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংকট ভবিষ্যতে শিপিং খাতের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাতেও বড় পরিবর্তন আনবে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক লজিস্টিক কোম্পানি সেফসি-এর চেয়ারম্যান এসভি আঞ্চন বলেন, ‘নতুন ধরনের হুমকি—বিশেষ করে ড্রোন হামলা—ঝুঁকির পরিবেশ পুরো বদলে দিয়েছে।’

যুদ্ধ শুরুর পর উপসাগরীয় অঞ্চলে অন্তত ১৮টি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে আইএমও। এতে শিপিং খাতে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব: বিকল্প পথের সন্ধান

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু নৌপথ খুলে দিলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না। শিপিং কোম্পানি ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো আবার পূর্ণমাত্রায় কার্যক্রম শুরু করার আগে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চাইবে।

তাদের মতে, করোনাকালীন যেমন বিশ্ব চীন থেকে তাদের সাপ্লাই চেইন সরিয়ে নিয়েছিল, এই যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতাও চিরতরে কমে যেতে পারে।

অনেক কোম্পানি এখন হরমুজ প্রণালির বিকল্প রুট খুঁজছে, যাতে ভবিষ্যতে এমন অস্থিতিশীলতায় পড়তে না হয়। সৌদি আরব এরই মধ্যে লোহিত সাগর দিয়ে তেলের চালান পাঠানো শুরু করেছে।

সূত্র: আল-জাজিরাকেএএ/