প্রতি বছর গরমের সময় বাড়ে লোডশেডিং। বিকল্প হিসেবে মানুষ ঝোঁকে সৌর বিদ্যুৎ কিংবা আইপিএসের (ইনস্ট্যান্ট পাওয়ার সাপ্লাই) দিকে। এবার নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। এরই মধ্যে লোডশেডিং বাড়ার কথা জানাচ্ছে সরকার। জ্বালানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে তা আরও বাড়তে পারে। এ আশঙ্কায় চাহিদা বাড়ায় চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে আইপিএস।
গরমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পেতে অনেকে আগেভাগেই আইপিএস কেনার চিন্তা করেছেন। কিন্তু তাদের জন্য বাজারে মোটেও ভালো খবর নেই। গরমের শুরুতেই আইপিএস পুরো সেট কেনার জন্য বাড়তি গুনতে হচ্ছে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা।
ঢাকার গুলিস্তান স্টেডিয়াম মার্কেট, মালিবাগ ও মৌচাক এলাকা ঘুরে দেখা যায়, এখন প্রতিটি আইপিএস মেশিন বিক্রি হচ্ছে গত বছরের চেয়ে এক থেকে দেড় হাজার টাকা বেশি দামে। এর সঙ্গে ব্যবহৃত ব্যাটারির দামও বেড়েছে কমপক্ষে দুই হাজার টাকা।
মূল সমস্যা হয়েছে ব্যাটারি নিয়ে। আইপিএসের ব্যাটারির জন্য যে ডিস্টিল্ড ওয়াটার সেটা পাওয়া যাচ্ছে না। যুদ্ধের কারণে আমদানি ব্যাহত হয়েছে। আগে যে জার ৫শ টাকা বিক্রি হতো এখন সেটা তিন হাজার ৫শ টাকা পড়ছে।-দোকানি
বিক্রেতারা বলছেন, মূলত মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে আইপিএসের ব্যাটারির দাম বেশি। কারণ, এখন ব্যাটারিতে ব্যবহৃত ডিস্টিল্ড ওয়াটারেরও (ব্যাটারির পানি) সরবরাহ সংকট চলছে। এছাড়া ভারত থেকে আমদানি জটিলতায় আইপিএস আমদানি কমেছে এ বছর। যে কারণে আইপিএস মেশিনেরও দাম বেড়েছে।
দাম কেমন?একদম ছোট পরিবারের জন্য প্রয়োজন ৪০০ ভোল্ট অ্যাম্পিয়ারের একটি আইপিএস মেশিন। এতে ৩২০ ওয়াট বিদ্যুৎ মিলবে, অর্থাৎ দুটি ফ্যানের সঙ্গে তিন-চারটি লাইট জ্বলবে অনায়াসে। হ্যামকো ব্র্যান্ডের এমন একটি আইপিএস ১০ হাজার ৫শ টাকায় বিক্রি করছে মালিবাগের মিম ব্যাটারি হাউজ।
রহিম আফরোজ কোম্পানির আইপিএস
কথা হয় প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার শাহ আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এই মেশিনটির দাম এক হাজার টাকা বেড়েছে। তবে সমস্যা হচ্ছে এই মেশিন চালাতে কমপক্ষে ৮০ অ্যাম্পিয়ার-আওয়ারের একটি ব্যাটারি লাগবে। যার দাম ১২ হাজার ৫শ টাকা। এ ব্যাটারির দাম দুই হাজার টাকা বেড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘একইভাবে বড় ১ হাজার ওয়াটের আইপিএস মেশিন ১৪ হাজার টাকা পড়ছে। কিন্তু ব্যাটারির দাম ২৬ হাজার টাকা, যা গত বছরের চেয়ে প্রায় তিন হাজার টাকা বেশি।’
গরমের সময় আইপিএসের চাহিদা এমনিতেই বাড়ে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটা কয়েক গুণ বেড়েছে। তবে গত বছর থেকে এ বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত আমরা ভারত থেকে সেভাবে আমদানি করতে পারিনি, এখন কিছুটা হচ্ছে। যে কারণে শুধু আইপিএসের দাম এক হাজার টাকা বেড়েছে।-হ্যামকো করপোরেশন লিমিটেডের সিনিয়র পণ্য ব্যবস্থাপক আরিফুর রহমান ভূঁইয়া
মৌচাক মোড়ে অটো ক্যাফটের কর্ণধার জাহিদুল ইসলাম বলেন, ৮০০ ভোল্ট অ্যাম্পিয়ারের রহিম আফরোজ আইপিএস ৪-৫টি এলইডি লাইট ও তিনটি ফ্যান চালানোর সুবিধা দেবে। এ ধরনের আইপিএস এখন ব্যাটারিসহ ৩৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
হ্যামকো ব্র্যান্ডের আইপিএস
ছয়টি এলইডি ও তিনটি ফ্যান চালানোর সুবিধা নিলে দাম পড়ছে ৪১ হাজার টাকা। রহিম আফরোজের ৫শ ওয়াটের আইপিএস কেনা যাবে ৫২ হাজার টাকায়। এগুলোর পুরো সেটের দাম গত বছরের চেয়ে এখন তিন হাজার টাকা বেশি।
আরও পড়ুন
‘দেউলিয়া’ বিদ্যুৎ সেক্টর সামলাতে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে সরকারগরম বাড়লেও ‘স্বস্তিদায়ক’ থাকবে লোডশেডিংলোডশেডিং হচ্ছে ও হবে: বিদ্যুৎ উপদেষ্টা
বাজার ঘুরে দেখা যায়, ২৮০ ওয়াট থেকে শুরু করে ৭ হাজার ৫শ ওয়াট পর্যন্ত কার্যক্ষমতার ওপর নির্ভর করে ২০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১ লাখ টাকা দামের আইপিএস মিলছে দোকানগুলোতে।
আমদানি ও সরবরাহ কেমন?আমদানিকারক ও বিক্রেতারা বলছেন, সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকলেও বছরে প্রায় এক লাখ পিস আইপিএসের চাহিদা রয়েছে দেশে। এর মধ্যে রহিমআফরোজ, হ্যামকো, নাভানা, ফিলিপস ও অনিক ব্র্যান্ডের দখলে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বাজার। এছাড়া প্রচুর আইপিএস দেশে নামি-বেনামি কারখানায় সংযোজন হচ্ছে।
গুলিস্তানে এমবি ইন্টারন্যাশনাল, খুচরা ও পাইকারি আইপিএস বিক্রির পাশাপাশি কিছু ব্র্যান্ডের আইপিএস-ব্যাটারি আমদানিও করে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তারেক হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘মূলত আইপিএস আমদানি এ বছর কম। কিন্তু বিদ্যুৎ সংকটের শঙ্কা ও গরম বেশি হওয়ার প্রবণতার কারণে চাহিদা বেড়েছে। যে কারণে দাম কিছুটা বেশি।’
তিনি বলেন, ‘মূল সমস্যা হয়েছে ব্যাটারি নিয়ে। আইপিএসের ব্যাটারির জন্য যে ডিস্টিল্ড ওয়াটার সেটা পাওয়া যাচ্ছে না। যুদ্ধের কারণে আমদানি ব্যাহত হয়েছে। আগে যে জার ৫শ টাকা বিক্রি হতো এখন সেটা তিন হাজার ৫শ টাকা।’
হ্যামকো করপোরেশন লিমিটেডের সিনিয়র পণ্য ব্যবস্থাপক আরিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, ‘গরমের সময় আইপিএসের চাহিদা এমনিতেই বাড়ে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটা কয়েক গুণ বেড়েছে। গত বছর থেকে এ বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত আমরা ভারত থেকে সেভাবে আমদানি করতে পারিনি, এখন কিছুটা হচ্ছে। যে কারণে শুধু আইপিএসের দাম এক হাজার টাকা বেড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘কয়েকটি বড় ব্র্যান্ড মিলে প্রায় ৫০ হাজার পিস আইপিএস আমদানি করা হয়। এ বছর আমদানি এর চেয়ে কিছুটা কম হয়েছে।’
এনএইচ/এএসএ/এমএফএ