অর্থনীতি

মোবাইলের সর্বনিম্ন কলরেট প্রত্যাহার নিয়ে মতভেদ বিশেষজ্ঞদের

দেশে মোবাইল কলের সর্বনিম্ন ফ্লোর প্রাইস এখন মিনিটপ্রতি ৪৫ পয়সা। এটিকে সর্বনিম্ন কলরেটও বলা হয়। এই কলরেটের সর্বনিম্ন সীমা উঠিয়ে দেওয়ার এক প্রস্তাব এসেছে। তবে একেবারে না উঠিয়ে ধীরে ধীরে উঠিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব বিশেষজ্ঞদের।

তবে এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে গ্রাহকের ওপর চাপ আরও বাড়বে মনে করছে মোবাইল অপারেটরগুলো। বিটিআরসিও বলছে, ফ্লোর প্রাইস নিয়ে চিন্তা করার আগে নতুন করে খরচ পর্যালোচনা করতে হবে।

রোববার (৫ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনে আয়োজিত ‘ভয়েস মূল্যসীমা প্রত্যাহার প্রস্তাব: মোবাইল সেবাকে জনবান্ধব করতে নতুন সরকারের করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তাদের আলোচনায় এসব কথা উঠে আসে।

টেকনোলজি ইন্ডাস্ট্রি পলিসি অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্ম (টিআইপিএপি) ও ভয়েস ফর রিফর্ম যৌথভাবে এই সেমিনারের আয়োজন করে। টিআইপিএপির আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুরের সভাপতিত্বে এতে বক্তব্য দেন টেলিকম বিশেষজ্ঞ মাহতাব উদ্দিন আহমেদ, রবির হেড অব কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি সাহেদ আলম, বিটিআরসির উপপরিচালক (সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিস ডিভিশন) মোহাম্মদ ফারহান আলম, ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশের (আইসিএসবি) সভাপতি হোসেন সাদাত প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে টেলিকম বিশেষজ্ঞ মাহতাব উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশে মোবাইল কলের ফ্লোর প্রাইস কমানো উচিত। সঠিক পরিকল্পনা ও নীতিগত সহায়তা থাকলে ভয়েসনির্ভরতা কমিয়ে ডাটাভিত্তিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে দ্রুত অগ্রসর হওয়া সম্ভব।

তিনি বলেন, ফ্লোর প্রাইস রাতারাতি তুলে দিলে অপারেটর ও সরকারের ওপর বড় ধাক্কা আসতে পারে। তাই এটি ধাপে ধাপে কমানো উচিত, যাতে কেউ হঠাৎ করে বড় ক্ষতির মুখে না পড়ে। ভয়েস কলের ওপর নির্ভরতা কমলে অপারেটররা ডাটা সেবার দিকে বেশি মনোযোগ দেবে, যা দীর্ঘমেয়াদে ডিজিটাল ইকোসিস্টেমকে শক্তিশালী করবে। যদি ভয়েস প্রাইস কমে, অপারেটরদের টিকে থাকার জন্য ডাটা ও ইন্টারনেট সেবায় ফোকাস করতেই হবে।

মাহতাব উদ্দিন বলেন, এটি বাস্তবায়ন হলে নতুন স্মার্টফোন ব্যবহারকারী বাড়বে, ইন্টারনেট প্রবেশ ৪৫ থেকে ৭৫ শতাংশে যেতে পারে এবং ডিজিটাল খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ফ্লোর প্রাইস কমানো বা তুলে দিলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ে এবং সেবার প্রসার ঘটে। তিনি আরও বলেন, শুধু ধাপে ধাপে ফ্লোর প্রাইস কমানোই নয়, একইসঙ্গে বাজারে বড় অপারেটরের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে এসএমপি রেগুলেশন নিশ্চিত করতে হবে। ডিভাইসের ওপর কর কমাতে হবে এবং ডাটার ওপর করের বোঝা হ্রাস করতে হবে।

তবে মোবাইল ফোনের ভয়েস কলের ফ্লোর প্রাইস কমানো বা তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ডাটা সেবার খরচ বেড়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেন রবির হেড অব কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি সাহেদ আলম। তিনি বলেন, বিশ্বের ৪০টির মতো দেশে এখনও ফ্লোর প্রাইস রয়েছে। টেলিযোগাযোগ খাতে যে কোনো মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিতে হলে সামগ্রিক প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি। টেলিকম সেবা শুধু ভয়েস কলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ভয়েস ও ডাটাসহ বিভিন্ন সেবার সমন্বয়ে গঠিত। তাই ভয়েস কলের ফ্লোর প্রাইস পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত এককভাবে নেওয়া হলে অন্যান্য সেবার ওপর এর প্রভাব পড়বে।

সাহেদ আলম বলেন, ভয়েস ফ্লোর আমরা চাইলে দ্রুত পরিবর্তন করতে পারি। তবে সেটি করলে ডাটা প্রাইস বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশে ডাটা ব্যবহারের প্রসার বাড়াতে হলে ডাটার দাম কমানো জরুরি। এক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের উচিত খরচ বাড়ায় এমন মধ্যবর্তী স্তরগুলো চিহ্নিত করে তা কমানো। ভয়েস কলের ফ্লোর প্রাইস নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একটি পূর্ণাঙ্গ কস্ট স্টাডি করা প্রয়োজন। এতে গ্রাহক, অপারেটর এবং সরকারের রাজস্ব—সব দিক বিবেচনায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।

অনুষ্ঠানে বিটিআরসির উপপরিচালক (সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিস ডিভিশন) মোহাম্মদ ফারহান আলম বলেন, চারটি অপারেটরেই ভয়েস কল কমেছে। ফ্লোর প্রাইস উঠিয়ে দিয়ে মনোপলি বা ওলিগোপলি (একচেটিয়া) হতে পারে।

তিনি বলেন, ৩০ শতাংশ মানুষের এখনো স্মার্টফোন নেই। তারা ভয়েস কল বা এসএমএসের ওপর নির্ভর করে। এটি যদি ১০ শতাংশেও নেমে আসে, তাতেও আমরা ভয়েস কলরেটকে বিবেচনা করবো। ভয়েস কল রেট নিয়ে কস্ট রিভিউ করা উচিত। সিলিং প্রাইজ যদি সরানো প্রয়োজন, তবে এটিকে গ্রাজুয়ালি করতে হবে।

এদিকে টেকনোলজি ইন্ডাস্ট্রি পলিসি অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্ম বলছে, গত কয়েক দশকে সারা দেশে মোবাইল টেলিকম সার্ভিস নেটওয়ার্কের ব্যাপক বিস্তার লাভ করলেও উচ্চ কল রেটের কারণে এখনো দেশের একটি বড় অংশের জনগোষ্ঠী তাদের জীবন ও জীবিকায় মোবাইল টেলিকম সেবার প্রয়োজনীয় ও যথাযথ ব্যবহার করতে পারছে না। জনগণের কাছে নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতির অন্যতম মোবাইল সেবাসহ অন্যান্য ডিজিটাল সেবাকে ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসা। সে পরিপ্রেক্ষিতেই মোবাইলের ভয়েস কলের ফ্লোর প্রাইসের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

ইএইচটি/এমএমএআর