জাতীয়

গণভোটের রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে বিএনপি

দেশের দুই-তৃতীংশ মানুষ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। গণভোট বাস্তবায়ন হলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু গণভোটের রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে বিএনপি। গণভোট বাস্তবায়ন না করলে দলটিকে চরম মাশুল দিতে হবে।

বুধবার (১ এপ্রিল) বিকেলে রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ‘ত্রয়োদশ নির্বাচন পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা: দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা কি গণভোট বাস্তবায়নের অন্তরায়?’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্র সংগঠন ‘জাতীয় ছাত্রশক্তি’ এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, বিএনপির মধ্যে রাজনৈতিক হীনমন্যতা রয়েছে। দলটি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে না, আগেও বলেছি নাগরিক সমাজের সবাইকে। কিন্তু তারা হাসাহাসি করেছে। কারণ আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দুই দলই বারবারই জাতির সঙ্গে বেইমানি করেছে।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের ভোট এবং মাইনরিটিদের ভোট নিয়ে তারা এবার ক্ষমতায় এসেছে। কারণ বিএনপির রাজনীতি আর এক্সক্লুসিভ নেই। জিয়াউর রহমানও একই কাজ করেছিলেন। আওয়ামী লীগের প্রশ্ন ডিল করতে না পারা এবং বাহাত্তরের সংবিধান প্রশ্ন ডিল করতে না পারায় তাকে চরম মূল্য দিতে হয়েছিল। বিএনপি এখনো একই পথে হাঁটছে।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির বলেন, সংবিধানের কোথাও নেই যে, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হবে। বিএনপি নির্বাচনের আগে তফসিল ঘোষণা করেছিল। সেখানেও ১ নম্বর দফায় বলেছিল, সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করবে। বিএনপির নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে দাঁড়িয়ে বলেস প্রধান নির্বাচন কমিশনার নাকি সংবিধান লঙ্ঘন করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কপি পাঠিয়েছে। তাহলে তিনি ঐকমত্য কমিশনের সদস্য হলেন কীভাবে। সংবিধানের কোথায়ও নেই ঐকমত্য কমিশনের কথা।

তিনি বলেন, বিএনপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে। বিএনপির মতামত ততক্ষণ পছন্দ হয়, যতক্ষণ নিজেদের পক্ষে থাকে। বিএনপির চেয়ারম্যান আইনত প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি কার্যত প্রধানমন্ত্রী। গণভোটের জন্য প্রচারণা চালিয়েছেন। সেই সঙ্গে মানুষের কাছে গণভোটের কথা বলেছেন।

আইনজীবী আবু হেনা রাজ্জাকী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু এই দাবি সেই দাবি নিয়ে আন্দোলন হয়েছে। এত এত দাবি, সেগুলো এখন কোথায়? এখন আর দাবি নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রতিদিনই আন্দোলন হয়েছে। মানুষ আন্দোলন দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল।

তিনি বলেন, এখন দেশে জ্বালানি সংকট চলছে। সরকার বলছে, দেশে জ্বালানি সংকট নেই এবং দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি আছে। আর মানুষ পাম্পে গিয়ে জ্বালানি পাচ্ছে না। দ্বিচারিতা বন্ধ করতে হবে।

তিনি বলেন, আমরা কথায় কথায় বলি, ‘অমুক ভারতের দালাল’, ‘তমুক পাকিস্তানের দালাল’। কারও প্রমাণ করার দরকার নেই। নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনি বাংলাদেশি কি না? তাহলে সংস্কারে কোনো বাধা থাকার কথা না। জুলাই সনদে ক্ষতিকর কিছুই নেই।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, বিএনপি সংবিধান সংবিধান করে; সবকিছু সংবিধান সম্মত হলে এখনো ক্ষমতায় থাকতো শেখ হাসিনা। সেই সঙ্গে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান থাকতেন বিদেশে। মানুষের রায়কে শ্রদ্ধা জানাতে শিখতে হবে। বাংলাদেশের বড় বড় পরিবর্তনে সুবিধাভোগী হয়েছে বিএনপি। বিএনপিকে ইতিহাস থেকে শিখতে হবে। বিএনপি লম্বা সময় ক্ষমতার বাইরে ছিল, তা থেকে কিছু শেখেনি।

তিনি বলেন, সবার আগে মানুষের অধিকার। এই সংবিধানকে সংস্কার করতে হবে। গত ১৭ বছর জুলুম-নির্যাতন করা হয়েছে সংবিধানের দোহাই দিয়ে। কত মানুষকে গুম-খুন করা হয়েছে। মানুষ এখন সচেতন, তারা নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে চায়। বিএনপি গণভোটকে উপেক্ষা করলে চরম মূল্য দিতে হবে।

সারোয়ার তুষার বলেন, খেলা আসলে হয়ে গেছে। এই খেলায় গোল দিয়েছে বাংলাদেশের মানুষ (ছাত্র-জনতা)। বিএনপি মহাসচিব বলেছিলেন, ‘বিএনপি মাঠ গুছিয়েছিল। গোল দিয়েছে ছাত্ররা।’ আসলে বিএনপি ট্রফি নিয়ে গেছে। জুলাই সনদ হয়েছে রাজনৈতিক অস্ত্র। সংবিধান ছুড়ে ফেলতে চাইলে নাকি রাজাকার হয়ে যাবে। বেগম খালেদা জিয়া সংবিধান ছুড়ে ফেলার কথা বলেছিলেন। বিএনপিতে যেসব বাহাত্তর প্রেমি আছে, তারা বলে সংশোধনী ছুড়ে ফেলার কথা বলছে। বিএনপি হলো ছোট খেলোয়াড়। এখন আওয়ামী লীগ নেই। বিএনপি বড় খেলোয়াড় হয়ে গেছে।

ভয়েস ফর রিফর্মের উদ্যোক্তা ও সংগঠক ফাহিম মাসরুর বলেন, দুই-তৃতীংশ মানুষ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। আমার ধারণা গণভোট বাস্তবায়নে বিএনপি নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেছে। জুলাই সনদে এমন কোনো ব্যাপার নেই বিএনপির ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করবে। তাহলে গণভোট বাস্তবায়ন এত গড়িমসি কেন? বিএনপির ইগো ইস্যুও থাকতে পারে।

ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা বলেন, এত রক্ত আর জীবনের বিনিময়ে ভেবেছিলাম নতুন একটি রাষ্ট্র পাবো। বাংলাদেশে সুন্দর ব্যবস্থা ও কালচার চেয়েছি। আমরা এমন একটি কালচারও চেয়েছিলাম সব ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকবে না।

তিনি বলেন, গণভোট বাস্তবায়ন হলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। জনগণ সংস্কারের পক্ষে। বর্তমান সরকার গণভোট বাস্তবায়ন করতে গড়িমসি করছে। গণভোট বাস্তবায়ন না করার জন্য সব ধরনের আয়োজন করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সংবিধান জনগণের জন্য। সবার আগে জনগণ। আমরা চাই জনগণের রায় অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হোক। জনরায় বাস্তবায়ন করা না হলে প্রয়োজনে রাজপথে নামা হবে।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে আইনজীবী ইমরান সিদ্দিকী ও এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক জাভেদ রাসিনসহ আরও অনেকে বক্তব্য দেন।

এনএস/ইএ