ধূমপান ও তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ-২০২৫ থেকে ই-সিগারেট নিষিদ্ধের বিধান বাতিলের উদ্যোগকে ‘আত্মঘাতী’ সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর নেতারা। তারা বলছেন, এই বিধান বাতিল করা হলে দেশে কোটি তরুণের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়বে এবং নতুন করে নেশার বিস্তার ঘটবে।
রোববার (৫ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তামাকবিরোধী বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডা. গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক। এতে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক অরূপ রতন চৌধুরী, ড. রুমানা হক, সৈয়দ মাহাবুবুল আলম তাহিন, হেলাল আহমেদ, সাগুকতা সুলতানা, একেএম মাকসুদ ব্যারিস্টার নিশাদ মাহমুদ, আমিনুল ইসলাম বকুল, অনন্যা রহমান, সুশান্ত সিনহা, অধ্যাপক বজলুর রহমান এবং ফারজানা জামান লিজা।
সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বাংলাদেশ তামাকবিরোধী জোট (বাটা), বাংলাদেশ টোব্যাকো কন্ট্রোল অ্যাডভোকেটস (বিটিসিএ), বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি), বাংলাদেশ টোব্যাকো কন্ট্রোল রিসার্চ নেটওয়ার্ক (বিটিসিআরএন), বাংলাদেশ সেন্টার ফর গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিসিজিডি), বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি, আর্থ ফাউন্ডেশন, সেতু, লিডার্স ইন টোব্যাকো কন্ট্রোল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন সংগঠন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ধূমপান ও তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ-২০২৫ এর ধারা ৬ (গ) সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে এবং ই-সিগারেট নিষিদ্ধের বিধান বিলুপ্ত করার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এখনো স্পষ্ট অবস্থান জানায়নি, যা উদ্বেগজনক।
ই-সিগারেট কোম্পানিগুলো সাধারণত দুটি যুক্তি দিয়ে এই পণ্যকে বাজারে আনার চেষ্টা করছে, একটি হলো এটি কেবল প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য, অন্যটি এটি তুলনামূলক কম ক্ষতিকর। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশে প্রচলিত সিগারেটই যখন শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের কাছে বিক্রি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, তখন ই-সিগারেটও শিশু-কিশোরদের নাগালের বাইরে রাখা সম্ভব হবে না।
সংগঠনগুলোর নেতারা জানান, এরইমধ্যে বিভিন্ন সময় স্কুল শিক্ষার্থীদের ব্যাগে ই-সিগারেট পাওয়া যাওয়ার খবর প্রকাশ হয়েছে। এ অবস্থায় এটি বৈধতা পেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। এসময় বলা হয়, ই-সিগারেটকে কম ক্ষতিকর বলে যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) ই-সিগারেটকে ক্ষতিকর বলে সতর্কতা জারি করেছে।
বক্তারা বলেন, সরকার এরইমধ্যে ধূমপান ত্যাগে সহায়ক ওষুধ এবং কুইটিং সিস্টেম চালু করেছে। সেই অবস্থায় ‘কম ক্ষতিকর’ দাবি করে নতুন একটি নেশাজাত পণ্য বাজারে আনার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
তারা জানান, অতীতে তামাক কোম্পানিগুলো ‘লাইট’, ‘মাইল্ড’ ও ফিল্টারযুক্ত সিগারেটের মতো পণ্যকে কম ক্ষতিকর বলে বাজারজাত করেছিল। কিন্তু বাস্তবে এসব পণ্যও সমানভাবে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে। তাই ই-সিগারেটকে কম ক্ষতিকর বলে প্রচার করাও তামাক কোম্পানিগুলোর ব্যবসা সম্প্রসারণের কৌশল মাত্র।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘গ্লোবাল টোব্যাকো এপিডেমিক-২০২১’ প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে বক্তারা বলেন, ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম (ইএনডিএস) আসক্তি তৈরি করে এবং এটি মোটেও নিরাপদ নয়। ভারতসহ বিশ্বের অন্তত ৪২টি দেশে ই-সিগারেট পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দেশে ই-সিগারেট ডিভাইসের মাধ্যমে এমডিএমবিসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক গ্রহণের ঘটনাও সামনে এসেছে। ফলে এটি বৈধতা পেলে দেশে মাদকের ব্যবহারও বৃদ্ধি পেতে পারে।
তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর দাবি, তামাক কোম্পানিগুলো পরিকল্পিতভাবে তরুণদের লক্ষ্য করে ই-সিগারেট বাজার বিস্তারের চেষ্টা করছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ই-সিগারেট বিক্রির বেশিরভাগ দোকান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের আশপাশে গড়ে উঠেছে। ফলে তরুণ ও শিক্ষার্থীরা সহজেই এর নাগালে আসছে।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, গত পাঁচ বছরে দেশে ই-সিগারেটের দোকানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশই এই সময়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবহারকারীদের প্রায় ৯৫ শতাংশই তরুণ ও শিক্ষার্থী। তামাক কোম্পানির পৃষ্ঠপোষকতায় দেশে বিভিন্ন ভ্যাপিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে এবং ‘ভ্যাপিং ডে’ উদযাপনসহ নানা কর্মসূচি আয়োজন করা হচ্ছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে তরুণদের লক্ষ্য করে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এমনকি ঢাকার বিভিন্ন রেস্টুরেন্টের স্মোকিং জোনেও ই-সিগারেটের প্রচারণা ও বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে।
বলা হয়, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি রায়ে দেশে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে তামাক ব্যবহার কমিয়ে আনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং নতুন কোনো তামাক কোম্পানিকে অনুমোদন না দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। সেই অবস্থায় ই-সিগারেট উৎপাদন বা আমদানির অনুমোদন দেওয়া ওই নির্দেশনার পরিপন্থি হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে ই-সিগারেট নিষিদ্ধের বিধান বহাল রাখার আহ্বান জানান। তারা বলেন, দেশে বর্তমানে মাত্র ০.২ শতাংশ মানুষ ই-সিগারেট ব্যবহার করে। এত কম ব্যবহারকারীর জন্য পুরো বাজার উন্মুক্ত করা হলে ভবিষ্যতে তা তরুণ সমাজের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, দেশের কিশোর-তরুণদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচ নিষিদ্ধ রাখার বিধান আইনে বহাল রাখতে।
ইএআর/এসএনআর