দেশজুড়ে

সিন্ডিকেটের জালে জেলেদের ডিজেল

বরগুনায় ইলিশের ভরা মৌসুম চললেও ডিজেলের কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে ব্যারেল প্রতি দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে বিপাকে পড়েছেন পাথরঘাটার সমুদ্রগামী মাছ ধরার ট্রলারের জেলে ও মালিকরা।

তাদের অভিযোগ, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা না দিলে ট্রলারের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে, বেশি দামে ডিজেল বিক্রির বিষয়টি স্বীকারও করেছেন বিক্রেতারা। তবে জ্বালানি তেল অতিরিক্ত দামে বিক্রি বন্ধের বিষয়ে কথা বলতে নারাজ বরগুনার ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক।

ট্রলার মালিকদের অভিযোগ, মজুত থাকার পরও বাড়তি দাম না দিলে জ্বালানি পাওয়া যায় না। বিষয়টি প্রশাসনকে অবগত করলেও মজুতদারদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

সরজমিনে পাথরঘাটার বিভিন্ন জ্বালানি তেল ব্যবসায়ীসহ ট্রলার মালিকদের কাছে ঘুরে দেখা গেছে, পাথরঘাটা ফিলিং স্টেশন নামে একটি ফিলিং স্টেশনের ঘাটে ডিজেল নিতে ভিড় করে আছে সারি সারি ট্রলার। তবে তেল না থাকায় দড়ি ও বড়ই গাছের কাটা দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছে ফিলিং স্টেশনটি। আর এদিকে ফিলিং স্টেশনে ডিজেল না পেয়ে খোলা বাজার থেকে তিন ব্যারেল ডিজেল ৭৮ হাজার টাকায় কিনে এনেছেন এফবি খাইরুল নামের মাছ ধরার ট্রলারের মাঝি।

এতে তার বাড়তি দাম গুনতে হয়েছে ১৮ হাজার টাকা। শুধু এই একটি ট্রলার নয়, পাথরঘাটায় সমুদ্রগামী প্রতিটি মাছ ধরার ট্রলারের জন্য ব্যারেলপ্রতি ২ থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি দিয়ে কিনতে হচ্ছে ডিজেল।

ডিজেলের অতিরিক্ত দামের বিষয়ে অনুসন্ধানে নামে জাগো নিউজ, কথা হয় বিভিন্ন জেলে, ট্রলার মালিক ও মালিক সমিতির সদস্যদের সঙ্গে। অনুসন্ধানের একপর্যায়ে একটি ক্যাশ মেমো পায় জাগো নিউজ। সেই ক্যাশ মেমো নিয়ে খুঁজে বের করা হয় পাথরঘাটা বিএফডিসির ঘাট সংলগ্ন মেসার্স বেল্লাল স্টোর নামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে। যেখানে জ্বালানি তেলের পাশাপাশি সমুদ্রগামী ট্রলারের নিত্য প্রয়োজনীয় সব মালামাল বিক্রয় করা হয়। দোকানের দেওয়া ক্যাশ মেমোর ৪৬ নম্বর সিরিয়ালের ডিজেলের দাম রাখা হয়েছে দুই ব্যারেল (৪০০ লি.) ৫০ হাজার টাকা। যেখানে ব্যারেল প্রতি সাড়ে চার হাজার টাকা বেশি।

বেশি দাম রাখার বিষয়ে কথা হয় বেলাল স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. বেলাল হোসেনের সঙ্গে।

তিনি বলেন, তেলের বর্তমান পরিস্থিতি খুবই খারাপ। আমাদের ২১ থেকে ২২ হাজার টাকায় ব্যারেল কিনতে হয় এবং বিক্রি করতে হয়, এছাড়া এখন আর আমাদের কাছে কোনো তেল নেই।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে জাগো নিউজের হাতে আসা ক্যাশ মেমোটি তাকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলে, এই ক্যাশ মেমোটি নকল বলে দাবি করেন তিনি। তখন তার দোকানের মেমোর সঙ্গে ক্যাশ মেমোটি মিলালে একই রকম খুঁজে পাওয়া। তখন তিনি হাতের লেখা তার নয় বলে বিষয়টি এড়িয়ে যান।

খাইরুল ইসলাম নামের এক মৎস্য ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন, পাথরঘাটা বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র। শুধুই পাথরঘাটাতে হাজার হাজার ট্রলার সাগরে মাছ ধরতে যায়। অথচ এখানে তেল নিয়ে সিন্ডিকেট করছে ব্যবসায়ীরা। আর এ বিষয়গুলো কোনোভাবেই দেখেও দেখছে না প্রশাসনের কর্মকর্তারা। আমরা অতিরিক্ত টাকা না দিলে তেল পাই না। আবার অতিরিক্ত টাকা দিলে তেল পাওয়া যায়। প্রতি ব্যারেলে ১ থেকে ৫ হাজার টাকা ব্যবসা করে নিচ্ছে। আর আমাদের জেলেরা আল্লাহর উপর ভরসা করে এই অতিরিক্ত দাম দিয়ে তেল কিনে সাগরে যাচ্ছে।

বাজারে বেশি দামে তেল কিনে এনে কাস্টমারকে দিতে হয় জানিয়ে আল মামুন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আফজাল শরীফ জাগো নিউজকে বলেন, মাঝখানে এক সপ্তাহ তেলের ট্যাংকার না আসায় সব ব্যবসায়ীরা তেল মজুত করে ফেলেছে। আমরা যাদের কাছে থেকে তেল আনি তাদের ফোন দিলে বলে তেল নেই। অথচ সবাই ২২ থেকে ২৩ হাজার টাকা ব্যারেল বিক্রি করছে। এখন মাছের সময়, আমাদের যারা কাস্টমার আছে তারা সাগর-নদীতে মাছ ধরতে যাবে তাই বাধ্য হয়ে আমাদেরও তাদের তেল জোগাড় করে দিতে হয়। এভাবেই চলছে।

বেশি দামে তেল বিক্রির কথা স্বীকার করে আব্দুল হক নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, আমি ১৫ ব্যারেল বরাদ্দ পেয়েছিলাম। বাজারে তেল নেই তাই আমাকে ব্যবসায়ীরা নিজ উদ্যোগে ২২ হাজার টাকা করে দিয়ে তেল নিয়ে গেছে।

সরকারি রেটের বেশি দামে বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, সবাই তো চায় একটু ব্যবসা হোক। আমি তো কাউকে জোর করেনি। তারাই রেট নির্ধারণ করে আমার কাছ থেকে সব তেল নিয়েছে। তাছাড়া তেলের ব্যবসাও আমার নতুন।

কোথাও তেল নেই অথচ বেশি টাকা দিলে তেল আছে জানিয়ে পাথরঘাটার ট্রলার মালিক ও মালিক সমিতির সহ-সভাপতি মো. আবুল হোসেন ফারাজি জাগো নিউজকে বলেন, সামনে ৫৮ দিনের একটি অবরোধ তার আগে সব জেলেরাই চান সাগরে মাছ ধরে এই ৫৮ দিনের লাভ করে রাখতে। আমার চারটি সমুদ্রগামী ট্রলার রয়েছে। আমরা যেসব দোকান থেকে ট্রলারের বাজার করি তারা তেল নেই বলে আমাদেরকে জানান। অথচ বেশি টাকা দিলে তেল পাওয়া যায়। তাই বাধ্য হয়েই আমাদেরকেও বেশি দামে তেল নিয়ে সাগরে ট্রলার পাঠাতে হয়। আমি এ বিষয়ে প্রশাসনকে অনেকবার জানিয়েছি কিন্তু তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আবার দোকানদারদের কাছে তেলের স্লিপ চাইলেও তারা দেন না। আমরা ট্রলার মালিকরা সরকারের কাছে অনুরোধ করব সামনে ৫৮ দিনের মাছ ধরায় অবরোধ শেষে যখন আবারো আমরা সমুদ্রে ফিরব তখন যেন তেলের দাম স্বাভাবিক থাকে।

সাগরে মাছ কম আর তেলের দাম বেশি রাখায় জেলেদের জুলুম চলছে জানিয়ে জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, সব তেলের দোকানেই পর্যাপ্ত তেল থাকার পরেও সরকারি রেটে তেল বিক্রি হচ্ছে না। এক প্রকার জুলুম চলছে আমাদের সঙ্গে। এদিকে সাগরেও মাছ কম তাই অনেক জেলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে অতিরিক্ত দামে তেল কিনে সাগরে যাবে না। এত কিছু চললেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থাও দিচ্ছে না। আমরা প্রশাসনকে জানানোর পরেও কোনো অভিযান এখন পর্যন্ত দেখিনি। আমাদের সরকারের কাছে দাবি, সরকারিভাবে যেহেতু তেলের দাম বাড়েনি তাই ন্যায্য দামে তেল কিনে আমরা সাগরে মাছ ধরতে যেতে চাই।

বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রির বিষয়ে আমাদেরকে জেলেরা এখনো লিখিতভাবে জানাইনি। জানালে হয়তো আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় কি না সে ব্যাপারে চেষ্টা করতে পারতাম। তাছাড়া এ বিষয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করার এখতিয়ার আমাদের নেই। সেক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন বা উপজেলা প্রশাসন এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারে। কারণ বেশি মূল্যে তেল বিক্রি করার কোনো সুযোগ নেই।

বরগুনায় তেলের বর্তমান অবস্থা ও অতিরিক্ত দাম নিয়ে বক্তব্যের জন্য ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক অনিমেষ বিশ্বাসের সঙ্গে দেখা করলে তিনি প্রতিবেদককে বক্তব্য দিবেন না বলে জানান এবং যেখানকার বিষয়ে সেখানকার কর্মকর্তাদের কাছ থেকে গিয়ে বক্তব্য আনতে বলে দায় এড়িয়ে যান।

উল্লেখ্য, বরগুনার পাথরঘাটায় পাঁচ শতাধিক সমুদ্রগামী মাছ ধরার ট্রলার রয়েছে। একবার সমুদ্রযাত্রার জন্য আকৃতিভেদে এক একটি ট্রলারে ২ থেকে ২০ ব্যারেল পর্যন্ত জ্বালানি তেল প্রয়োজন।

নুরুল আহাদ অনিক/ এনএইচআর/এমএস