প্রবাস

দুরভিসন্ধিমূলক রাজনীতির পরিণতি ভালো হয় না

আহমেদ জোবায়ের

বিএনপি গণভোট ও সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ইলেকশনে জয়ী হয়ে এখন জনগণের সঙ্গে প্রতারণামূলক রাজনীতি করা শুরু করেছে। গণভোট অসাংবিধানিক হলে প্রধানমন্ত্রী সেদিন জনগণকে দয়া করে গণভোটে হ্যাঁ দিতে বলেছিলেন কেন?

ইলেকশনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে ক্ষমতা উপভোগ শুরু করার পর এখন উনার মনে হচ্ছে গণভোট অসাংবিধানিক ও অবৈধ?

আজকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ইলেকশনের আগে কেন বলেননি যে, গণভোট অসাংবিধানিক। কেন বিএনপি তখন গণভোটের বিরোধিতা করেনি দলীয়ভাবে?

তখন গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিতে আহ্বান জানিয়ে এখন গণভোটের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াকে তারেক রহমানের এদেশের মানুষের সাথে করা একটা রাজনৈতিক প্রতারণা যা এদেশের মানুষ মনে রাখবে নিশ্চয়ই।

বিএনপি, যেই গণভোটের মাধ্যমে দলটির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান গণভোটের মাধ্যমে নিজের বৈধতা নিলেন, আজকে সেই বিএনপি বলছে গণভোট অবৈধ?

হা হা হা।

সেদিন দয়া করে গণভোটে হ্যাঁ দেওয়ার কথা বলে আজ ক্ষমতার দাপটে জনরায়কে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার স্পর্ধা ও দু:সাহস দেখাচ্ছে বিএনপি। যারা ১৯৯১ তে জনগণকে প্রতারিত করেছিল, যারা ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসেও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের বয়স বাড়িয়ে সংবিধান সংশোধন করেছিলো যেন নিজ দলের সাবেক নেতা কেয়ার টেকার গভ: এর প্রধান উপদেষ্টা হয়ে তাদের কারচুপির মাধ্যমে আবারও ক্ষমতায় আনতে পারে, যার পরিপ্রেক্ষিতে এদেশে ২৮ অক্টোবরের লগি বৈঠার নারকীয় তাণ্ডব নেমে এসেছিলো, মানুষকে পিটিয়ে হত্যার পর লাশের ওপর নৃশংস নৃত্যের দৃশ্য আমাদের দেখতে হয়েছিলো। দেশ দীর্ঘ ১৭ বছর ফ্যাসিবাদের কবলে পড়েছিলো। বাংলাদেশ আওয়ামী জাহেলিয়াতের নরকে পরিণত হয়েছিল, এর একমাত্র দায় বিএনপি নামক দলটির।

যেই দলটির শীর্ষ নেতা, ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী বাংলাদেশ পন্থি ইলিয়াস আলি গুম ও খুনের শিকার হলেন, যেই দলটির একজন নেত্রী গুমের শিকার ব্যক্তিদের ফ্যামিলিগুলোকে নিয়ে মায়ের ডাকের মতো সংগঠন গড়ালো, যেই ইলিয়াস আলির স্ত্রী আজ সংসদে প্রশ্ন তোলেন, কোথায় ইলিয়াস আলি, সেই দল গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ বাতিল করার প্রস্তাব করে?

যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, তিনি শিলংয়ে গুম ছিলেন এবং যেই জুলাই বিপ্লব তাকে আজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হবার সুযোগ করে দিলো, সেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্ত্রণালয় গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় কীভাবে?

জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে বিএনপি আজ গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ বাতিলের পক্ষে অবস্থান নিয়ে এদেশের গুম হওয়া মানুষ ও তাদের ফ্যামিলিগুলোর আত্মত্যাগের সঙ্গে এক ঘৃণ্য উপহাস করার সিদ্ধান্ত নিলো।

যেই বিচার বিভাগ বিএনপি নেত্রীকে এতিমের টাকা আত্মসাৎকারী হিসেবে সাজা দিয়েছিল, আজকের প্রধানমন্ত্রীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিল, দেশে বিচারিক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল, সেই দলীয় অনুগত দলদাস বিচারকই কি বিএনপির পছন্দ?

বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর নিম্ন আদালতের ওপর প্রভাব খাটিয়ে যেই ফ্যাসিস্ট হাসিনা এত জুলুম নিপীড়ন করলো, সেই একই আচরণ করার খায়েশ থেকেই কি বিএনপি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চায় না?

বিএনপি যদি জাস্টিস চায়, বিএনপি যদি আইনের প্রকৃত শাসনই চায়, তবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিল করার প্রস্তাব কীভাবে দিতে পারে?

আজকের প্রধানমন্ত্রীকে মানি লন্ডারিং মামলায় আওয়ামী লীগের কথা শুনে সাজা না দেওয়ায় একজন বিচারকের কি করুণ পরিণতি করেছিল হাসিনা, তা আজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেমালুন ভুলে গেলেন?

এতবড় অকৃতজ্ঞও হওয়া যায়? বিএনপি আন্দোলনের গল্প শোনায়। তাদের ঈদের পরের আন্দোলন আমরা দেখেছি। আজকের সংসদের স্পিকার ৫ আগস্টের পর বলেছিলেন, বিএনপি যদি আরও দশ বছরও আন্দোলন করতো, তবু হাসিনাকে সরাতে পারতো না।

দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল করছে। মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল করছে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিল করছে। সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিল করছে।

এগুলো যদি সবই বাতিল হয়, তবে বাংলাদেশ আবারও নতুন করে বিএনপির ফ্যাসিবাদের খপ্পরে পড়তে যাচ্ছে। তারেক রহমান আরেকটা হাসিনা হয়ে উঠা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

শেষে বলবো, যে দেশের ছাত্র নাগরিক হাসিনার বুলেট জয় করে জুলাই বিপ্লব সফল করেছে, তারা আবারও রাস্তায় নামলে ক্ষমতার মসনদ টিকাতে পারবেন তো?

ক্ষমতার মসনদ অতি পিচ্ছিল। ছিটকে পড়বেন না তো? ভেবেছিলাম তারেক রহমান ক্ষমতায় গিয়েছেন, এখন তিনি অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে লব্ধ শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে দেশ গড়বেন কিন্তু তিনি তো দেখি আরেক ফ্যাসিস্ট হাসিনা হয়ে উঠতে উঠেপড়ে লেগেছেন।

বিএনপি ইতিহাসের শিক্ষা ভুলে গেছে। ইতিহাসই বিএনপিকে অচিরেই উচিত শিক্ষা দেবে সন্দেহাতীতভাবে। হাসিনা যদি চীন থেকে ফিরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের দাবি মেনে নিতো, তবে তাকে ও তার দলকে আজকের পরিণতি ভোগ করতে হতো?

হাসিনা কিন্তু দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল, দরজা খুলে অপেক্ষা করছিল ছাত্রদের সাথে মিউচুয়াল করতে কিন্তু তার পতন ও পলায়ন নিশ্চিত করেই ছাত্র নাগরিকরা ঘরে ফিরেছেন।

হাসিনার উদ্ধতস্বভাব, অহংকারী আচরণ ও অতিরিক্ত কনফিডেন্স তাকে পালাতে ও পরাজিত হতে বাধ্য করেছিল। আজকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বডি ল্যাংগুয়েজ ভালো কোনো বার্তা দিচ্ছে না।

বিএনপির আন্দোলনে এদেশ ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্ত হয়নি। সুতরাং বিএনপি জনগণের রায়কে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে ক্ষমতার দাপট দেখাবে, আবারও ফ্যাসিবাদ কায়েম করবে আর ছাত্র নাগরিক জনতা চুপচাপ সব মেনে নেবেন, এমনটা ভাবিয়েন না।

বিএনপির বাংলাদেশের ছাত্র নাগরিক জনতাকে মোকাবিলা করার কোনো সক্ষমতা নেই। ৯৬ তেও জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মরহুম খালেদা জিয়া জনগণের কাছেই পরাজিত হয়েছিলেন এই ইতিহাস ভোলা ঠিক হবে না।

২০০৬ সালকে সামনে রেখে ভোট কারচুপির খায়েশ থেকে সংবিধান সংশোধন করেও নিজ দলের নেতাকে বিএনপি প্রধান উপদেষ্টা বানাতে পারেনি।

বিএনপি জাতির সঙ্গে বারবার প্রতারণা করার দালিলিক ইতিহাস থাকার পরেও মানুষ বিএনপিকে এবার বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু বিএনপি নামক দলটা অতীত থেকে শিক্ষা না নিয়ে ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠতে মরিয়া।

আজ যারা বিএনপির অন্যায় ও অন্যায্য অপরাজনীতির সঙ্গে তাল মেলাচ্ছে, এরা সুবিধাবাদী শ্রেণি, এরা কেউ বিএনপির পাশে থাকবে না লিখে রাখুন।

যেই জনতা আজ আপনাদের ক্ষমতায় বসিয়েছে, এই জনতাই ১৭ বছর আপনাদের দিকে মুখ তুলেও তাকায়নি। আপনাদের কোনো আন্দোলনে তারা ন্যূনতম সাড়া দেয়নি। কেন সাড়া দেয়নি আপনাদের তার উত্তর আপনারা এখন জনতাকে দিয়ে দিচ্ছেন।

হাসিনার পালানোর ছবিটা বারবার দেখুন। হাসিনার চেয়ে বড় চেতনাবাজ আপনারা হতে পারবেন না, চেতনা হাসিনাকে রক্ষা করতে পারেনি।

জুলাই সনদ ও গণভোট অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন না করলে আপনাদের পরিণতি হাসিনার চেয়েও খারাপ হবার শঙ্কা করি, ইতিহাস ঘাঁটলে এমন নজিরই পাওয়া যায়।

ডা. আহমেদ জোবায়ের। মেডিকেল অফিসার। মিনিস্ট্রি অব হেলথ, মালদ্বীপ।

এমআরএম/এএসএম