ফিচার

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সাইকেল, বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় বিকল্প পরিবহন

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেক আগে থেকেই সাইকেলের ব্যবহার প্রচলিত। কিছু কিছু দেশ জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সাইকেল ব্যবহার করে আসছে। সাইকেলের ব্যবহার শুধু জ্বালানি সাশ্রয় বা অর্থনৈতিক দিকেই নয়, পরিবেশ রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মোটরযান থেকে নির্গত বিভিন্ন ধরছেন ক্ষতিকর গ্যাস পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থের জন্য মারাত্মক হুমকি। কিন্তু সাইকেল ব্যবহারে কোনো ধোঁয়া বা ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হয় না। তাই বিশ্বের অনেক দেশ জ্বালানি নির্ভর যানবাহনের বিকল্প হিসেবে সাইকেলকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এছাড়া কেউ কেউ স্বাস্থ্য সচেতনায় ব্যায়াম হিসেবেও সাইকেল চালান। তাই স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের জন্য সাইকেল সবচেয়ে উত্তম ও পরিবেশবান্ধব বাহন।

বিশ্বজুড়ে অস্থির ভূ-রাজনীতি ও যুদ্ধের প্রভাবে বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। গত কয়েক মাস ধরে দেশের পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেল নিয়ে অস্থিরতা চলছে; ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত তেল। পাশাপাশি খোলা বাজারে তেলের দামও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতিকে ঘিরে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যও দেখা যাচ্ছে, ফলে মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালকরা বিপাকে পড়েছেন। গণপরিবহন কিংবা ব্যক্তিগত গাড়িতে যাতায়াতকারী সব শ্রেণির মানুষই এ সংকট ও সিন্ডিকেটের ভুক্তভোগী।

এই কঠিন সময়ে বিকল্প ও সাশ্রয়ী বাহন হিসেবে চিরচেনা সাইকেল হতে পারে কার্যকর সমাধান। এটি শুধু খরচ বাঁচাতেই নয়, বরং পরিবেশবান্ধব, স্বাস্থ্যকর এবং টেকসই পরিবহন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আজ চলুন এমন কিছু দেশের দিকে নজর দিই, যেখানে সাইকেল শুধু একটি বাহন নয়, বরং জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ-

চীন

প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে এগিয়ে রয়েছে চীন। এমন অবস্থায় সাইকেলের ব্যবহারের দিকে তারা পিছিয়ে নয়-দেশটিতে সাইকেলের সংখ্যা প্রায় ৫০০ মিলিয়ন। তাই চীনকে বলা হয় বিশ্বের সর্ববৃহৎ সাইকেল ব্যবহারকারী দেশ। সাংহাই শহরের ৬০ শতাংশ মানুষ প্রতিদিন সাইকেল ব্যবহার করেন। হাংঝো ও চেংদু শহরে রাইড শেয়ারিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে। বলে রাখা ভালো, চীন হলো আধুনিক শেয়ার্ড সাইকেল সেবার জন্মস্থান। পরিবেশবান্ধব ও শহুরে জীবনে সুবিধাজনক বলে দেশটিতে সাইকেলের ব্যবহার আরও জনপ্রিয় হচ্ছে।

জার্মানি

জার্মানির জনসংখ্যা প্রায় ৮২ মিলিয়ন। কিন্তু দেশটিতে সাইকেলের সংখ্যা প্রায় ৮১ মিলিয়ন! মোটরগাড়ি উৎপাদনের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় দেশ হওয়া সত্ত্বেও সাইকেল চালানো জার্মানিদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। এজন্য জার্মানিকে ‘সাইকেল আরোহীদের দেশ’ বলা হয়। দেশটিতে আয়োজিত হয় বার্ষিক ডয়েচল্যান্ড ট্যুর ইভেন্ট। এ সময় দেশজুড়ে রোমান্টিক রোড ও বার্লিন ওয়াল ট্রেইলের মতো রুটে সাইকেলপ্রেমীরা বেরিয়ে পড়েন।

নেদারল্যান্ডস

নেদারল্যান্ডসকে বলা হয় ‘সাইকেলের দেশ’। দেশটিতে জনসংখ্যার চেয়ে সাইকেলের সংখ্যা বেশি। যেখানে সাইকেল চলাচলের জন্য রয়েছে উন্নত অবকাঠামো। ফলে দেশটিতে তৈরি হয়েছে সাইকেল সংস্কৃতি। তাই দৈনন্দিন যাতায়াতের ২৮ শতাংশ সাইকেলেই করা হয়। নেদারল্যান্ডস সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন সাইকেলের ব্যবহার বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।

ডেনমার্ক

ডেনমার্কে সাইকেল ব্যবহার খুবই জনপ্রিয়। দেশটিতে একজন ব্যক্তি গড়ে দৈনিক সাইকেল চালান ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার। কোপেনহেগেন শহরকে ২০১৫ সালে বিশ্বের সাইকেলবান্ধব শহর হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ডেনমার্ক সরকার সাইকেলের ব্যবহার বাড়ানোর জন্য রাস্তায় লেন, সাইকেল ব্রিজ এবং পার্কিং সুবিধায় বড় বিনিয়োগ করেছে। সেখানে ‘ট্যুর দে ডেনমার্ক’ নামের সাইকেল প্রতিযোগিতা খুব জনপ্রিয়।

নরওয়ে

নরওয়েতে জনসংখ্যার ৬১ শতাংশ মানুষ সাইকেল ব্যবহার করে। যেখানে ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সাইকেল যাত্রার হার ১১ শতাংশ বেড়েছে। বিশেষ করে দেশটির পাহাড়ি এলাকার মানুষ এবং বয়স্কদের মধ্যে ই-বাইকের জনপ্রিয়তা বাড়ছে।

সুইজারল্যান্ড

সুইজারল্যান্ডেও সাইকেল বেশ জনপ্রিয়। দেশটিতে ১২ হাজার কিলোমিটার সাইকেল পথ আছে। যেখানে বর্তমানে ই-বাইকের জনপ্রিয়তাও বাড়ছে। সুইজারল্যান্ডে ‘ট্যুর দে সুইস’ ও ‘ট্যুর দে রোমানডিয়া’ ইভেন্টের জন্য প্রতিবছর হাজারো সাইকেলপ্রেমী একত্র হোন।

বেলজিয়াম

বেলজিয়ামের বেশ কিছু শহরে সাইকেল চালানোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। দেশটিতে বিশেষ সাইকেল লেন, পার্কিং ব্যবস্থার পাশাপাশি আছে ভাড়ায় সাইকেল ব্যবহারের সুযোগ। বেলজিয়ামে অনেক খ্যাতনামা পেশাদার সাইক্লিস্ট বসবাস করেন। প্রতিবছর জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ‘রোন্দে ভান ফ্লান্দেরেন’ অনুষ্ঠিত হয়। যা বিশ্বের মর্যাদাপূর্ণ সাইকেল রেস হিসেবে পরিচিত।

জাপান

জাপানে সাইকেল সাধারণত অল্প দূরত্বে যাতায়াত এবং শহরে চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হয়। টোকিও ও অন্যান্য বড় শহরে সাইকেল বেশ জনপ্রিয় বাহন। দেশটিতে ২০২২ সালে প্রায় ১৫ লাখ সাইকেল বিক্রি হয়েছে। জাপানে ‘শিমানামি কাইডো’ নামে ৬০ কিলোমিটার সেতু ও দ্বীপ রুটে সাইকেল রেস হিসেবে পরিচিত। দেশটিতে বিশেষ ধরনের সাইকেল মামাচারি বেশ জনপ্রিয়।

সুইডেন

সুইডেনের জনসংখ্যা দেড় কোটি। এর প্রায় ৬৪ শতাংশ মানুষ সাইকেল ব্যবহার করে। স্টকহোম, গোথেনবার্গ ও মলমো শহরে সাইকেলের বিশেষ পথ, পার্কিং সুবিধা এবং রাইড শেয়ারিং ব্যবস্থা রয়েছে। দেশটির গটল্যান্ড ও ওল্যান্ড দ্বীপে সাইকেল পর্যটন জনপ্রিয়।

ফিনল্যান্ড

ফিনল্যান্ড একটি দর্শনীয় ও সুন্দর দেশ। যেখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বিস্তীর্ণ খোলা জায়গা এবং সাইকেল পর্যটনের সুযোগ রয়েছে, যা স্থানীয় মানুষদের সাইকেল চালানোর আগ্রহ বাড়ায়। সাইকেল অবকাঠামো, নিরাপদ বাইক লেন এবং সাইকেল পার্কিংয়ে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে ফিনল্যান্ড।

বিশ্বে সাইকেল কেবল যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় না; এটি পরিবেশ ও সুস্থ জীবনধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উন্নত সাইকেল অবকাঠামো, নিরাপদ পথ, সরকারি প্রণোদনা এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সমন্বয়ে মানুষকে সাইকেল ব্যবহারে উৎসাহিত করা হয়।

আরও পড়ুনপেট্রোল-ডিজেলের বাংলা কী জানেন?নারীর সঙ্গে পরিবেশ, পরিবেশের সঙ্গে উন্নয়ন

কেএসকে